Ajker Patrika

সাভার ও সাটুরিয়া

বেদখলে থাকা সরকারি জমি উদ্ধারে গড়িমসি

  • প্রায় ২৩ একর জমি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলে।
  • বসতি স্থাপনের সুযোগ দিয়ে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ প্রভাবশালীদের।
  • জমি উদ্ধারে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ নেই।
অরূপ রায়, সাভার 
বেদখলে থাকা সরকারি জমি উদ্ধারে গড়িমসি

ঢাকা ও মানিকগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় খাসজমি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন প্রায় ২৩ একর জমি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলে রয়েছে। এসব জমি উদ্ধারে গড়িমসির অভিযোগ উঠেছে প্রশাসনের বিরুদ্ধে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ নথি গায়েব হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

খাসজমি উদ্ধারে দুই দপ্তরের দুই বক্তব্য

সাভারের খঞ্জনকাঠি ও ঘোড়াদিয়া মৌজার অন্তত ২০ একর খাসজমি অবৈধভাবে দখল করে কয়েক শ লোক দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসবাস করছে।

অভিযোগ রয়েছে, একটি প্রভাবশালী চক্র সরকারি জমিতে বসতি স্থাপনের সুযোগ দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে।

২০২৫ সালের মে মাসে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করে অবৈধ দখলদারদের তালিকা পাওয়ার পর ওই বছরের জুলাই মাসে সহকারী কমিশনারের কার্যালয়ে (সাভার রাজস্ব সার্কেল) উচ্ছেদ কার্যক্রমের অগ্রগতি জানতে চাওয়া হয়। জবাবে উপজেলা ভূমি অফিস জানায়, উচ্ছেদের জন্য প্রয়োজনীয় নথি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একই বিষয়ে আবেদন করলে জানানো হয়, এমন কোনো নথি তাদের কাছে পাঠানো হয়নি।

একই বিষয়ে দুই সরকারি দপ্তরের এমন বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে উচ্ছেদ অভিযান থেমে আছে বলে মনে করেন ঢাকা জজকোর্টের আইনজীবী সোহেল আল মামুন।

সপ্তাহখানেক আগে ওই এলাকায় গিয়ে (ঘোড়াদিয়া ও খঞ্জনকাঠি) দেখা যায়, নদীর তীর ঘেঁষে কয়েক শ গজ জুড়ে গড়ে উঠেছে সারি সারি বসতবাড়ি। এসব বাড়িতে অনেক পরিবার বসবাস করছে। অধিকাংশ ঘরই আধা পাকা।

বাসিন্দাদের কয়েকজন বলেন, জমি দখল এবং ঘর নির্মাণের সময় সরকারি কোনো সংস্থা বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাধা দেওয়া হয়নি। তবে কয়েক মাস আগে সরকারি কর্মকর্তারা তাঁদের তথ্য সংগ্রহ করে নিয়ে গেছে।

ধামরাইয়ে উচ্ছেদের নথিই উধাও

কিছু লোক ঢাকার ধামরাই উপজেলার নান্দেশ্বরী মৌজার খাসজমি দখল করে পাকা এবং আধা পাকা স্থাপনা নির্মাণ করে দীর্ঘদিন ধরে দখলে রেখেছে। দখলের প্রায় সাত বছর পার হলেও তাদের উচ্ছেদে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি।

২০১৯ সালে তথ্য অধিকার আইন ব্যবহার করে অবৈধ দখলদারদের বিষয় জানতে চাইলে ধামরাই উপজেলা প্রশাসন থেকে দখলদারদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়। ওই তালিকা অনুযায়ী উচ্ছেদ নথি তৈরি করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়। কিন্তু ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে অগ্রগতি জানতে চাইলে জেলা প্রশাসন জানায়, উচ্ছেদ-সংক্রান্ত নথি হারিয়ে গেছে।

পরে নতুন করে নথি প্রস্তুতের নির্দেশ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত জমি উদ্ধারের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

শতকোটি টাকার জমি বেদখল, বছরের পর বছর নীরব প্রশাসন

সাভারের কাউন্দিয়া ইউনিয়নের অন্তত ২ একর ৩৪ শতাংশ খাসজমি দীর্ঘদিন ধরে বেদখলে রয়েছে। স্থানীয় সূত্রগুলোর হিসাবে এসব জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা।

২০১৬ সালে দখল বিষয়ে তথ্য জানতে চাইলে আমিনবাজার রাজস্ব সার্কেল থেকে জানানো হয়, কাউন্দিয়ায় কোনো খাসজমি বেদখল হয়নি। পরে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করে ২০১৭ সালে পুনরায় তথ্য চেয়ে সহকারী কমিশনারের কার্যালয়ে (আমিনবাজার রাজস্ব সার্কেল) আবেদন করা হলে অবৈধ দখলদারদের তালিকা প্রস্তুত করে উচ্ছেদসংক্রান্ত নথি জেলা প্রশাসনে পাঠানো হয়। কিন্তু আট বছর পরও জমি উদ্ধারে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।

২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে অগ্রগতি জানতে চেয়ে পুনরায় তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করা হলে জেলা প্রশাসন থেকে কোনো তথ্য সরবরাহ করা হয়নি।

জানতে চাইলে ঢাকার জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম বলেন, ‘বিষয়গুলো আমার জানা নেই। খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেব।’

সরকারি স্কুলের জমি উদ্ধারে গড়িমসি

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার রাধানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জমি অবৈধ দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ নথি প্রস্তুত হওয়ার পর জেলা প্রশাসন থেকে স্থাপনা ভেঙে নেওয়ার জন্য দখলদারদের নোটিশ দেওয়া হয়। তিন বছরের বেশি সময় ধরে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বারবার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি উচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু হলেও দখলদারদের আপত্তির কারণে জেলা প্রশাসন তা স্থগিত করে দেয়।

বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জমি উদ্ধারের উদ্যোগ জোরদার করার পরিবর্তে বিদ্যালয়ের পক্ষে কাজ করা ব্যক্তিদেরই জেলা প্রশাসন থেকে বিভিন্নভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা চলছে। এ প্রসঙ্গে মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে উচ্ছেদ অভিযান স্থগিত করা হয়েছে। পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয় লিখিতভাবে জানানো হবে।’

বিএডিসির জমি দখলের অভিযোগ

ঢাকার সাভার মৌজায় বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) মালিকানাধীন ৩৩ শতাংশ জমি ও স্থাপনা আব্দুল মোমিন নামের এক ব্যক্তিকে লিজ (ইজারা) দেওয়া হয়। তিনি লিজ নিয়ে শর্ত ভঙ্গ করে ওই সম্পত্তি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করছেন।

২০১৯ সালে তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে আবেদন করে বিষয়টি বিএডিসির নজরে আনা হলে কর্তৃপক্ষ অভিযোগের সত্যতা পায়। পরে লিজ বাতিল করে জমি ও স্থাপনা ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু লিজগ্রহীতা হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন।

২০২৫ সালে পুনরায় তথ্য চেয়ে আবেদন করে জানা যায়, রিট বিচারাধীন থাকায় এখনো উচ্ছেদ কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয়নি। তবে দীর্ঘ ছয় বছরেও মামলা নিষ্পত্তি বা রাষ্ট্রপক্ষের আইনগত তৎপরতা সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য সরবরাহ করা হয়নি।

গত মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, ৩৩ শতাংশ ভূমির এক অংশে একটি পাকা গুদামঘর এবং স্টাফদের আবাসনের জন্য নির্মিত একটি ভবন রয়েছে, যা বর্তমানে পরিত্যক্ত ও ব্যবহারের অনুপযোগী। এসব স্থাপনার পাশেই পরে আরও কয়েকটি আধা পাকা ও কাঁচা ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এগুলো লিজগ্রহীতার পক্ষ থেকে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ভাড়াটে জানান, লিজগ্রহীতা মোমিন কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। তবে তাঁর প্রতিনিধিত্বকারী একজন ব্যক্তি নিয়মিতভাবে প্রতি মাসের শেষে এসে তাঁদের কাছ থেকে ভাড়া আদায় করেন।

বিএডিসির আইন বিভাগের উপপরিচালক মো. গোলাম রব্বানী বলেন, ‘রিটের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমাদের আইনজীবীকে জানানো হয়েছে। কিন্তু তিনি এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেননি। বিষয়টি নিয়ে ওই আইনজীবীর সঙ্গে আবার কথা বলে দেখব, কী করা যায়।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত