Ajker Patrika

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর: তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে যা উঠে এল

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৬, ২১: ০৪
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর: তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে যা উঠে এল
ফাইল ছবি । ছবি: আজকের পত্রিকা

গত বছরের ২১ জুলাই রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় ৩৬ জনের প্রাণহানি এবং ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির পেছনে পাইলটের উড্ডয়ন প্রশিক্ষণের ঘাটতি ও যথাযথ তত্ত্বাবধানের অভাব ছিল বলে তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ঘটনার পর গঠিত ৯ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিশন তিন মাসের বেশি সময় ধরে তদন্ত শেষে এই প্রতিবেদন জমা দেয়।

পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিমানটির যান্ত্রিক ত্রুটি নয়, বরং মনুষ্যসৃষ্ট ও ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটিই ছিল এই দুর্ঘটনার মূল কারণ।

প্রশিক্ষণের ঘাটতি ও তত্ত্বাবধানের অভাব

তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিমানবাহিনীর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলামের উড্ডয়ন প্রশিক্ষণের ধারাবাহিকতায় ঘাটতি ছিল। এটি ছিল তাঁর জীবনের ‘প্রথম একক’ বা ‘ফার্স্ট সলো ফ্লাইট’। কমিশনের পর্যবেক্ষণ মতে, সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে পাইলট কার্যকর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাতে ব্যর্থ হন।

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গ্রাউন্ড সুপারভাইজার বা অফিসার কমান্ডিংয়ের যথাযথ ও পর্যাপ্ত তত্ত্বাবধানের অভাব ছিল। প্রশিক্ষণের সিলেবাস অনুযায়ী বিমানটির মিশন প্রোফাইল যেমন হওয়ার কথা ছিল, কমান্ডিং অফিসার পাইলটকে তারচেয়ে ভিন্ন ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছিলেন। ফলে, পাইলট বিমানটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেননি।

দুর্ঘটনার পেছনের কারিগরি বিশ্লেষণ

ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার (এফডিআর) বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিমানটি বেজ থেকে ফাইনালে বাঁক নেওয়ার সময় মাত্র চার সেকেন্ডের ‘ব্যাংক অ্যাঙ্গেল’ অস্বাভাবিকভাবে ৫৯ ডিগ্রি থেকে ৬৫ দশমিক ৩ ডিগ্রিতে পৌঁছে যায়। পাইলট কন্ট্রোল স্টিকে জোরালো টান দেওয়ার ফলে বিমানটির ‘অ্যাঙ্গেল অব অ্যাটাক’ ২৪ ডিগ্রির ক্রিটিক্যাল সীমা অতিক্রম করে ‘স্টলড’ (নিয়ন্ত্রণহীন) অবস্থায় চলে যায়।

এ ছাড়া বাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদন্তে বিমানের উইন্ডশিল্ডে একটি কালো দাগ পাওয়া গেছে, যা কোনো পাখি বা উড়ন্ত বস্তুর আঘাত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি পাইলটকে তাৎক্ষণিক ভুল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে থাকতে পারে।

বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বলেন, ‘একটা বিমান যত ওপরে থাকবে, তত নিরাপদে থাকবে। এখানে উচ্চতা এত কম ছিল, দুর্ঘটনাও খুব অল্প সময়ে ঘটেছে। এর মধ্যে তাকে যদি ডিসাইড করতে হয় যে, আমি ‘‘ইজেক্ট’’ করব, তাহলে ইটস আ ফ্র্যাকশন অব সেকেন্ড, এ মোমেন্ট।’

ছবি: আজকের পত্রিকা
ছবি: আজকের পত্রিকা

অবকাঠামোগত ত্রুটি ও প্রাণহানির উচ্চ হার

তদন্ত প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে, মাইলস্টোন স্কুলের হায়দার আলী ভবনটিতে জরুরি বহির্গমনের জন্য একটি মাত্র সিঁড়ি ছিল। অথচ ভবনের আয়তন ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিবেচনায় সেখানে কমপক্ষে তিনটি সিঁড়ি থাকা প্রয়োজন ছিল। বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর সিঁড়ির সামনেই অগ্নিকাণ্ড ঘটায় এবং বের হওয়ার পর্যাপ্ত পথ না থাকায় হতাহতের সংখ্যা বহুগুণ বেড়েছে। এ ছাড়া বিমানবন্দর এলাকায় উচ্চতা সীমা লঙ্ঘন করে গড়ে ওঠা অসংখ্য স্থাপনাকেও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বৃদ্ধির একটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এক বছরেও মেলেনি ক্ষতিপূরণ

দুর্ঘটনার এক বছর পেরিয়ে গেলেও নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারগুলো এখনো সরকার ঘোষিত ক্ষতিপূরণ পায়নি।

তদন্ত কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, নিহত শিশুদের পরিবারের জন্য এক কোটি টাকা ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৮০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। এ ছাড়া আহত ব্যক্তিদের পুনর্বাসন ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার জন্য সুনির্দিষ্ট প্যাকেজের সুপারিশ ছিল।

নিহত ব্যক্তিদের স্বজন ও আহত ব্যক্তিরা অভিযোগ করেছে, সরকার তাদের সঙ্গে আলোচনা না করেই নামমাত্র কিছু অনুদানের প্রস্তাব দিয়েছিল, যা তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট ক্ষতিপূরণের একটি মডেল তৈরি করলেও তা আজও আলোর মুখ দেখেনি।

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলেও কেউ কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তদন্ত কমিশনের সদস্য ও নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘কমিশনের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট সুপারিশ ছিল। আমরা চাই, রাষ্ট্র যেন সেই প্রতিবেদনটি খুলে দেখে এবং হতাহতদের প্রতি মানবিক দায়িত্ব পালন করে।’

উল্লেখ্য, ওই দুর্ঘটনায় স্কুলের ২৮ জন শিক্ষার্থীসহ মোট ৩৬ জন প্রাণ হারায়। ঘটনার পর তৎকালীন সরকার তদন্ত কমিশন গঠন করলেও সেই প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত