Ajker Patrika

বিএডিসির প্রকল্প: দুই বছরে শূন্য ফসল ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক

  • কৃষকদের কাছ থেকে জমি নেওয়া হয়েছে দুবছর আগে, ফলেনি কোনো ফসল
  • সৌরবিদ্যুতে চালানোর কথা পাম্প; পানি পান না কৃষকেরা
  • পলিথিন ছিঁড়ে গেছে, লোহার পাইপে মরিচা। প্রকল্পে বরাদ্দ ও ব্যয় ৫ কোটি টাকা
গণেশ দাস, বগুড়া
বিএডিসির প্রকল্প: দুই বছরে শূন্য ফসল
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক
পলিশেডে লাগানো টমেটো চারা মরে গেছে। সম্প্রতি বগুড়ার গণেশপুরে। ছবি: আজকের পত্রিকা

পানিসাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তি ও পলিশেড নির্মাণের মাধ্যমে নিরাপদ সবজি, ফল ও ফুল উৎপাদনের কথা ছিল। উদ্দেশ্য ছিল আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষকের উৎপাদন বাড়ানো এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি করা। তবে বগুড়ায় সরকারি এই প্রকল্পের পাঁচটি পলিশেড দুই বছর ধরে পড়ে আছে অচল অবস্থায়। সেখানে চাষাবাদ তো হচ্ছেই না, উল্টো পলিশেডের কারণে প্রায় পাঁচ বিঘা কৃষিজমি আটকে গেছে।

কৃষকদের অভিযোগ, নিম্নমানের সোলার প্যানেল, বিদ্যুৎ-সংযোগ না থাকা, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি অচল এবং নির্মাণকাজে অনিয়মের কারণে প্রকল্পটি তাঁদের কোনো কাজে আসছে না। কয়েক দফা চাষের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন তাঁরা। এরই মধ্যে পলিশেডের পলিথিন ছিঁড়ে গেছে, লোহার পাইপে ধরেছে মরিচা। অথচ প্রকল্পের পেছনে সরকারের ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ ও ব্যয় হয়েছে।

সরেজমিনে বগুড়া সদরের শেখেরকোলা ইউনিয়নের মহিষবাথান, বালুপাড়া, গোকুল ইউনিয়নের গোকুল, মোকামতলা ইউনিয়নের গনেশপুর এবং দেউলী ইউনিয়নের পাকুড়তলা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পাঁচটি পলিশেডই কার্যত পরিত্যক্ত। কোথাও পলিশেডের ভেতরে আগাছা, কোথাও ছিঁড়ে পড়ে আছে পলিথিন। অনেক জায়গায় লোহার কাঠামোতে মরিচা ধরেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রকল্পের আওতায় কৃষকের জমিতে ডিপ টিউবওয়েল ও সেচব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। তবে সোলার প্যানেল দিয়ে পরিচালিত সেচযন্ত্রও ঠিকমতো কাজ করছে না। কৃষকেরা বলছেন, সকাল ১০টার আগে এসব পাম্প দিয়ে পানি ওঠে না। আবার দুপুরের পরপরই পাম্প বন্ধ হয়ে যায়। শীতকালে সূর্যের আলো কম থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। ফলে প্রয়োজনের সময় জমিতে পানি দেওয়া সম্ভব হয় না।

মহিষবাথান গ্রামের কৃষক আলফাজ উদ্দিন জানান, তাঁর ২৯ শতাংশ জমি প্রকল্পের জন্য দেওয়া হয়েছে। দুই বছর আগে সেখানে পলিশেড ও সেচযন্ত্র বসানো হয়। কিন্তু সেচযন্ত্রে পানি উঠলেও কৃষকের প্রয়োজন অনুযায়ী সেই পানি পাওয়া যায় না।

আলফাজ বলেন, পলিশেডে বিদ্যুৎ-সংযোগ না থাকায় ফগার মেশিন ও ফ্যান চালানো যায়নি। ফলে সেখানে চাষাবাদ করা সম্ভব হয়নি। এ বছর তিনি পলিশেডে ৩ হাজার আগাম টমেটোর চারা রোপণ করেছিলেন। পর্যাপ্ত আলো-বাতাস ও পানি না পাওয়ায় সেগুলোও মারা গেছে। তাঁর অভিযোগ, প্রতিটি প্রকল্পে প্রায় ১ কোটি টাকা করে বাজেট থাকলেও বাস্তবে ২০ লাখ টাকার বেশি কাজ হয়নি।

গনেশপুর গ্রামের কৃষক হেলাল উদ্দিনের ৪৪ শতাংশ জমিতে দুই বছর আগে পলিশেড ও সেচপাম্প স্থাপন করা হয়। তবে বিদ্যুৎ-সংযোগ না থাকায় তিনি এত দিন সেখানে কোনো ফসল চাষ করতে পারেননি। হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘এই জমিতে কলা চাষ করতে পারলে বছরে প্রায় আড়াই লাখ টাকা আয় করতে পারতাম। সরকারি প্রকল্পের জন্য জমি দেওয়ার পর দুই বছর ধরে জমিটা পড়ে আছে। এক মাস আগে সাড়ে ৩ হাজার টমেটোর চারা লাগিয়েছিলাম। সেগুলোও মারা গেছে।’

ক্ষোভ প্রকাশ করে এই কৃষক বলেন, ‘বিএডিসি আমাকে লাভের বদলে ক্ষতির মুখে ফেলেছে। এখন এমন অবস্থা সরকারি প্রকল্প বলে পলিশেড সরাতেও পারছি না, আবার ঠিকমতো ফসলও চাষ করতে পারছি না।’

এ নিয়ে কথা হয় পলিশেড নির্মাণকারী মাগুরার আদর্শ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী গোলাম রাহিদের সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রতিটি পলিশেড নির্মাণের জন্য বিএডিসি তাঁদের ১৫ লাখ টাকা করে দিয়েছে। তবে বিদ্যুৎ-সংযোগ, ফগার মেশিন, সোলার প্যানেলসহ অন্যান্য কাজ অন্য প্রতিষ্ঠান করেছে।

এদিকে পলিশেড নির্মাণে ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ের পরও কেন দুই বছরের মধ্যে সেটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ল? প্রকল্পের আওতায় সেচব্যবস্থা, সোলার প্যানেল, বিদ্যুৎ-সংযোগ ও অন্যান্য সরঞ্জামের মান যাচাই করেছে কে? কাজ বুঝে নেওয়ার আগে এসব বিষয় পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না, তারও স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। প্রকল্পটি দেখভালের দায়িত্বে থাকা বিএডিসির উপসহকারী প্রকৌশলী আসমাউল বিন হোসেন জানান, তিনি অতিরিক্ত দায়িত্বে আছেন। প্রকল্পে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, তা তিনি সঠিকভাবে বলতে পারেননি।

‘পানিসাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তি এবং পলিশেড নির্মাণের মাধ্যমে নিরাপদ সবজি, ফল ও ফুল উৎপাদন প্রকল্পের’ প্রকল্প পরিচালক মাহবুবর রহমান বলেন, বরাদ্দস্বল্পতার কারণে প্রকল্পে সমস্যা দেখা দিয়েছিল। এখন বরাদ্দ পাওয়া গেছে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে পলিশেডগুলো চালু করা হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত