Ajker Patrika

তেল নেই পাম্পে, পাচ্ছেন না কার্ড ও স্বাক্ষর: চিড়ে চ্যাপ্টা চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষকেরা

তেল নেই পাম্পে, পাচ্ছেন না কার্ড ও স্বাক্ষর: চিড়ে চ্যাপ্টা চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষকেরা
সকাল থেকে দুপুর গড়িয়েছে তবু দেখা মিলছে না চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার। তাঁর অপেক্ষায় কৃষকেরা ক্লান্ত হয়ে বারান্দার মেঝেতেই শুয়ে পড়েন। ছবি: আজকের পত্রিকা

সীমান্তঘেঁষা জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে কৃষি খাতে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। চলতি ইরি-বোরো মৌসুমে সেচযন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন পাঁচ উপজেলার কয়েক লাখ কৃষক। পানির অভাবে মাঠের পর মাঠ ধানখেত শুকিয়ে ফেটে যাচ্ছে, অন্যদিকে সময়মতো কীটনাশক স্প্রে করতে না পারায় ঝরে পড়ছে আমের গুটি। এতে করে চলতি মৌসুমে ধান ও আমের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সরেজমিন সোমবার (১৩ এপ্রিল) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত জেলা শহরের বিভিন্ন পেট্রলপাম্প, সদর উপজেলা কৃষি অফিস এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয় ঘুরে তেলের তীব্র সংকট ও কৃষকদের চরম দুর্ভোগের চিত্র দেখা গেছে।

শহরের পেট্রলপাম্পগুলোতে দেখা যায় শত শত কৃষকের দীর্ঘ সারি। রোদে পুড়ে কেউ হাতে জারিকেন, কেউ আবার তেলের বোতল নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। তবে দীর্ঘ অপেক্ষার পরও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ডিজেল। অনেক পাম্প কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছে, যা কৃষকদের মাঝে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

তেল পেতে কৃষি অফিসের কার্ড বাধ্যতামূলক করায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ চাষিরা। উপজেলা কৃষি অফিস ও ইউএনও কার্যালয়ের সামনে কার্ড সংগ্রহের জন্য শত শত কৃষকের ভিড় দেখা গেছে। সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে গেলেও কার্ড না পেয়ে অনেক কৃষককে ক্লান্ত অবস্থায় অফিসের সিঁড়ি এবং বারান্দার মেঝেতেই শুয়ে পড়তে দেখা যায়।

লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষকদের চোখে-মুখে ছিল দুশ্চিন্তার ছাপ। তাঁদের দাবি, সেচ মৌসুমে তেলের এই কৃত্রিম সংকট ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করবে। সময়মতো জমিতে পানি দিতে না পারলে তাঁদের সারা বছরের পরিশ্রম বৃথা যাবে।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলায় ৪৭ হাজার ৭৬৫ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো এবং ৩৭ হাজার ৫০৪ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। এখন ধানের থোড় আসা বা শিষ বের হওয়ার মোক্ষম সময়। এই মুহূর্তে পর্যাপ্ত পানি না পেলে ধান চিটা হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। কিন্তু জেলাজুড়ে ডিজেলের তীব্র সংকটে অধিকাংশ শ্যালো ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে আছে।

সদর উপজেলার আমনির মাঠ এলাকার কৃষক জোবদুল হক বলেন, ‘১০ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছি। আগে শিলাবৃষ্টিতে বুক ফেটেছে, এখন তেলের অভাবে সেচ দিতে পারছি না। ১০ দিন ধরে খেত পানিশূন্য। হাটেবাজারে কোথাও তেল নেই, জমি এখন ফেটে চৌচির।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রধান অর্থকরী ফসল আম। বর্তমানে আমগাছে কীটনাশক ও ভিটামিন স্প্রে করার ভরা মৌসুম। কিন্তু স্প্রে মেশিনের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল বা পেট্রল না মেলায় বিপাকে পড়েছেন বাগানমালিকেরা। আমচাষি ওয়াসিম আকরাম জানান, তাঁর ৩০ বিঘা জমির ধান ও আমবাগানের জন্য অন্তত ১২০ লিটার তেল প্রয়োজন হলেও কার্ডে মিলেছে মাত্র ৬০ লিটার। সেই তেলটুকু সংগ্রহ করতেও পাম্পে পাম্পে তিন দিন ধরে ধরনা দিতে হচ্ছে।

জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত রোধে জেলা প্রশাসন ‘বিশেষ কৃষি জ্বালানি কার্ড’ চালু করলেও সেটি এখন কৃষকদের কাছে গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি কার্ডের জন্য কৃষি অফিস থেকে শুরু করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) দপ্তর পর্যন্ত তিন-চার স্তরের সিল ও স্বাক্ষরের জন্য ঘুরতে হচ্ছে।

বারোঘরিয়া ইউনিয়নের মরিচার বিলের কৃষক মো. মুন্টু আলী অভিযোগ করেন, ‘মাঠে সেচ নেই, আর আমরা তিন দিন ধরে অফিসের বারান্দায় ঘুরছি। একজন অফিসার থাকলে অন্যজন নেই। কৃষি অফিসারের সই পেলেও ইউএনও সাহেবের স্বাক্ষরের অপেক্ষায় বসে থাকতে হচ্ছে। একটি কার্ডের জন্য এত হয়রানি আগে দেখিনি।’

চামাগ্রাম এলাকার ইয়াসিন আলী বলেন, ‘শহরের সব পাম্পে একই অবস্থা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও শূন্য হাতে ফিরতে হচ্ছে। পাম্পমালিকেরা বলছেন সরবরাহ কম, কিন্তু কৃষকদের এই ক্ষতি কে পূরণ করবে?’

সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুনাইন বিন জামান জানান, ৫ এপ্রিল থেকে জেলা প্রশাসনের নির্দেশে বিশেষ কার্ডের মাধ্যমে তেল বিতরণ করা হচ্ছে। এতে মজুতদারি বন্ধ হবে এবং কৃষকেরা সুশৃঙ্খলভাবে তেল পাবেন। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। কার্ড পাওয়ার জটিলতা এবং পাম্পে তেলের সরবরাহ না থাকা—এই দুই সংকটে পিষ্ট হচ্ছেন সাধারণ চাষিরা।

শিবগঞ্জ ম্যাঙ্গো প্রোডিউসার কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক ও কৃষি উদ্যোক্তা ইসমাইল খান শামীম বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুরো অর্থনীতি আম ও ধানের ওপর দাঁড়িয়ে। বর্তমানে পাম্পগুলোতে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক নেই। এর ওপর কার্ড প্রদানের ক্ষেত্রে যে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা নিরসন করা জরুরি।

তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, দ্রুত সমাধান না হলে জেলায় খাদ্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে এবং কৃষক বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে। কৃষকদের হয়রানি বন্ধে রেসনিং পদ্ধতিতে সহজ উপায়ে কার্ড বিতরণের জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানান।

জ্বালানি কার্ডের জটিলতা ও সংকট নিয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. ইয়াছিন আলী বলেন, ‘সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সারা দেশের মতো এ জেলাতেও কৃষকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিশেষ জ্বালানি কার্ড দেওয়া হচ্ছে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং তেলের কারসাজি বা অবৈধ মজুত রোধে তিনজন কর্মকর্তার যৌথ স্বাক্ষরে এই কার্ড ইস্যু করা হচ্ছে। এতে কিছুটা সময় লাগলেও এটি কৃষকদের স্বার্থেই করা হচ্ছে।’

চাহিদামাফিক তেল না পাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বিশ্ব পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে বলেন, ‘সারা বিশ্বেই বর্তমানে জ্বালানি সংকট চলছে। এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই আমাদের উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে নিতে হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

মিরপুরের ১০ নারীকে যাত্রাবাড়ী এনে ধর্ষণ-ব্ল্যাকমেল করেন রাব্বি, বিয়েও করেন একই কায়দায়

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর ছদ্মবেশে যুক্তরাজ্যে মিথ্যা আশ্রয় প্রার্থনার বাজার উন্মোচন বিবিসির

সিঙ্গাপুর থেকে মালয়েশিয়ায় নেওয়া হলো মির্জা আব্বাসকে

নতুন শর্তে এবার লোহিতসাগর বন্ধ করার হুমকি ইরানের

সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জে নতুন ডিসি

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত