Ajker Patrika

পানিতে ডোবে ঢাকার ১২৯ স্থান

সাইফুল মাসুম সাখাওয়াত ফাহাদ, ঢাকা 
পানিতে ডোবে ঢাকার ১২৯ স্থান
বৃষ্টি নামে সকালে। এতে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক জলমগ্ন হয়ে পড়ে। দুর্ভোগে পড়ে নগরবাসী। এ সময় এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের নৌকায় করে যেতে দেখা যায় পরীক্ষাকেন্দ্রে। গতকাল রাজধানীর বকশীবাজার এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

আষাঢ়ের শেষ সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টায় থেমে থেমে ভারী বৃষ্টিতে রাজধানীর অন্তত ১২৯টি স্থানে জলাবদ্ধতায় ভুগেছে মানুষ। গত শনিবার রাত থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টিতে তলিয়েছে নগরের নিচু এলাকা। অনেক সড়কের পাশাপাশি কিছু প্রধান সড়কে জমে হাঁটু থেকে কোমরপানি। কোনো কোনো এলাকায় বাসাবাড়িতেও ঢুকেছে পানি।

রোববারের পর গতকাল সোমবারও জলাবদ্ধতায় ভোগান্তিতে পড়েছে মানুষ। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আজ মঙ্গলবারও বৃষ্টি থাকবে। ভারী বৃষ্টি হলে আজও কোথাও কোথাও জলাবদ্ধতার আশঙ্কা রয়েছে।

অথচ রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে গত ১০ বছরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও ঢাকা ওয়াসা খরচ করেছে দুই হাজার কোটি টাকার বেশি। এদিকে অচল হয়ে রয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৫৭ স্লুইসগেটের সব কটি। নগর-পরিকল্পনাবিদেরা বলছেন, পরিকল্পনামাফিক শহরের উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, খালসহ অন্যান্য জলাশয় দখল, ড্রেনেজ নেটওয়ার্কগুলোতে আবর্জনা ও দূষণ জলাবদ্ধতার কারণ।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, শনিবার সকাল ৬টা থেকে গতকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত ৪৮ ঘণ্টায় ঢাকায় ১৯৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ শাহীনুল ইসলাম গতকাল রাতে আজকের পত্রিকাকে বলেন, আজ মঙ্গলবারও ঢাকায় বৃষ্টি থাকবে। কাল বুধবার থেকে বৃষ্টি কমে আসবে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় গত দুদিন সরেজমিনে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের তথ্য ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনার ভিত্তিতে ১২৯ স্থানে জলাবদ্ধতার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় ৭৯টি এবং ডিএসসিসি এলাকায় ৫০টি স্থান রয়েছে। এসব এলাকার সড়ক, ফুটপাত ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানিতে তলিয়ে ছিল। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে কিছু এলাকা থেকে পানি সরে গেলেও অনেক জায়গায় থেকে যায়। তবে সম্প্রতি দুই সিটি করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকা উত্তরে ১৫ এবং দক্ষিণে ৩৩টি জলাবদ্ধতার হটস্পট রয়েছে।

ডিএনসিসির ৭৯টি স্থানে জলাবদ্ধতা

ডিএনসিসির যে ৭৯ স্থানে জলাবদ্ধতা হয়েছে, সেগুলো হলো উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের ১, ২, ১০ ও ১১ নম্বর সড়ক; উত্তরা ৬ নম্বর সেক্টরের ৯, ১০ ও ১১ নম্বর সড়ক, ঢাকা-ময়মনসিংহ (বিমানবন্দর) সড়ক, খিলক্ষেত, ব্যাপারীপাড়া, মধ্যপাড়া, নামাপাড়া, কুড়িল, কালশী রোড, মিরপুর সেকশন-১২ মুসলিম বাজার, মিরপুর-১০ গোলচত্বর, মিরপুর-১১ (প্যারিস), নাখালপাড়া, শাহীনবাগ, রাওয়া ক্লাবের সামনে, পাগলারপুল, খিলগাঁও শিশুচত্বরসংলগ্ন এলাকা, তেজগাঁও সিদ্দিক মাস্টারের ঢাল, মগবাজারের আমবাগান, মগবাজারের চল্লিশঘর বস্তি, প্রগতি সরণি, বেগম রোকেয়া সরণি, মিরপুর-১-এর কিযাংশি চায়নিজের সামনে, মিরপুর-১-এর দারুস সালাম রোড, টোলারবাগ; মিরপুর রোডের ধানমন্ডি ২৭ নম্বর এলাকা, কারওয়ান বাজার, তেজতুরী বাজার, বিজয় সরণি, মনিপুরীপাড়া, ফার্মগেট, উলুদাহা-বাদালদি, তারারটেক, পাবনারটেক, কামারপাড়া, ভাটুলিয়া, ধউর, কাওলা, আশকোনা, দক্ষিণখান প্রধান সড়ক, গণকবরস্থান রোড, প্রেমবাগান আশকোনা, মধ্য আজমপুর, কাঁচকুড়া থেকে ময়নারটেক, আঁটিপাড়া, ৪৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাটাগলি, মেডিকেল রোড ও তালতলা রোড, ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডের আবদুল্লাহপুর প্রধান সড়ক, ডুমনি বাজার থেকে ৩০০ ফুটসংলগ্ন সড়ক, ভাটারা মন্দির রোড, ঢালিবাড়ি রোড, ব্যাপারীবাড়ি রোড, লতিফ খন্দকার রোড, সাতারকুল প্রধান সড়ক, আনন্দনগর, পশ্চিম পদরদিয়া, পোস্ট অফিস রোড, পূর্বাচল লেন ২২, ২৩, ২৪, ২৫ ও ২৬ এবং বছিলা সড়ক। এ ছাড়া বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, মনিপুর, শেওড়াপাড়া, বাড্ডা, মোহাম্মদপুর, গুলশান, বনানীতে জলাবদ্ধতা দেখা গেছে।

মোহাম্মদপুর বছিলার বাসিন্দা মানিক হোসেন বলেন, বছিলার র‍্যাব অফিসের সামনের রাস্তায় রোববার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাঁটুপানি ছিল। এখনো কিছু জায়গায় পানি রয়েছে।

জলাবদ্ধতা নিরসনের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ রাকিবুল হাসান বলেন, ‘খালগুলো বেদখল হয়ে যাওয়ায় অনেক জায়গায় বৃষ্টির পানি জমে থাকে। তবে আমরা জলাবদ্ধতার হটস্পটগুলো শনাক্ত করে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করেছি। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে খাল পুনরুদ্ধার, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, নিয়মিত খাল ও নালা পরিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

ডিএসসিসিতে জলাবদ্ধতার ৫০টি স্থান

ডিএসসিসির ৫০টি স্থানে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। সেগুলো হলো ধানমন্ডি ২৭, গ্রিন রোড, নিউমার্কেট, ধানমন্ডি হকার্স মার্কেট, নায়েম রোড, ইস্কাটন গার্ডেন রোড, পলাশীর এসএম হলের সামনে, পরীবাগে সাকুরার সামনে, মোকাররম ভবনের সামনে, পশ্চিম মালিবাগ, খিলগাঁও ফ্লাইওভার থেকে মালিবাগ কমিউনিটি সেন্টার, আনন্দ বেকারি, মানিকনগরের টিটিপাড়া পাম্পের সামনে, টিটিপাড়া ট্রাকস্ট্যান্ডের সামনে, মুগদা মেডিকেল কলেজের সামনে, গোপীবাগ বড় মসজিদের সামনে, কমলাপুর রেলস্টেশনের সামনে, শাপলাচত্বরের উত্তর পাশে ফুটওভারব্রিজের সামনে, নটর ডেম কলেজের সামনে, চারমারির মোড়; সবুজ কানন-১, ২ ও ৩ নম্বর গলি; মালিবাগ প্রথম লেন, শান্তিবাগ ১৭ নম্বর গলি, পল্টন, দৈনিক বাংলা, ফকিরাপুল, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের সামনের এলাকা, বুয়েট কোয়ার্টারসংলগ্ন এলাকা, আগা সাদেক রোড, মাজেদ সরদার রোড, অভয় দাস লেন, আলমবাগ, পশ্চিম জুরাইন, মুন্সিবাড়ি পাইপ রোড, সায়েদাবাদ টার্মিনালের দক্ষিণ পাশের সড়ক ও জিয়া সরণি। এ ছাড়া ডেমরা, পুরান ঢাকা, বংশাল, তাঁতীবাজার, গুলিস্তান, মতিঝিল, কাকরাইল, আজিমপুর, বেইলি রোড, শ্যামপুর, কদমতলী, দনিয়া, খিলগাঁওয়ের তালতলা, রিয়াজবাগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা গেছে।

পশ্চিম জুরাইনের বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, ভারী বৃষ্টিপাতের এক দিন পেরিয়ে গেলেও জুরাইনের কমিশনার রোড, তিতাস খাল রোডসহ বেশির ভাগ জায়গায় পানি জমে রয়েছে। বৃষ্টির পানির সঙ্গে নর্দমার পানি জমে পুরো এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক বাসাবাড়ি ও দোকানেও পানি ঢুকেছে।

জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টির ধরন বদলে গেছে। তাই ড্রেনের ধারণক্ষমতা এখন অনেক বাড়ানো প্রয়োজন। যেখানে ৬ ফুটের ড্রেন আছে, সেখানে ধারণক্ষমতা আরও ১০০ শতাংশ বাড়ানো উচিত। ডিএসসিসি বর্তমানে পানি নির্গমনের নতুন আউটলেট তৈরি, ড্রেন সংযুক্ত করা, সংযোগ বাড়ানোতে কাজ করছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের ৫৭টি স্লুইসগেট রয়েছে, যার একটিও বর্তমানে সচল নেই। এগুলো সচল করার চেষ্টা চলছে।’

জলাবদ্ধতা নিরসনে ১০ বছরে ব্যয় দুই হাজার কোটি টাকার বেশি

সূত্র জানায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরে রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও ঢাকা ওয়াসা মোট ২ হাজার ১৪৬ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করেছে। এর মধ্যে ২০১৫-১৬ থেকে ২০১৯-২০ পর্যন্ত পাঁচ অর্থবছরে ডিএসসিসি নালা নির্মাণ ও সংস্কারে ৬০৫ কোটি এবং ডিএনসিসি ৭১১ কোটি টাকা খরচ করেছে। ঢাকা ওয়াসা কাছাকাছি সময়ে জলাবদ্ধতা নিরসনে খরচ করে প্রায় ১০০ কোটি টাকা। ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকা ওয়াসার কাছ থেকে পানি নিষ্কাশনের দায়িত্ব নেওয়ার পরবর্তী চার বছরে দুই সিটি করপোরেশন আরও অন্তত ৭৩০ কোটি টাকা খরচ করে। কিন্তু এই বিপুল ব্যয়ের পরও ভারী বৃষ্টি হলেই নগরের বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতায় ভুগতে হচ্ছে মানুষকে।

জানতে চাইলে ঢাকা ওয়াসার উপপ্রধান জনতথ্য কর্মকর্তা মো. আব্দুল কাদের বলেন, ২০২০ সালের আগে জলাবদ্ধতা নিরসনে ওয়াসার কাজ ছিল। এখন দুই সিটি করপোরেশন পানি নিষ্কাশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা। ফলে এখন ঢাকা ওয়াসার বিশেষ বক্তব্য নেই।

নগর-পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘এই দুই হাজার কোটি টাকার যদি অর্ধেকও সত্যিকার অর্থে ব্যয় হয়, দুর্নীতি তো আছেই, তারপরও যতটুকু জায়গায় কাজ করেছে, তার তুলনায় শহরের উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতার কারণে আরও অনেক এলাকা পানি ধারণক্ষমতা হারিয়েছে।’ একই সঙ্গে জলাবদ্ধতার কারণ হিসেবে খালসহ অন্যান্য জলাশয় দখল, ড্রেনেজ নেটওয়ার্কগুলোতে আবর্জনা, দূষণকে দায়ী করেন তিনি।

আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকার মহাপরিকল্পনা এবং ঢাকার স্ট্রাকচার প্ল্যান অনুযায়ী উন্নয়ন করা হয় না। বরং এটাকে ধ্বংস করেই করা হচ্ছে। যার ফলে সিটি করপোরেশন বা অন্যান্য সংস্থা যে কাজই করুক, সেটা দুর্নীতি বাদ দিলেও বিশেষ কোনো কাজে আসছে না।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত