Ajker Patrika

ফেনীতে প্রসূতির মৃত্যু: তদন্তে একাধিক অবহেলা ও চিকিৎসাগত ত্রুটির প্রমাণ

ফেনী প্রতিনিধি
ফেনীতে প্রসূতির মৃত্যু: তদন্তে একাধিক অবহেলা ও চিকিৎসাগত ত্রুটির প্রমাণ
নাঈমা আক্তার লিজা। ছবি: সংগৃহীত

ফেনী সদর উপজেলায় ওয়ান স্টপস মেটারনিটি ক্লিনিকে অস্ত্রোপচারে প্রসূতি নাঈমা আক্তার লিজার মৃত্যুর ঘটনায় কর্তৃপক্ষের একাধিক অবহেলা ও চিকিৎসাগত ত্রুটির প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। একই সঙ্গে প্রতিবেদনে প্রসূতির মৃত্যুর নির্দিষ্ট কারণও উঠে এসেছে। তবে গাফিলতির প্রমাণ মিললেও তদন্ত কমিটির পক্ষ থেকে ক্লিনিকটির কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়নি।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের প্রাথমিক ও চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণে ঘটনাটিকে গুরুতর চিকিৎসাগত গাফিলতি হিসেবে চিহ্নিত করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অস্ত্রোপচারের সময় নির্ধারিত চিকিৎসা প্রটোকল অনুসরণ করা হয়নি এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও পরবর্তী চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায়ও ঘাটতি ছিল। অস্ত্রোপচারের পর রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলেও সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

তদন্তে আরও উঠে আসে, ছনুয়া ও মোটবী ইউনিয়নের দুই পরিবার পরিকল্পনাকর্মী—গীতা রানী দাসসহ অপর একজন রোগীকে সরকারি হাসপাতালে না পাঠিয়ে সরাসরি ওই ক্লিনিকে নিয়ে আসেন; যা তাঁদের দায়িত্বের পরিপন্থী। তাঁদের বিরুদ্ধে রোগীদের আলট্রাসাউন্ড ও অ্যান্টিবায়োটিক পরামর্শ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

তদন্ত কমিটির প্রধান ফেনী জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট (অ্যানেসথেসিয়া) মো. আবদুল্যাহ আব্বাসী বলেন, অভিযুক্ত গাইনি চিকিৎসক নাসরীন আক্তার মুক্তার গাফিলতির কারণেই প্রসূতি সংকটাপন্ন অবস্থায় পড়েন। তিনি যথাসময়ে রোগীকে ফলোআপ বা তদারকি করলে হয়তো তাঁকে বাঁচানো যেত।

প্রসূতির মৃত্যুর কারণ হিসেবে তদন্ত কমিটির প্রধান বলেন, সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ অর্থাৎ পোস্টপার্টাম হেমোরেজ হয়েই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। অস্ত্রোপচারের পর রক্তক্ষরণ শুরু হলে নার্সরা চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব দেননি। এতে রোগীর অবস্থা দ্রুত অবনতি ঘটে।

আবদুল্যাহ আব্বাসী আরও বলেন, ক্লিনিকটিতে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্তই চিকিৎসক উপস্থিত থাকতেন; বাকি সময় প্রতিষ্ঠানটি চালাতেন সেকমোরা (সাব অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার)। চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় এটি বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। এ ছাড়া রোগীর শারীরিক জটিলতা দেখা দেওয়ার পর তাঁকে অন্য ক্লিনিকে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তা ছিল বিলম্বিত, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। একই সঙ্গে ক্লিনিকটির লাইসেন্স, অপারেশন থিয়েটারের মান এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের যথাযথতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

তবে শাস্তির সুপারিশ প্রসঙ্গে তদন্ত কমিটির প্রধান আবদুল্যাহ আব্বাসী বলেন, ‘আমরা সরাসরি শাস্তির সুপারিশ করিনি; বরং পুরো ব্যবস্থার সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছি। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ে দালালের মাধ্যমে রোগী আনা, পরিবার পরিকল্পনাকর্মীদের অনিয়ন্ত্রিত চিকিৎসা পরামর্শ এসব বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।’

জানতে চাইলে ফেনীর সিভিল সার্জন রুবাইয়াত বিন করিম আজকের পত্রিকাকে বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনে গাফিলতি ও অব্যবস্থাপনার প্রমাণ পাওয়া গেছে। দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তির সুপারিশসহ প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে জেলা প্রশাসনের গঠিত অপর তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এখনো জমা পড়েনি বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এ কে এম ফয়সাল। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্টদের অভিযোগের বিষয়ে শুনানি শেষ হয়েছে। শিগগির প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।

এর আগে ১১ এপ্রিল ওয়ান স্টপস মেটারনিটি ক্লিনিকে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন প্রসূতি নাঈমা আক্তার লিজা। পরে তাঁকে ফেনীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখান থেকে চট্টগ্রামে স্থানান্তর করা হয়। পথে তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তিন চিকিৎসকসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে ফেনী মডেল থানায় মামলা করেন লিজার বাবা মোহাম্মদ নুর করিম।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

যুক্তরাষ্ট্রে দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী খুন: মিথ্যা জবানবন্দি দিয়ে ধরা খেল খুনি, প্রকাশ্যে রোমহর্ষক তথ্য

ময়মনসিংহ মহানগর পুলিশ গঠনসহ ৭ দাবি পুলিশের

৩ দিনের মধ্যে বিস্ফোরিত হতে পারে ইরানের তেল অবকাঠামো: ট্রাম্প

কুমিল্লায় কাস্টমস কর্মকর্তাকে চলন্ত অটোরিকশা থেকে ফেলে হত্যা করে ছিনতাইকারীরা: র‍্যাব

এবার এলপিজি কার্ডের ঘোষণা দিলেন প্রধানমন্ত্রী

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত