Ajker Patrika

‘ওরা আমার পেটের সন্তানরে মাইর‍্যা ফেলছে, স্বামীকে কী জবাব দেব?’

ফরিদপুর প্রতিনিধি
আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৬, ২২: ০৭
‘ওরা আমার পেটের সন্তানরে মাইর‍্যা ফেলছে, স্বামীকে কী জবাব দেব?’
ময়না আক্তার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ছবি: আজকের পত্রিকা

‘আমার পেটে তিন মাসের বাচ্চা, আমারে মারিস না তোরা। তবু ওরা শোনে নাই, লাঠি দিয়ে আমারে মারতে থাকে, মাটিতে ফেলায় দিয়ে পা দিয়ে পাড়াতে থাকে। আর বলে—‘‘ওর ডেলিভারি এখনই করায় দেব।’’ ওরা আমার পেটের সন্তানরে মাইর‍্যা ফেলছে, আমার স্বামীকে কী জবাব দেব?’—হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে এভাবেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন ময়না আক্তার (২২) নামের এক গৃহবধূ।

ময়না আক্তারের অভিযোগ, প্রবাসফেরত বোনকে মারধরের খবর পেয়ে বাঁচাতে ছুটে গিয়েছিলেন তারা তিন বোন। এ সময় বোনের বাড়িতে হামলা ও আক্রমণের দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করতে গিয়ে প্রতিপক্ষের নির্মম নির্যাতন ও লাঠির আঘাতে তাঁর গর্ভে থাকা তিন মাসের সন্তানের মৃত্যু হয়। পরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গর্ভপাত হয় তাঁর।

আজ সোমবার বিকেলে গর্ভপাতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের জ্যেষ্ঠ সেবিকা মিনতি সরকার।

ময়না আক্তার জেলার নগরকান্দা উপজেলার মালয়েশিয়াপ্রবাসী আব্দুল জলিলের স্ত্রী। গত শুক্রবার (১৭ জুলাই) বিকেলে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁকে এবং বর্তমানে সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

ময়না আক্তারের মেজ বোন লাভলী বেগম জানান, তাঁরা চার বোন উপজেলার ভাষাণচর ইউনিয়নের নতুনবাজার গ্রামের আব্দুল জলিল খানের মেয়ে। অভাবের সংসারে হাল ধরতে প্রায় ১৫ বছর আগে লেবানন পাড়ি জমিয়েছিলেন বড় বোন পারভীন বেগম (৪৬)। ১০ বছর আগে পার্শ্ববর্তী চরবিষ্ণুপুর ইউনিয়নের বালাডাঙ্গা এলাকায় জমি ক্রয় করেন তিনি। পরে ওই জমিতে বসতঘর নির্মাণ করে বসবাস করে আসছেন। তাঁর স্বামী না থাকায় একাই থাকেন এবং মাটিকাটার শ্রমিক হিসেবে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন।

লাভলী বেগম অভিযোগ করেন, তাঁর বোনের বাড়িটি দখলে নিতে প্রতিবেশী মজিবর, মোজাফফর, বাবুল ও শহিদ নামের কয়েক ব্যক্তি বিভিন্ন সময় অত্যাচার ও নির্যাতন চালিয়ে আসছেন। ঘটনাটি নিয়ে থানা-পুলিশকে জানালেও কোনো বিচার পাননি। সর্বশেষ গত শুক্রবার তাঁর বোনকে মারধর এবং বাড়িতে হামলা চালান দুই প্রতিবেশী। খবর পেয়ে তাঁর ছোট বোন ময়নাসহ তিন বোন ছুটে যান। ঘটনার সময় ছোট বোন ময়না মোবাইল ফোনে দৃশ্য ধারণ করছিলেন। একপর্যায়ে সেটি দেখে ফেলেন প্রতিপক্ষের লোকজন। এরপর তাঁকে এলোপাতাড়ি লাঠিপেটা করা হয়। এ সময় পেটে তিন মাসের সন্তান রয়েছে বলে বাঁচার আকুতি জানালেও নির্যাতন থামেনি প্রতিপক্ষের লোকজনের। পরে গুরুতর আহতাবস্থায় ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন তাঁরা এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে গর্ভপাত হয় ময়নার। এ ঘটনায় থানায় মামলা করতে গেলেও তাঁরা হয়রানির শিকার হন বলে অভিযোগ করেন।

লাভলী বলেন, ‘হামলার সময় ৯৯৯-এ ফোন দিলে পুলিশ মজিবরকে আটক করে নিয়ে যায়। পরে রাতে মামলা করতে গেলে মজিবরকে আসামি বাদ দিয়ে মামলা করতে বলা হয়। আমার ছোট বোনের গর্ভের সন্তান মারা যাওয়ার বিষয়টিও বাদ দিয়ে একটি মামলা নিয়েছে। ওই মামলার দুই দিন পরেই আসামিরা আদালত থেকে জামিন নিয়ে এখন আবারও আমার বড় বোনকে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। আমরা সরকারের কাছে ন্যায়বিচার চাই, অসহায় বলে কি আমরা বিচার পাব না?’

এদিকে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, প্রসূতিবিদ্যা বিভাগে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ময়না আক্তার। তাঁর পাশে বসে বড় বোন পারভীন বেগম অঝোরে কাঁদছেন।

এ সময় পারভীন বেগম বলেন, ‘কষ্ট করে টাকা জমিয়ে বাড়ি করেছি। পরে আমার বাড়ির দুই পাশে আরও দুইজন এসে বাড়ি করে। এর পর থেকে আমাকে তাড়িয়ে দিতে অত্যাচার করে আসছে। আমি পুলিশের কাছে গেলেও কোনো বিচার পাইনি। আর আমার ছোট বোন তো কোনো অন্যায় করে নাই, ওর পেটের সন্তানরেও ওরা মেরে ফেলছে।’

গর্ভপাতের বিষয়ে জ্যেষ্ঠ সেবিকা মিনতি সরকার আজকের পত্রিকাকে বলেন, রোগীকে মারধরের কারণে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হওয়ায় গর্ভের ভ্রুণ নষ্ট হয়ে যায়। পরে তাঁর গর্ভপাত হয়েছে।

এ বিষয়ে প্রতিপক্ষের লোকজনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে সদরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল আল মামুন শাহ হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, এ ঘটনায় থানায় একটি মামলা হয়েছে। এ ছাড়া মামলায় ভ্রুণ নষ্টের বিষয়ে জানতে চাইলে ব্যস্ত আছেন বলে জানান ওসি।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত