Ajker Patrika

কাজ না করেই কাবিখা প্রকল্প শতভাগ বাস্তবায়ন, পিআইও বললেন, ‘আমি সৎ’

এম. কে. দোলন বিশ্বাস, ইসলামপুর (জামালপুর) 
কাজ না করেই কাবিখা প্রকল্প শতভাগ বাস্তবায়ন, পিআইও বললেন, ‘আমি সৎ’
উজান খেওয়ারচর ইকবালের বাড়ি থেকে হজরত আলীর বাড়ি পর্যন্ত রাস্তার কোনো কাজই হয়নি। ছবি: আজকের পত্রিকা

জামালপুরের বকশীগঞ্জে কাজের বিনিময়ে খাদ্যশস্য (কাবিখা) প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, অধিকাংশ প্রকল্পে নামমাত্র কাজ করা হয়েছে। আবার কয়েকটি প্রকল্পের কাজ শুরু না হলেও কাগজে-কলমে শতভাগ বাস্তবায়ন দেখানো হয়েছে। তবে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে নিজেকে ‘খুব সৎ’ দাবি করেছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, কোথায় ও কবে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, তা তাঁরা জানেন না। এমনকি প্রকল্পের কাজ কবে শেষ হয়েছে, সেটিও তাঁদের অনেকের জানা নেই। নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার তিন মাস পরও কয়েকটি প্রকল্পের কাজ শুরু না হওয়ায় উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের নির্বাচনী এলাকাভিত্তিক স্থানীয় এমপি ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের কোটায় গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কারের জন্য কাবিখা কর্মসূচিতে বকশীগঞ্জে তিন দফায় ৪৬ মেট্রিক টন ২০০ কেজি গম বরাদ্দ দেওয়া হয়। এতে সাতটি প্রকল্প নেওয়া হয়। এ ছাড়া দুই দফায় ৩৪ টন ২০০ কেজি চাল বরাদ্দের বিপরীতে নেওয়া হয় আরও পাঁচটি প্রকল্প।

গত জুনের প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে জেলা থেকে প্রকল্পগুলো অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পের সভাপতিদের স্বাক্ষরে খাদ্যগুদাম থেকে চাল-গম উত্তোলন করা হয়। ৩০ জুন প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, উজান খেওয়ারচর ইকবালের বাড়ি থেকে হজরত আলীর বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারে ছয় টন গম বরাদ্দ দেওয়া হলেও রাস্তার একাংশে মাহিন্দ্রা দিয়ে নামমাত্র মাটি ফেলা হয়েছে। প্রকল্পের সভাপতি ও মেরুরচর ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্য খোরশেদা বেগম জানান, তাঁর স্বাক্ষর নিয়ে পিআইও কার্যালয়ের লোকজন গম উত্তোলন করেছেন এবং কিছু কাজও করেছেন।

খেওয়ারচর বাবুর বাড়ি থেকে বাতেনের বাড়ি এবং খোকনের বাড়ি থেকে বাতেনের বাড়ি পর্যন্ত দুটি রাস্তা সংস্কারে ছয় টন করে মোট ১২ টন গম বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেখানে কাজ শুরুই হয়নি। স্থানীয় বাসিন্দা বাবু বলেন, ‘কাজ করতে কেউ আসেনি। বাধ্য হয়ে নিজেরাই স্বেচ্ছাশ্রমে রাস্তার বড় গর্তগুলো মাটি দিয়ে ভরাট করেছি।’

ঘুগরাকান্দি মুন্দিপাড়া ব্রিজসংলগ্ন গোলাপের দোকান থেকে ঘুগরাকান্দি বাজার পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারে নয় টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। স্থানীয় সুজন, আলমাস ও কবীরের দাবি, সেখানে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কাজ হয়েছে।

ঘুগরাকান্দি হজরত আলীর বাড়ি থেকে আবুল খায়ের মাস্টারের বাড়ি মসজিদ পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারে সাত টন গম এবং পূর্ব কলকিহারা নালুর দোকান থেকে বাঘাডোবা ধলা মাস্টারের বাড়ি হয়ে ফকিরপাড়া শান্তিনগর বাজার পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারে ছয় টন ২০০ কেজি গম বরাদ্দ দেওয়া হলেও এ দুটি রাস্তার তেমন কোনো কাজ দেখা যায়নি।

এই তিন প্রকল্পের সভাপতি ও ইউপির সংরক্ষিত নারী সদস্য মোছা. ফরিদার দাবি, ‘স্থানীয় বিএনপির নেতারা প্রকল্পের কাজ ঠিকমতো করেছেন।’ দলীয় নেতারা কেন কাজ করছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দলীয়ভাবে প্রকল্প দেওয়ায় নেতারা কাজ করেছেন।’ তবে প্রকল্পের স্থান দেখাতে বলা হলে তিনি তা বলতে পারেননি।

বাঘাডোবা মাদ্রাসা থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারে ১০ টন গম বরাদ্দ দেওয়া হলেও স্থানীয় কেউ প্রকল্পটির স্থান চিহ্নিত করতে পারেননি। প্রকল্পের সভাপতি ও ইউপি সদস্য আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, ‘আমি ওই প্রকল্পের বিষয়ে কিছুই জানি না। ওটা আমার এলাকাও নয়।’

পূর্ব কলকিহারা পুরমালের বাড়ি থেকে ফুরু মিয়ার বাড়ি হয়ে বৃগদারের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারে পাঁচ টন চাল এবং মেরুরচর সাইফুল ইসলামের বাড়ি থেকে রশিদের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা মেরামতে পাঁচ টন ২০০ কেজি গম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন অভিযোগ করেন, কোথাও নামমাত্র কাজ করে, আবার কোথাও কাজ না করেই পিআইও কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে ভুয়া মাস্টাররোল ও কাগুজে কমিটি দেখিয়ে বরাদ্দের চাল-গম আত্মসাৎ করা হয়েছে।

তবে উপজেলা বিএনপির সভাপতি মানিক সওদাগর বলেন, ‘ইউপি মেম্বাররা কমিটির মাধ্যমে প্রতিটি প্রকল্পের কাজ যথাযথভাবে করেছেন। প্রকল্পের কাজে দলীয় নেতা-কর্মীরা জড়িত নন। আমাদের পক্ষ থেকে পিআইও অফিসে বলা হয়েছে, কোনো ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি যেন না হয়।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুরাদ হোসেন বলেন, ‘আমি প্রকল্পের বিষয়ে ডিটেইলস জানি না। এ বিষয়ে পিআইওর সঙ্গে যোগাযোগ করুন।’

অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. হাবীবুর রহমান সুমন বলেন, ‘আনীত অভিযোগ ভিত্তিহীন। আমি অত্যন্ত সৎ অফিসার। যথাযথভাবে কাজ করা হয়েছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত