Ajker Patrika

ড্যাফোডিলের শিক্ষার্থী তালহা হত্যা: ‘গোপনে’ কারাগার থেকে মুক্তি, ফের গ্রেপ্তার সেই মিলন

কমল জোহা খান, ঢাকা
আপডেট : ২৫ জুন ২০২৬, ১৭: ৩০
ড্যাফোডিলের শিক্ষার্থী তালহা হত্যা: ‘গোপনে’ কারাগার থেকে মুক্তি, ফের গ্রেপ্তার সেই মিলন
খন্দকার আবু তালহা ও আসামি আবদুর রহমান ওরফে মো. মিলন। ছবি : সংগৃহীত

২০১৭ সালে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী খন্দকার আবু তালহা হত্যা মামলার প্রধান আসামি আবদুর রহমান ওরফে মো. মিলনকে (২৮) গতকাল বুধবার গ্রেপ্তার করেছে যাত্রাবাড়ী থানা-পুলিশ। তবে তালহা হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে হত্যাকাণ্ডের ১০ দিন পরই মিলনকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। পুলিশের কাছে দায়ও স্বীকার করেছিলেন মিলন। এমনকি তাঁর কাছ থেকে তালহার মানিব্যাগও উদ্ধার করে পুলিশ। এর পর থেকে তিনি কারাগারেই ছিলেন। তবে মিলন কবে ছাড়া পেয়েছেন, সে তথ্য জানেন না আবু তালহার বাবাও।

২০১৭ সালের ৮ অক্টোবর সকাল সাড়ে ৬টা। রাজধানীর টিকাটুলির কে এম দাস লেনের বাসা থেকে সাভারের আশুলিয়ায় ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের উদ্দেশে বের হন খন্দকার আবু তালহা (২১)। বাসা থেকে মাত্র ১০০ গজ দূরে ধারালো অস্ত্রধারী ছিনতাইকারীরা তালহার টাকাপয়সা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে চলে যায়। তালহা তাদের পিছু নেন। কিছু দূর গিয়ে দেখতে পান, ছিনতাইকারীরা আরেকটি রিকশা আটকে দুই যাত্রীর কাছ থেকে টাকাপয়সা লুট করছে। ওই অটোরিকশার যাত্রী ছিলেন বারিধারা সাউথ পয়েন্ট স্কুলের শিক্ষক সাদিয়া ও তাঁর ভাই সানি।

‘ছিনতাইকারী’ বলে চিৎকার দিয়ে তালহা সামনে এগিয়ে যান। ছিনতাইকারীরা দৌড় দেয়, কিন্তু তালহা পিছু ছাড়েননি। ধাওয়া দিয়ে একজনকে ধরেও ফেলেন। রিকশায় থাকা সানি আরেক ছিনতাইকারীকে জাপটে ধরেন। তাৎক্ষণিক ছিনতাইকারীরা দলবদ্ধ হয়ে তালহাকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে সহযোগীকে ছিনিয়ে নেয়। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তালহা।

ওই ঘটনায় এলাকার শীর্ষ ছিনতাইকারী মো. জীবন হোসেন ওরফে লিটু, হিরা, আসলামসহ পাঁচ-ছয়জনের নাম সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে। তালহা হত্যার কয়েক দিন পর ১৩ অক্টোবর সকালে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থানাধীন রূপসী এলাকা থেকে লিটুকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব-৩।

লিটুকে গ্রেপ্তারের পর র‍্যাব-৩-এর তৎকালীন অধিনায়ক (সিও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল এমরানুল হাসান গণমাধ্যমকে বলেন, ওয়ারী ও টিকাটুলি এলাকায় মূলত বাইরে থেকে এসে দুর্বৃত্তরা ছিনতাই করে থাকে। সায়েদাবাদ টার্মিনাল থেকে এবং চট্টগ্রাম, সিলেট ও কুমিল্লার যাত্রীরাও ওই এলাকায় ছিনতাইয়ের শিকার হন।

এমরানুল হাসান আরও জানান, তালহা খুনে জড়িত থাকার বিষয়ে এলাকার ছিনতাইকারী লিটুসহ বেশ কয়েকজনের নাম গণমাধ্যমে উঠে এলে র‍্যাব ছায়া তদন্ত শুরু করে এবং ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তারে অভিযানে নামে। ছিনতাইকারী লিটু তালহা খুনের পর গা ঢাকা দিয়েছিলেন। র‍্যাব-৩-এর গোয়েন্দা টিম তাঁকে নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করতে সমর্থ হয়।

এর প্রায় ছয় মাস পর ২০১৮ সালের ৬ এপ্রিল ভোরে ওয়ারীর জয়কালী মন্দিরের কাছে পুলিশের সঙ্গে কথিত এক বন্দুকযুদ্ধে আবু তালহার ‘সন্দেহভাজন’ এক হত্যাকারী রাকিব (২২) নিহত হন। এ সময় পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে জাকির হোসেন ও শাহেদ নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করে। ওয়ারী থানা-পুলিশ জানায়, এর পাঁচ দিন আগে ওয়ারীতে নিহত মুক্তার হোসেন হত্যা মামলায় এই তিনজনের নাম ছিল।

এদিকে ২০১৭ সালের ১৭ অক্টোবর দিবাগত রাত ৩টার দিকে কাপ্তানবাজার এলাকা থেকে তালহা হত্যা মামলার প্রধান আসামি আবদুর রহমান ওরফে মিলন ও বেল্লাল হোসেন ওরফে সবুজকে গ্রেপ্তার করে ওয়ারী থানা-পুলিশ। গ্রেপ্তারের পর তাঁদের কাছ থেকে তালহার ব্যবহৃত মানিব্যাগসহ আরও কিছু জিনিসপত্র উদ্ধার করা হয়। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আবু তালহাকে হত্যার দায় স্বীকারও করেন তাঁরা। আদালতের মাধ্যমে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়।

তবে গতকাল রাতে ফের গ্রেপ্তার হয়েছেন মিলন। মিলনের গ্রেপ্তারের বিষয়ে আজ বৃহস্পতিবার ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার নিয়াজ মেহেদীর পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গতকাল রাত ১১টার দিকে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে মিলনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, যাত্রাবাড়ী থানা জানিয়েছে, মিলন রাজধানীর টিকাটুলির আর কে মিশন রোড এলাকায় ছিনতাইকারীর হাত থেকে একজনকে রক্ষা করতে গিয়ে নিহত ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী খন্দকার আবু তালহা হত্যা মামলার প্রধান আসামি। মিলনের বিরুদ্ধে হত্যা, ছিনতাই ও মাদকসংক্রান্ত একাধিক মামলা রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারাী বাহিনীর নজরদারিতে ছিলেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৭ সালে গ্রেপ্তারের পর কারাগারেই ছিলেন আবদুর রহমান ওরফে মিলন। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এলাকায় ফিরে মিলন আবারও ছিনতাই ও মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েন। তবে তিনি কবে ও কীভাবে কারাগার থেকে ছাড়া পেয়েছেন, সেটি জানা যায় না।

এ নিয়ে আবু তালহার বাবা আবু রিয়াজ মো. নূর উদ্দিন খন্দকারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয়। তিনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও তালহা হত্যার বিচার কার্যক্রম শেষ হয়নি। তবে ২০২৪ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত মামলার শুনানির দিন-তারিখ পড়ত। ওই বছর জুলাইয়ে শেষবারের মতো আদালতে হাজিরার দিন ছিল আমার। তখনো মিলনসহ তিনজনকে কারাগার থেকে আদালতে আনা হয়েছিল।’

মিলন জামিন পেয়েছিলেন কি না, জানতে চাইলে আবু রিয়াজ বলেন, ‘মামলার হাজিরার দিন থাকলে আগে আমাকে আদালত থেকে নোটিশ পাঠানো হতো। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর আর হাজিরার দিন-তারিখ পড়েনি। নোটিশও হাতে আসেনি। মামলার তদন্ত কর্মকর্তাও আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। মামলা সম্পর্কে বা মিলন সম্পর্কে জানি না।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত