Ajker Patrika

রাতে ফুটপাতে, দিন কাটে আদালতের বারান্দায় ঘুরে

  • দুই বছর ধরে একটি আদালত প্রাঙ্গণে ফুটপাতে মানবেতর জীবন মা ও শিশুর।
  • যৌতুক, খোরপোশসহ তিনটি মামলায় বাদীর দিন কাটে ক্ষুধা ও নিরাপত্তার শঙ্কায়।
  • মায়ের সঙ্গে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি অবুঝ শিশু।
মেহেরাব্বিন সানভী, চুয়াডাঙ্গা
রাতে ফুটপাতে, দিন কাটে আদালতের বারান্দায় ঘুরে

কোলে দুই বছরের কন্যাশিশু। পরনে মলিন পোশাক। মাথার ওপর ছাদ বলতে চুয়াডাঙ্গা শহরের একটি সড়কের পাশের পরিত্যক্ত পানির ট্যাংকের একটুখানি ছাউনি। রোদ-বৃষ্টি কিংবা কনকনে শীত—সব আবহাওয়াতেই মা-মেয়ের ঠিকানা এই একচিলতে ফুটপাত। এভাবেই প্রায় দুই বছর ধরে চুয়াডাঙ্গার একটি আদালত প্রাঙ্গণে শিশুসহ অনাহারে, অর্ধাহারে কাটছে এক নারীর। যৌতুক নিরোধ আইন, খোরপোশ (ভরণপোষণ) আইন ও ধর্ষণের অভিযোগ-এ তিন মামলায় বিচার পাওয়ার আশায় প্রায় দিনই ঘুরে বেড়ান এক আদালত থেকে আরেক আদালতের বারান্দায়।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের পাশে ছোট্ট শিশুকে নিয়ে বসে আছেন দরিদ্র মা-বাবার বাড়িতে ফিরতে না পারা এই নারী। তাঁর সঙ্গে বসে আছে ছোট্ট শিশু। পাশে পড়ে আছে শিশুটির একমাত্র খেলার সঙ্গী একটি ময়লা ও ছেঁড়া পুতুল। মানুষের কাছে হাত পেতে যা মেলে, তা দিয়েই কোনোরকম ক্ষুধার জ্বালা মেটে মা-মেয়ের। এ সময় সাংবাদিক পরিচয়ে কথা বলতে চাইলে জানালেন কোলের সন্তান নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম আর বিচারের অপেক্ষার কথা।

এই নারীর ভাষ্য, মো. মহাসিন আলী নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। এরপর দরিদ্র শ্বশুরের পরিবারের কাছে বিভিন্ন সময় যৌতুক চেয়ে আসছিলেন স্বামী। কয়েক দফায় মহাসিনের হাতে প্রায় ৮০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। তবে তিনি ক্ষান্ত হননি। আরও দুই লাখ টাকার জন্য শুরু হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। এরই মধ্যে তাঁদের দুটি সন্তান হয়। সন্তানদের নিয়ে বসবাস করছিলেন একটি ভাড়া বাসায়। কিন্তু স্বামীর চাওয়া যৌতুক দিতে অপারগ হওয়ায় কয়েক বছর আগে তাঁর (নারী) ভরণপোষণের অর্থ ও খোঁজখবর নেওয়া বন্ধ করে দেন স্বামী। বছর দুই আগে তাঁকে তালাক দিয়ে স্বামীর বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। মায়ের কাছ থেকে রেখে দেওয়া হয় শিশুসন্তান দুটি। এরপর আর তাঁকে সন্তানদের মুখ দেখতে দেওয়া হয়নি। পরে আরেকটি বিয়ে করেন মহাসীন। এরপর শুরু হয় এ নারীর সংগ্রামের জীবন।

এসব ঘটনায় তিনি সাবেক স্বামীর বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের অক্টোবরে চুয়াডাঙ্গার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে যৌতুক নিরোধ আইনে মামলা করেন। এরপর চুয়াডাঙ্গা পারিবারিক জজ আদালত-১-এ দেনমোহর ও খোরপোশের দাবিতে আরেকটি মামলা করা হয়।

এদিকে সাবেক স্বামীর ভাড়া বাসা থেকে বের করে দেওয়ার পর এই নারী চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার একটি খাবার হোটেলে কাজ নেন। সেখানে কাজের সুবাদে মো. রনি নামের এক যুবকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তাঁর অভিযোগ, একপর্যায়ে তিনি এই যুবকের ধর্ষণের শিকার হন এবং অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। পরবর্তী সময়ে তিনি একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। কিন্তু রনি ধর্ষণ ও সন্তানের পিতৃপরিচয় অস্বীকার করেন। এ অবস্থায় ২০২৪ সালের অক্টোবরে চুয়াডাঙ্গা থানায় ধর্ষণের অভিযোগে রনির বিরুদ্ধে মামলা করেন এই নারী। মামলাটি বর্তমানে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। বাদীর অভিযোগ, মামলা করায় আসামি বিভিন্ন সময় তাঁকে এবং সন্তানকে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছেন।

মামলার বাদী বলেন, ‘শুধু ক্ষুধা বা অর্থের অভাব নয়, প্রতিটি মুহূর্ত কাটে নিরাপত্তাহীনতায়। এখানে রাতে থাকা যে কত কষ্টের, তা বোঝাতে পারব না। প্রতিটি রাত আতঙ্কে কাটে।’

বিচারপ্রার্থী নারীকে আইনি সহায়তা দিচ্ছে চুয়াডাঙ্গা জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়। তাঁর পক্ষে নিযুক্ত আইনজীবী শাহাজামাল জামাল বলেন, ‘যৌতুক ও খোরপোশের মামলা বর্তমানে সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু সাক্ষীরা আসামির নিজ গ্রামের হওয়ায় ভয়ে তাঁরা আদালতে উপস্থিত হচ্ছেন না, যার কারণে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এ ছাড়া দেনমোহর ও খোরপোশের দাবিতে আরেকটি পারিবারিক মামলা করা হয়েছে, যেটি বর্তমানে বিবাদীপক্ষের জবাব দাখিলের পর্যায়ে রয়েছে।’

অন্যদিকে ধর্ষণ মামলাটির প্রসঙ্গে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিশেষ সরকারি কৌঁসুলি শাহজাহান মুকুল আজকের পত্রিকাকে বলেন, আসামি ধর্ষণের অভিযোগ অস্বীকার করলে আদালতের নির্দেশে ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। সেই প্রতিবেদনে শিশুটি আসামির ঔরসজাত নয় বলে উল্লেখ করা হয়। তবে বাদী এই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে অভিযোগ তোলেন, প্রভাব খাটিয়ে প্রতিবেদন পরিবর্তন করা হয়েছে।

শাহজাহান মুকুল আরও বলেন, ‘বিষয়টি রাষ্ট্রপক্ষের নজরে আসায় আমরা দ্রুত আদালতে পুনরায় ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন জানাই। আদালত আমাদের আবেদন মঞ্জুর করেছেন এবং পুনঃপরীক্ষার প্রক্রিয়া চলছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত