Ajker Patrika

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি: যশোরে এক বছরে ৬২ হত্যাকাণ্ড

  • বেড়েছে বিদেশি পিস্তলের ব্যবহার।
  • ১১ রুটে ঢুকছে অস্ত্র।
  • ভোট সামনে রেখে নিরাপত্তা নিয়ে সংশয়।
  • সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর: জেলা প্রশাসক
জাহিদ হাসান, যশোর 
আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০২: ৩৪
বরফকল ব্যবসায়ী রানা প্রতাপ বৈরাগী (৩৮)। ছবি: সংগৃহীত
বরফকল ব্যবসায়ী রানা প্রতাপ বৈরাগী (৩৮)। ছবি: সংগৃহীত

যশোরে গত এক বছরে খুন হয়েছেন অন্তত ৬২ জন। অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছে বিদেশি পিস্তল। সীমান্ত দিয়ে যে হারে অস্ত্র ঢুকছে, সেই তুলনায় উদ্ধার তৎপরতা কম। এমন বাস্তবতায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

মনিরামপুর উপজেলার কপালিয়া বাজারে ৫ জানুয়ারি সন্ধ্যায় ব্যবসায়ী রানা প্রতাপ বৈরাগীকে নিজ দোকান থেকে ডেকে নেয় দুর্বৃত্তরা। নেওয়া হয় পাশের কপালিয়া ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনের গলিতে। সেখানে খুব কাছ থেকে চারটি গুলি ছুড়ে এবং গলা কেটে তাঁকে হত্যা করা হয়। পরে ঘটনাস্থল থেকে কয়েকটি গুলির খোসা উদ্ধার করে পুলিশ। ফরেনসিক প্রতিবেদনে জানা যায়, এই হত্যাকাণ্ডে সিক্স পয়েন্ট ফাইভ এমএম মডেলের বিদেশি পিস্তল ব্যবহার করা হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, নিহত রানা প্রতাপ বৈরাগী একসময় মাছ ও বরফকলের ব্যবসার পাশাপাশি নিষিদ্ধঘোষিত চরমপন্থী দলে যুক্ত ছিলেন।

৩ জানুয়ারি শহরের শংকরপুর এলাকায় মোটরসাইকেলে করে বাড়ি ফিরছিলেন ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন। এ সময় অন্য মোটরসাইকেল থেকে কয়েকজন তাঁকে গুলি করে পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয়রা হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ময়নাতদন্তের পর গুলির ফরেনসিক প্রতিবেদনে জানা যায়, হত্যাকাণ্ডে বেরেটা এম নাইন মডেলের পিস্তল ব্যবহার করেছে দুর্বৃত্তরা।

জেলা আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক কমিটির বৈঠকে পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত যশোরে ৬২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। থেমে নেই ধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও ছিনতাই। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডে বিদেশি পিস্তল ব্যবহার করা হয়েছে। সম্প্রতি ভারত থেকে যেভাবে অস্ত্র ঢুকছে, এমন পরিস্থিতি কয়েক বছর আগেও ছিল না। এখন মাদকের সঙ্গেও আনা হচ্ছে অস্ত্র। নির্বাচনী ডামাডোলে অস্ত্রের চাহিদা বাড়ায় অস্ত্র কারবারিদের সঙ্গে নতুন করে যোগ দিয়েছে মাদক ও মানব পাচারকারী চক্র।

স্থানীয়দের অভিযোগ, চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের আটক না করার পাশাপাশি আশানুরূপ অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বেড়েছে। সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় সন্ত্রাসীদের কাছে সহজে মিলছে বিদেশি অস্ত্র।

যশোরে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করছেন অ্যাডভোকেট মোস্তফা হুমায়ুন কবীর। তিনি বলেন, সম্প্রতি যে কয়েকটি হত্যাকাণ্ড সামনে এসেছে, তার সব কটিই মাথায় গুলির ঘটনা। সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় অবাধে অস্ত্র ঢুকছে; তবে ধরা পড়ছে দু-একটি। ভোটের আগে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং সীমান্তে অস্ত্র আসা থামাতে না পারলে আগামী নির্বাচনের পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) আবুল বাশার আজকের পত্রিকাকে বলেন, সম্প্রতি যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, সব কটিতেই বিদেশি পিস্তল ব্যবহৃত হয়েছে। এগুলো ভারত থেকে এসেছে। ইতিমধ্যে এমন কয়েকটি চালান জব্দ করা হয়। আসামিদের দেওয়া তথ্যের

ভিত্তিতে অস্ত্র উদ্ধার অব্যাহত রেখেছি। তবে যাদের আটক করা হচ্ছে, তারা সবাই বাহক। মূল ক্রেতা-বিক্রেতাকে তাঁরা চেনেন না। তবে সামগ্রিকভাবে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে যশোরবাসীর বিচলিত হওয়ার কারণ নেই। জেলার ৪৯টি স্পটে নিয়মিত তল্লাশি করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

১১ রুটে ঢুকছে অস্ত্র

যশোরের চৌগাছা, ঝিকরগাছা ও শার্শা উপজেলার প্রায় ২৪০ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে নদী, ঘন বনজঙ্গল ও বসতবাড়ির ঘনত্ব চোরাচালানকে সহজ করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১১টি রুটে অস্ত্রসহ নানা অবৈধ পণ্য ঢুকছে। চৌগাছা, ঝিকরগাছা, শার্শা, শাহজাদপুর, হিজলা, পুটখালী, আন্দুলিয়া, মান্দারতলা, বেনাপোল সীমান্তের গোগা, কায়বা ও শিকারপুর এলাকা দিয়ে অহরহ ঢুকছে অস্ত্র ও বিস্ফোরক।

পার্বত্য চট্টগ্রামের পর ভারত থেকে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি অবৈধ অস্ত্র আসে যশোর সীমান্ত দিয়ে; বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও অন্ধ্র প্রদেশ থেকে। এগুলোর মধ্যে বিহারের মুঙ্গেরে তৈরি কাট্টা রাইফেল, বেলঘরিয়ার বেলঘরিয়া পিস্তল, খিদিরপুরের ছক্কা পিস্তল ও মুর্শিদাবাদের ময়ূর পিস্তল রয়েছে। তবে ইদানীং নাইন এমএম পিস্তল ও সিক্স পয়েন্ট ফাইভ এমএম পিস্তল ও রিভলবার (পয়েন্ট ৩৮ ও পয়েন্ট ৩২ বোর) জাতীয় অস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে। আকারে ছোট হওয়ায় চোরাই পথে এগুলো আনা সহজ হয় এবং সহজে লুকিয়ে রাখা যায়।

ধরাছোঁয়ার বাইরে বিক্রেতারা

সম্প্রতি অস্ত্রের সবচেয়ে বড় চালান ধরা পড়ে গত বছরের ৩০ নভেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি সেভেন পয়েন্ট সিক্সটিফাইভ মডেলের পাঁচটি বিদেশি পিস্তল, ১০টি ম্যাগাজিন ও ৫০টি গুলি, সাড়ে চার কেজি গাঁজাসহ লিটন গাজী (৪০) নামের একজনকে আটক করে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। পিস্তলগুলো শার্শা সীমান্ত দিয়ে ঢুকলেও ধরা পড়ে যশোর শহরে। জিজ্ঞাসাবাদে লিটন জানান, এসব অস্ত্র কক্সবাজারে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছিল। ক্রেতা-বিক্রেতা কেউ তাঁর পরিচিত নয়। তিনি বাহকমাত্র।

এর আগে গত ২৯ মে শার্শা উপজেলার পাঁচভুলোট সীমান্ত এলাকা থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি খালি ম্যাগাজিন, দুটি মোবাইল ফোনসহ দুই অস্ত্র ব্যবসায়ীকে আটক করে বিজিবি। ৯ আগস্ট বেনাপোলের পুটখালী সীমান্তে অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল, ৫টি গুলি, দুটি ম্যাগাজিনসহ আক্তারুল ইসলাম (৪০) নামের এক অস্ত্র ব্যবসায়ীকে আটক করে বিজিবি। আক্তারুল পুটখালী গ্রামের উত্তরপাড়ার বাসিন্দা।

চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি বেনাপোলের রঘুনাথপুর এলাকায় সাকিব নামের এক যুবকের বাড়ি থেকে দুটি পিস্তল ও ছয়টি গুলি উদ্ধার করা হয়। থানায় তাঁর বিরুদ্ধে এর আগে এ ধরনের কোনো অভিযোগ ছিল না। পুলিশের ধারণা, নির্বাচন সামনে রেখে অস্ত্রের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় তিনি বাহক হিসেবে এ কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাধারণত দালালেরা ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে যোগাযোগ করিয়ে দেয়। বিক্রেতাদের আগাম টাকা দিতে হয়। পরে যশোর শহরের বাইরের কোনো এলাকা থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করতে বলা হয়।

বিএনপির খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ‘বারবার অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের আটকের দাবি জানালেও আমরা প্রশাসনের আন্তরিকতার অভাব দেখছি। অস্ত্র উদ্ধার এবং প্রবেশ আটকাতে না পারলে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ ব্যাহত হবে।’ জেলা জামায়াতের প্রচার সম্পাদক শাহবুদ্দিন বিশ্বাস বলেন, ‘সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং সন্ত্রাসীদের আটকের দাবি জানাচ্ছি। অন্যথায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি হবে।

যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, ‘সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ভোটের পরিবেশে যাতে বিঘ্ন না ঘটাতে না পারে; সে জন্য অস্ত্র উদ্ধারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় বনশ্রীর ছাত্রীকে খুন করেন তার বাবার হোটেলের কর্মচারী: র‍্যাব

বিএনপি-জামায়াত হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস দিল নতুন জরিপ

ক্রীড়া উপদেষ্টার বক্তব্যে সৃষ্ট ধোঁয়াশা পরিষ্কার করল বিসিবি

‘বাংলাদেশকে নিয়ে তিনটি আশঙ্কা, ভারতে খেলার পরিস্থিতি নেই’

সস্ত্রীক ঢাকায় পৌঁছালেন নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত