Ajker Patrika

প্রিয়জন হারানোর বেদনায় কাঁদছে ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের জন্মভূমি ব্রাহ্মণপাড়া

মো. আনোয়ারুল ইসলাম, ব্রাহ্মণপাড়া (কুমিল্লা) প্রতিনিধি
প্রিয়জন হারানোর বেদনায় কাঁদছে ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের জন্মভূমি ব্রাহ্মণপাড়া
ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ তাঁর জন্মভূমি নারায়ণপুর গ্রাম। ছবি: আজকের পত্রিকা

কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার শশীদল ইউনিয়নের প্রত্যন্ত সীমান্তবর্তী নারায়ণপুর গ্রাম। সবুজে ঘেরা সেই নিভৃত জনপদ আজ যেন স্তব্ধ। নেই স্বাভাবিক কোলাহল, নেই চিরচেনা প্রাণচাঞ্চল্য। সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে গভীর শোক ও নিস্তব্ধতা।

১৯৩৭ সালের ১৬ জুলাই এই অজপাড়াগাঁয়েই জন্ম নিয়েছিলেন দেশের আইন অঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্র ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ। মৃত তালেব আলী মৌলভি ও বেগম ইয়াকুবের নেছা দম্পতির ৯ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। শৈশব কেটেছে গ্রামের মাটিতেই—স্থানীয় মক্তবে আরবি শিক্ষা, আশাবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক পড়াশোনা, এরপর শশীদল ইউনিয়ন উচ্চবিদ্যালয়সহ কুমিল্লার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শেষ করেন।

গ্রামের সেই সাধারণ পথ পেরিয়ে তিনি পৌঁছে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে ভূগোলে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, পরে আইনশাস্ত্রে এলএলবি। এরপর পাড়ি জমান যুক্তরাজ্যে—কিংস কলেজ লন্ডন থেকে এলএলএম এবং লিংকনস ইন থেকে বার অ্যাট ল ডিগ্রি অর্জন করেন। একসময়ের গ্রামের সেই ছেলেটিই হয়ে ওঠেন দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজ্ঞদের একজন।

কর্মজীবনে তিনি শিক্ষক, আইনজীবী, সংগঠক—সব ক্ষেত্রেই ছিলেন উজ্জ্বল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা, দীর্ঘ সময় সিটি ল কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব, সুপ্রিম কোর্টে আইনচর্চা—সব মিলিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়া এবং বার কাউন্সিলের সহসভাপতির দায়িত্ব পালন তাঁর পেশাগত জীবনের উজ্জ্বল অধ্যায়।

তবে পদ-পদবি আর অর্জনের বাইরেও মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন তাঁর মানবিকতা দিয়ে। গ্রামের মানুষ বলছেন, তিনি বড় মানুষ ছিলেন, কিন্তু মনে ছিল গ্রামের প্রতি, শেকড়ের প্রতি টান। বছরে কয়েকবার গ্রামে এসে খোঁজ নিতেন অসহায়দের, পাশে দাঁড়াতেন দরিদ্র মানুষের। নিজ বাড়ির সামনে মায়ের নামে ১৯৯৮ সালে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন—যা আজও তাঁর কীর্তির সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

১৯৬৯ সালে শিক্ষাবিদ, সমাজকর্মী ও ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহফুজা খানমকে বিয়ে করেন তিনি। তিন সন্তানের জনক এই গুণী মানুষটি পারিবারিক জীবনেও ছিলেন স্নেহময়। গত বছর স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি অনেকটাই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন বলে জানিয়েছেন ঘনিষ্ঠজনেরা।

ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ তাঁর জন্মভূমি নারায়ণপুর গ্রাম। ছবি: আজকের পত্রিকা
ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ তাঁর জন্মভূমি নারায়ণপুর গ্রাম। ছবি: আজকের পত্রিকা

গত রোববার (১২ এপ্রিল) বিকেলে তাঁর মৃত্যুর খবর গ্রামে পৌঁছাতেই যেন শোকের ঢেউ বয়ে যায়। কেউ কথা বলতে পারছেন না, কেউ চোখের জল লুকাতে পারছেন না। গ্রামের প্রবীণ একজন বলেন, ‘আমরা আমাদের গর্বকে হারালাম। এমন মানুষ আর হবে না।’

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সোমবার (১৩ এপ্রিল) বেলা ১১টায় ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের ঢাকায় বাসার কাছে ইন্দিরা রোড খেলার মাঠে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে কফিন নেওয়া হয় তাঁর দীর্ঘদিনের কর্মস্থল সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে। সেখানে বাদ জোহর সুপ্রিম কোর্টের ইনার গার্ডেন প্রাঙ্গণে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে তাঁর কফিন বেলা ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হয় সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে আজিমপুর কবরস্থানে তাঁর মরদেহ নেওয়া হয়। পরে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে সেখানেই তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।

শশীদল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আতিকুর রহমান রিয়াদ গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, ‘ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ আমাদের এলাকার অহংকার ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে আমরা শুধু একজন মানুষ নয়, একজন অভিভাবককে হারালাম।’

গ্রামের আকাশে আজ বিষণ্নতার ছায়া। নারায়ণপুরের মাটিতে জন্ম নেওয়া সেই মানুষটি আর ফিরবেন না—তবু তাঁর স্মৃতি, তাঁর অবদান আর মানুষের প্রতি ভালোবাসা বেঁচে থাকবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত