Ajker Patrika

দারিদ্র্য ঘোচাতে রাশিয়ায়, ইউক্রেনে যুদ্ধবন্দী সুন্দরগঞ্জের রিমেল

সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি 
আপডেট : ৩১ জুলাই ২০২৬, ২২: ২৫
দারিদ্র্য ঘোচাতে রাশিয়ায়, ইউক্রেনে যুদ্ধবন্দী সুন্দরগঞ্জের রিমেল
রিমেল মিয়া। ছবি: সংগৃহীত

পরিবারের দারিদ্র্য দূর করার স্বপ্ন নিয়ে ২০২৫ সালের মার্চে দেশ ছেড়েছিলেন মো. রিমেল মিয়া (২২)। পরে ঘটনাচক্রে ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে। এখন যুদ্ধবন্দী ইউক্রেনীয় বাহিনীর হাতে। গত ৮ ডিসেম্বর ইউক্রেনীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের পর থেকেই সেখানে একটি ডিটেনশন সেন্টারে যুদ্ধবন্দি হিসেবে আছেন।

রিমেল মিয়া উত্তর মরুয়াদহ গ্রামের সৈয়দ আলী ও রেখা বেগম দম্পতির দ্বিতীয় ছেলে। চার ভাইয়ের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। বড় ভাই এরশাদ আলী ঢাকায় পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। তৃতীয় ভাই রুবেল মিয়া সৌদি আরবে কর্মরত এবং ছোট ভাই সোহেল মিয়া নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

সরেজমিনে রিমেলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, একটি ছোট ঝুপড়ি ঘরে পরিবারটি মানবেতর জীবনযাপন করছে। অভাব-অনটনের মধ্যে সংসারের একমাত্র ভরসা ছিলেন রিমেল। তাই অনেক আশা নিয়ে বাবা-মা ধারদেনা করে তাঁকে বিদেশে পাঠান।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, রিমেল স্থানীয় শোভাগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০২২ সালে এসএসসি পাস করেন। এরপর ২০২৪ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। কিন্তু বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতির কারণে আর পরীক্ষা সম্পন্ন করেননি।

সম্প্রতি ইউক্রেনের একটি ডিটেনশন সেন্টার থেকে জুমের মাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রিমেল বলেন, ‘আমার পরিবার জানে না আমি কোথায় আছি, আমি বেঁচে আছি নাকি মারা গেছি। এই সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে অন্তত তারা জানতে পারবে যে, আমি এখনো বেঁচে আছি।’

রিমেলের ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়ায় গিয়ে তিনি প্রথমে একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে মাসে ৭০০ ডলার বেতনে কাজ শুরু করেন। পরে কাজ হারিয়ে বৈধভাবে থাকার উপায় খুঁজতে গিয়ে রুশ সেনাবাহিনীর চুক্তিতে সই করেন। চুক্তিপত্রটি রুশ ভাষায় হওয়ায় তিনি সেটির কিছুই বুঝতে পারেননি। উচ্চ বেতন ও রাশিয়ার নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও মাত্র তিন দিনের প্রশিক্ষণের পর তাঁকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে প্রায় এক মাস একটি বাংকারে দায়িত্ব পালনের পর ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর ইউক্রেনীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন।

রিমেলের বাবা সৈয়দ আলী স্থানীয় শোভাগঞ্জ বাজারে একটি ছোট পানের দোকান চালিয়ে কোনোমতে সংসার চালান। তিনি বলেন, ‘ধারদেনা করে ছেলেকে বিদেশ পাঠাই। রাশিয়া যাওয়ার পর পাঁচ-ছয় মাস আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। এরপর তার আর কোনো খোঁজ পাইনি। সে কেমন আছে, বেঁচে আছে কি না কিছুই জানতাম না। পত্রিকায় দেখে জানতে পারলাম আমার ছেলে জীবিত আছে। আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ করছি, তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হোক।’

রিমেলের মা রেখা বেগম বলেন, ‘ছেলের কোনো খোঁজ না পেয়ে প্রতিদিন আল্লাহর কাছে কেঁদে কেঁদে দোয়া করেছি। মনে হতো হয়তো আর কোনো দিন আমার ছেলেকে দেখতে পাব না। এখন জানতে পেরেছি সে বেঁচে আছে। আমি শুধু আমার ছেলেকে একবার বুকে জড়িয়ে ধরতে চাই। সরকার যেন আমার ছেলেকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনে।’

প্রতিবেশী মাহমুদা বেগম বলেন, ‘রিমেল পরিবারের জন্য নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে বিদেশে গিয়েছিল। প্রায় এক বছর কোনো খোঁজ না থাকায় পুরো গ্রামই তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিল। এখন সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবি, তাকে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা হোক।’

স্থানীয় আলম মিয়া বলেন, ‘রিমেলের ঘটনা আমাদের জন্য বড় শিক্ষা। কাজের আশায় বিদেশে গিয়ে সে যুদ্ধবন্দি হয়েছে। সরকার কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে তাকে ফিরিয়ে আনুক। একই সঙ্গে বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণার বিষয়েও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।’

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ফোর্টিফাই রাইটস ও ইউক্রেনভিত্তিক ট্রুথ হাউন্ডসের তথ্য অনুযায়ী, কাজের প্রলোভনে রাশিয়ায় যাওয়া অনেক বাংলাদেশি পরে বিভিন্নভাবে রুশ সেনাবাহিনীতে যুক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকে যুদ্ধে নিহত হয়েছেন, আবার কেউ যুদ্ধবন্দি হয়েছেন।

বর্তমানে ইউক্রেনের ডিটেনশন সেন্টারে থাকা রিমেলসহ তিন বাংলাদেশি যুদ্ধবন্দিই বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগে নিরাপদে দেশে ফিরতে চান।

এ বিষয়ে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি ও গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লার বক্তব্য জানতে বার বার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁদের পাওয়া যায়নি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত