কক্সবাজারে টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড: জামিনযোগ্য ধারায় মামলা, ওসিকে তলব

কক্সবাজারের উখিয়ায় ইনানীর পাটুয়ারটেকে টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যুর ঘটনায় জামিনযোগ্য ধারায় মামলা নথিভুক্ত করায় উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদারকে তলব করেছেন আদালত। বুধবার (২৮ অক্টোবর) তাঁকে আদালতে হাজির হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। কেন তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা ও বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) বিকেলে উখিয়ার আমলি আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আসাদ উদ্দিন মো. আসিফ এ আদেশ দেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলাটি জামিন অযোগ্য ধারায় নথিভুক্ত না করে জামিনযোগ্য ধারায় রেকর্ড করার বিষয়টি প্রাথমিকভাবে অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
কক্সবাজার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মু. শাহাজাহান ইলাহি নূরী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলার রেকর্ডিং কর্মকর্তা হিসেবে ওসি আতিকুর রহমান আসামিদের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা নথিভুক্ত না করে জামিনযোগ্য ধারায় মামলাটি রেকর্ড করেন। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে আদালত এ ক্ষেত্রে অসৎ উদ্দেশ্যের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। এ কারণে ওসিকে সশরীরে হাজির হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা ও জরুরি নির্গমনপথ ছিল না। ফলে আগুন লাগার সময় অতিথিরা বের হতে না পেরে ১০ জনের মৃত্যু হয়।
আদালত মনে করেন, আগুনের সূত্রপাত দুর্ঘটনাবশত বা অন্য কোনো কারণে হলেও অতিথিদের বের হতে না পারার ঝুঁকি সম্পর্কে জানা সত্ত্বেও রিসোর্টটি পরিচালনা করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, এমন গুরুতর ঘটনার পরও দায়ীদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারায় মামলা নথিভুক্ত না করে ৩০৪-ক, ৩৩৮ ও ৩৪ ধারায় মামলা করা হয়েছে। আদালতের মতে, এতে আসামিদের উপযুক্ত শাস্তি এড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ বিষয়ে ওসির ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
চারজনের নাম উল্লেখ করে মামলা, একজন গ্রেপ্তার
মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ১৭ অক্টোবর উখিয়ার টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে অগ্নিকাণ্ডের পর ১০ জনের পোড়া মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ওই রাতেই উখিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আশিস সূত্রধর বাদী হয়ে অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে মামলা করেন।
মামলায় রিসোর্টের এক মালিক ও তিন ব্যবস্থাপকসহ চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া রিসোর্টের ১৯ জন কর্মচারীকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। মামলার চার নম্বর আসামি জাহিদ হোসেন সুমনকে (২৯) গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক রিমন ঘোষ গ্রেপ্তার সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করেছেন। বুধবার এ আবেদনের শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
১০ জনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের প্রস্তুতি
এদিকে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের পরিচয় ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তাঁদের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের প্রস্তুতি চলছে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল এ তথ্য জানান।
নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকার শ্যামলীর গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাহিদুর রহমান (৪১), তাঁর স্ত্রী আফসানা মতিন (৩৬) এবং তাঁদের দুই মেয়ে রোজাইনা ইনায়া (৯) ও মুনাইনা ইহানা (৬)। তাঁদের বাড়ি যশোরের মনিরামপুরে।
অন্য একটি পরিবারের নিহত ছয়জন হলেন মৌলিতা মেহজাবিন আলভি (১৯), লায়লা জাহান নাবিলা (২৫), ইসরাত জাহান মালিহা (২৭), ফারিয়া কবির (৩৩), ফারিয়ার ছেলে মোহাম্মদ ফাইজান নূর (৬) এবং তাঁর ভাই মোহাম্মদ নাফিস তেহামি (২৪)। তাঁদের বাড়ি ঢাকার বনশ্রী ও খিলগাঁও এবং বরগুনার আমতলী এলাকায়।
নিখোঁজ স্কুলশিক্ষক মুক্তার সন্ধান মেলেনি
এদিকে ২৭ বছর বয়সী স্কুলশিক্ষক নাসরিন আক্তার মুক্তার ডিএনএর সঙ্গে উদ্ধার হওয়া ১০টি মরদেহের কোনো নমুনার মিল পাওয়া যায়নি। তিনি সাভারের আশুলিয়ার স্বপ্নবিলাস নিরিবিলি স্কুলের শিক্ষক। দুই বান্ধবীর সঙ্গে কক্সবাজারে বেড়াতে এসেছিলেন তিনি।
মুক্তার স্বামী দেওয়ান ফয়সালের দাবি, অগ্নিকাণ্ডের সময় তাঁর স্ত্রী রিসোর্টের একটি কক্ষে আটকা পড়েছিলেন। মুক্তার দুই বান্ধবী বের হতে পারলেও তাঁর আর খোঁজ পাওয়া যায়নি।
এর আগে তদন্ত কমিটি জানিয়েছিল, মুক্তার অবস্থান শনাক্ত করতে তাঁর মুঠোফোনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।









