Ajker Patrika

হঠাৎ মরক্কো থেকে কেন স্পেনে অভিবাসীর ঢল, এক দিনে ঢুকল ৪৯ হাজার

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ৩১ জুলাই ২০২৬, ১৭: ০৪
হঠাৎ মরক্কো থেকে কেন স্পেনে অভিবাসীর ঢল, এক দিনে ঢুকল ৪৯ হাজার
স্পেনের উত্তর আফ্রিকার অংশ সেউতায় মরোক্কো থেকে শত শত লোক সীমান্ত পরিয়ে ঢুকে পড়ছে। ছবি: এএফপি

স্পেনের উত্তর আফ্রিকান অঞ্চল সেউতায় গত ২৪ ঘণ্টায় মরক্কো থেকে স্থল ও পানিপথে প্রায় ৪৯ হাজার অভিবাসনপ্রত্যাশী প্রবেশ করেছে বলে ধারণা করছেন কর্মকর্তারা। গতকাল বৃহস্পতিবারের বিভিন্ন ভিডিও ও ছবিতে হাজার হাজার মানুষকে সাঁতরে এই শহরে ঢুকতে দেখা যায়। স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সারা রাত ধরে এই অনুপ্রবেশ অব্যাহত ছিল। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এই ভূখণ্ডে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে অন্তত ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট এই মাসেই একটি আদেশ দেন। তাতে বলা হয়, সেউতা বা স্পেনের আরেক ছিটমহল মেলিলায় পৌঁছানোর চেষ্টা করার সময় সমুদ্রে ধরা পড়া অভিবাসীদের সোজাসুজি বা অবিলম্বে মরক্কোতে ফেরত পাঠানো যাবে না। এই আদেশের পরপরই এমন ঘটনা ঘটল।

মরক্কোর উত্তর উপকূলে অবস্থিত সেউতা জিব্রাল্টার প্রণালি দিয়ে মূল স্পেন থেকে বিচ্ছিন্ন। এটি দীর্ঘদিন ধরেই ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করা অভিবাসীদের জন্য একটি প্রধান কেন্দ্র। সম্প্রতি অনুপ্রবেশের চেষ্টা বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় কর্মকর্তারা মাদ্রিদের (স্পেন সরকার) কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছিলেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি ভেঙে পড়ায় চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

স্পেনীয় কর্মকর্তাদের এই অভাবনীয় হিসাব বলছে, গত এক দিনে সেউতায় যে সংখ্যক অভিবাসী ঢুকেছেন, তা শহরটির মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি। সর্বশেষ স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, শহরের জনসংখ্যা প্রায় ৮৩ হাজার ৬০০ জন। পরে স্পেন সেউতা এবং তার প্রতিবেশী শহর মেলিলায় নিরাপত্তা জোরদার করতে তাদের সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করে। মেলিলাতেও সারা রাত ৩-৪ শ মানুষের ঢোকার খবর পাওয়া গেছে।

মরক্কো এই দুটি শহরই দাবি করে আসছে। ফলে শহর দুটি নিয়ে স্পেনের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েন দীর্ঘদিনের। অন্যদিকে মাদ্রিদের দাবি, এই অঞ্চল দুটি স্পেনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং স্পেনের মূল ভূখণ্ডের আধা স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলগুলোর মতোই একই মর্যাদা বহন করে। আফ্রিকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র স্থল সীমান্ত কিন্তু এই দুটিই।

মরক্কো থেকে সীমান্ত পেরিয়ে আসা এই মানুষের বেশির ভাগই তরুণ ও পুরুষ। তবে এই ভিড়ের মধ্যে নারী, শিশু এমনকি শিশুসন্তানও রয়েছে। কর্মকর্তারা আনুমানিক হিসাব দিয়ে বলছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় অবৈধভাবে ঢোকা মানুষদের মধ্যে অন্তত ৭ হাজার জন অপ্রাপ্তবয়স্ক।

সাধারণত সেউতায় ঢোকার জন্য অভিবাসীরা আরও দূরের উপকূল থেকে কয়েক কিলোমিটার সাঁতরে আসেন। কিন্তু এবার তাদের খুব সহজেই সীমান্ত বেড়ার একদম কাছে চলে আসতে দেখা গেছে। শুরুতে কেউ কেউ জেটির পাথর ঘেঁষে এবং এর শেষ প্রান্ত ঘুরে হেঁটে এসেছিলেন, তবে অধিকাংশকেই সমুদ্রের দিকে সাঁতরে অন্য পাশের সৈকতে পৌঁছাতে হয়েছে।

এ সময় মরক্কোর সীমান্তরক্ষীরা কোথায় ছিলেন এবং কেন তাঁরা অভিবাসীদের ছত্রভঙ্গ বা প্রতিরোধ করেননি, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কয়েক দিন ধরেই সাঁতরে সেউতায় আসার প্রবণতা বাড়ছিল, এরপরই বৃহস্পতিবার একবারে বিশাল মানুষের ঢল নামে। মনে করা হচ্ছে, যারা আগে সফল হয়েছেন, তাদের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল।

এর আগে ২০২১ সালেও একইভাবে বিশালসংখ্যক মানুষের আগমন ঘটেছিল, যদিও তা বর্তমানের মতো এত বড় ছিল না। ওই সময় পশ্চিম সাহারার সার্বভৌমত্ব নিয়ে মাদ্রিদের সঙ্গে বিরোধের জেরে মরক্কো কর্তৃপক্ষ প্রায় ৮ হাজার মানুষকে সীমান্ত পেরোতে দিয়েছিল।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সম্প্রতি আলজেরিয়া সফর করায় এই কূটনৈতিক বিরোধটি আবার চাঙা হয়ে উঠেছে। কারণ, আলজেরিয়া পশ্চিম সাহারার স্বাধীনতাকে সমর্থন করে। স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যারা অবৈধভাবে স্পেনের মাটিতে ঢুকেছে, তাদের ‘যত দ্রুত সম্ভব’ ফেরত পাঠাতে তারা মরক্কোর সঙ্গে কাজ করছে। আজ শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী সানচেজের সেউতা সফরের কথা রয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে শুক্রবার সারা রাত অনুপ্রবেশ এবং সীমান্ত এলাকায় পুলিশ ও অভিবাসীদের মধ্যে সংঘর্ষ অব্যাহত ছিল বলে স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে।

মরক্কো থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশের এই ঢল ঠিক কী কারণে শুরু হলো, কিংবা তা ঠেকাতে মরক্কো কর্তৃপক্ষ কতটুকু চেষ্টা করেছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়। একপর্যায়ে স্পেনের এক কর্মকর্তা জানান, সীমান্তব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সেউতার এই ঘটনা নিয়ে খুব দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি সেখানকার দৃশ্যগুলোকে ‘ধাক্কা দেওয়ার মতো’ বা ‘স্তম্ভিত করার মতো’ বলে অভিহিত করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন যে, এমন ‘নিয়ন্ত্রণহীন অভিবাসন’ ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তিনি আরও জানান, স্পেন থেকে মুক্ত চলাচলের সুবিধাসংক্রান্ত শেনজেন জোন চুক্তি স্থগিত করার বিষয়টি ইতালি বিবেচনা করবে। যদিও বাস্তবে এটি কেমন করে কার্যকর হবে, তা স্পষ্ট নয়। কারণ, দেশ দুটি প্রতিবেশী নয় এবং নথিপত্রহীন অভিবাসীরা বিমানে উঠবেন—এমন সম্ভাবনা কম।

যাই হোক, যাঁরা সেউতায় পৌঁছেছেন তাঁরা এখন সেখানেই আটকে আছেন, তাঁরা কিন্তু স্পেনের মূল ভূখণ্ডে পৌঁছাতে পারেননি। ইতালীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের মতোই মন্তব্য করেছিলেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি। তার ব্যাপারে স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোসে ম্যানুয়েল আলবারেস অভিযোগ করে বলেন, রাজনীতি করার জন্য অভিবাসন ইস্যুটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘একটি বন্ধু ও অংশীদার দেশের কাছ থেকে এমন মন্তব্য অনুচিত, যাদের কাছে আমরা ইউরোপীয় সংহতি প্রত্যাশা করি, কোনো দলীয় রাজনীতি বা সস্তা প্রচার নয়।’ এই ঘটনায় তিনি শুক্রবার মাদ্রিদে নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূতকেও তলব করেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত