Ajker Patrika

অনুমোদনহীন শত ক্লিনিক, বাড়ছে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু

  • অনেক প্রতিষ্ঠানের নেই প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত জনবল ও নিরাপদ চিকিৎসাব্যবস্থা।
  • পাঁচ শতাধিক প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে পরিবেশ ছাড়পত্র মাত্র ৮০টির।
  • জরিমানা, বন্ধের পর ভিন্ন নামে চালু হয় প্রতিষ্ঠান।
  • ভুল চিকিৎসা ও অবহেলায় রোগীর মৃত্যু বাড়ছে।
গনেশ দাস, বগুড়া 
অনুমোদনহীন শত ক্লিনিক, বাড়ছে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু

বগুড়ার বেসরকারি চিকিৎসা খাত চলছে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে। বিভিন্ন অনিয়মের কারণে ইতিমধ্যে ৭৬টি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হলেও পরে ভিন্ন নামে আবারও চালু করা হয়েছে। তবে এর বাইরে রয়েছে আরও শতাধিক অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠান। অনেক প্রতিষ্ঠানের নেই প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত জনবল ও নিরাপদ চিকিৎসাব্যবস্থা। তাই প্রায়ই ঘটছে ভুল চিকিৎসা ও অবহেলায় রোগীর মৃত্যু।

বগুড়া শহরে পাঁচ শতাধিক চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান আছে। এর মধ্যে শতাধিক প্রতিষ্ঠানের নেই অনুমোদন। বগুড়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বগুড়ায় নিবন্ধিত বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ৪৮৬টি। এর মধ্যে ক্লিনিক ২১৫টি এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টার ২৭১টি। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক প্রতিষ্ঠানের সামনে একাধিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নাম ঝোলানো থাকলেও বাস্তবে তাঁরা নিয়মিত সেখানে চিকিৎসা দেন না। চিকিৎসকদের নাম ব্যবহার করে রোগী সংগ্রহ করা হলেও জরুরি সময়ে অনেক প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় জনবল পাওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা অন-কল ভিত্তিতে সেবা দেন।

চিকিৎসকেরা বলছেন, সরকারি দায়িত্ব শেষে অবসর সময়ে তাঁরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রোগী দেখেন। তবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের উপস্থিতি ও রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই মূল বিষয়। শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ মো. হাবিবুর রহমান রতন বলেন, ‘অসাধু প্রতিষ্ঠানগুলো আমার নাম ব্যবহার করছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু হলে সাধারণ মানুষ চিকিৎসকদেরও দায়ী করেন। প্রশাসনের উচিত এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।’

ভুল চিকিৎসায় প্রাণহানি

গত ৩০ মে শহরের খান্দার এলাকার সুস্বাস্থ্য ক্লিনিকে ভুল গ্রুপের রক্ত দেওয়ার অভিযোগে প্রসূতি আফরিন জাহান অহনার মৃত্যু হয়। স্বজনদের অভিযোগ, ভুল চিকিৎসা ও অবহেলার কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। পরদিন ক্লিনিকটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর এক দিন পর সৃষ্টি জেনারেল হাসপাতালে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত আড়াই মাসের শিশু আবদুল্লাহ আল আয়ানের মৃত্যু হয়। স্বজনদের অভিযোগ, চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী জরুরি চিকিৎসা না দেওয়ায় শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। ১ জুন বাদুড়তলা প্রেসপট্টি এলাকার সারা হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে টনসিলের অপারেশন করতে গিয়ে শাপলা বেগম নামের এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়। স্বজনদের অভিযোগ, অ্যানেসথেসিয়ার ভুল ডোজের কারণে অপারেশন থিয়েটারেই তাঁর মৃত্যু হয়।

এর আগেও বগুড়ায় বিভিন্ন ক্লিনিকে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রভাতী ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভুল চিকিৎসায় এক গর্ভবতী নারীর মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে। মার্চে এনাম ক্লিনিকে প্রসূতি ও নবজাতকের মৃত্যু এবং সোনার দেশ ক্লিনিকে রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। তবে রোগী মৃত্যুর অধিকাংশ ঘটনায় মামলা হয় না।

শহরের বিভিন্ন ক্লিনিক ঘুরে দেখা গেছে, অনেকগুলোর লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ, কোনো কোনোটিতে নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও নার্স। ৩ জুন শহরের মফিজ পাগলা মোড়ের একতা ক্লিনিকে অভিযান চালান ভ্রাম্যমাণ আদালত। বৈধ লাইসেন্স, ডিউটি ডাক্তার ও নার্স ছাড়াই নোংরা পরিবেশে চলা এই ক্লিনিকে সরকারি ওষুধ অবৈধভাবে মজুত রাখার প্রমাণ মেলে। ফলে ক্লিনিক পরিচালক আনোয়ার হোসেনকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন আদালত। একই সঙ্গে ক্লিনিকের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এর আগের দিন ২ জুন ঠনঠনিয়া এলাকার সার্ক জেনারেল হাসপাতাল ও রুপালী ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারেও পাওয়া যায় নানা অনিয়ম। লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়া এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের দায়ে সার্ক জেনারেল হাসপাতালকে ২০ হাজার টাকা এবং রুপালী ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিককে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এর আগে গত বছরও রুপালী ক্লিনিকের ব্যবস্থাপককে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় পাঁচ শতাধিক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার থাকলেও পরিবেশগত ছাড়পত্র রয়েছে মাত্র ৮০টির। হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও রয়েছে বড় ধরনের ঘাটতি। পরিবেশ অধিদপ্তর রাজশাহী বিভাগের পরিচালক নিলুফা ইয়াসমিন বলেন, ছাড়পত্র ছাড়া হাসপাতাল পরিচালনা আইনসংগত নয়। নিয়ম না মানা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

বগুড়ার সিভিল সার্জন খুরশীদ আলম বলেন, অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। রোগীদের দালালের মাধ্যমে চিকিৎসা না নিয়ে সরকারি হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। তিনি আরও বলেন, অনুমোদনহীন এমন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আবারও তালিকা হচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত