সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান

সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করা এবং আইন বাস্তবায়নে জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন বক্তারা। পাশাপাশি দুর্ঘটনার নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে শক্তিশালী ডেটা সেল গঠন এবং পরিবহন খাতগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।
আজ সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আয়োজিত ‘সড়ক নিরাপত্তা আইন: বর্তমান প্রেক্ষিত ও সরকারের অঙ্গীকার’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। বৈঠকে সঞ্চালনা ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নিসচার মহাসচিব লিটন এরশাদ।
তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়। এর সঙ্গে পরিবহন ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো, আইন প্রয়োগ, চালকদের প্রশিক্ষণ, যাত্রী সচেতনতা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের বিষয় জড়িত। তাই দুর্ঘটনা কমাতে বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপের পরিবর্তে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
বৈঠকে সড়ক দুর্ঘটনার নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের জন্য কার্যকর ‘রোড সেফটি ডেটা সেল’ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। বক্তারা বলেন, দুর্ঘটনা প্রবণ এলাকা, দুর্ঘটনার কারণ, হতাহতের সংখ্যা, যানবাহনের ধরন, সড়কের অবস্থা ও আইন লঙ্ঘনের তথ্য নিয়মিত বিশ্লেষণ করা গেলে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ সহজ হবে। পাশাপাশি গৃহীত পদক্ষেপের অগ্রগতিও মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
পরিবহন খাতগুলোর মধ্যে প্রশাসনিক সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়। বক্তারা সড়ক, নৌ, রেল ও বিমানপথের পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা একই মন্ত্রণালয়ের আওতায় এনে সমন্বিতভাবে পরিচালনার বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানান। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা ও তুলনামূলক গবেষণার ওপরও গুরুত্ব দেন তাঁরা।
বৈঠকে জাতিসংঘের ‘সেফ সিস্টেম’ পদ্ধতি অনুসরণের পাশাপাশি গতিনিয়ন্ত্রণ, চালকদের দক্ষতা ও প্রশিক্ষণ, কর্মপরিবেশ, যানবাহনের নিরাপত্তা, পথচারীদের সুরক্ষা এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার ও চিকিৎসা নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনা হয়।
বক্তারা বলেন, শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন কিংবা আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। এ জন্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠন, সরকারি সংস্থা, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে সম্পৃক্ত করে কার্যকর কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর বাস্তবায়ন পর্যালোচনা করে প্রস্তাবিত সড়ক নিরাপত্তা আইনে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব নির্ধারণ, নিয়মিত তদারকি এবং অগ্রগতি প্রকাশের ব্যবস্থা রাখার মত দেন বক্তারা। জাতিসংঘের সড়ক নিরাপত্তা কর্মদশক ২০২১-২০৩০-এর লক্ষ্য অর্জনে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা, সময়সীমা ও অগ্রগতি পরিমাপের সূচক নির্ধারণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি বক্তব্য দেন নিসচার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মিরাজুল মইন জয়। তিনি বলেন, সড়কে নিরাপত্তা জোরদারে নিসচার স্বপ্নদ্রষ্টা ইলিয়াস কাঞ্চনের দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়ায় সরকারকে সাধুবাদ জানাই। গোলটেবিল বৈঠকের সারসংক্ষেপ ও অংশীজনদের মতামতের আলোকে ২০২৭ সালের মধ্যে সড়ক নিরাপত্তা আইন বাস্তবায়িত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
নিসচার প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন ভার্চ্যুয়ালি বক্তব্যে বলেন, গত ৩৩ বছর ধরে নিসচা সড়ক নিরাপত্তায় জনসচেতনতা তৈরি, দুর্ঘটনা প্রতিরোধের দাবি জানানো এবং মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার কাজ করছে। ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ প্রণয়নের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নে সরকারের উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন।
বৈঠকে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিআরটিএর চেয়ারম্যান হাবীবুর রহমান, বিআরটিসির চেয়ারম্যান মীর আহমেদ তারিকুল ওমর, বিএফইউজের মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী, দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক আবদুল হাই শিকদার, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, বুয়েটের অধ্যাপক ও সড়ক বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. আইয়ুব ভুঁইয়া, হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপারেশন্স) মুনতাসিরুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান প্রমুখ।
বৈঠকে নিসচার পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত সড়ক নিরাপত্তা আইন পর্যালোচনা, অংশীজনদের মতামত তুলে ধরা এবং আইন বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে সরকারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার প্রস্তুতির কথা জানানো হয়।









