Ajker Patrika

পান্তা ভাতেই চলে জীবন, দুই নাতিকে নিয়ে বাঁচার আকুতি রিজিয়া বিবির

মো. সাইফুল ইসলাম আকাশ বোরহানউদ্দিন (ভোলা) 
পান্তা ভাতেই চলে জীবন, দুই নাতিকে নিয়ে বাঁচার আকুতি রিজিয়া বিবির
ভাঙা টিনের ঘরে অনাহারে, অর্ধাহারে দিন কাটলেও স্বপ্নগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টায় অসহায় রিজিয়া বিবি। ছবি: আজকের পত্রিকা

দারিদ্র্যের নির্মম কশাঘাত বারবার ক্ষতবিক্ষত করেছে জীবনকে। বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু জীবনযুদ্ধে লড়তে লড়তে এখন ক্লান্ত, অবসন্ন হয়ে পড়েছেন তিনি। স্বামীর অসুস্থতা, সন্তানের চলে যাওয়ায় একদিকে মানসিকভাবে দুর্বল হয়েছেন, অন্যদিকে বয়সের ভারে ন্যুব্জ। অথচ দায়িত্ব তো কমেনি; এই বৃদ্ধ বয়সে যেখানে নিজের শরীর চলে না, সেখানে ছোট ছোট দুই নাতির ভাত, কাপড়, পড়াশোনার সব দায়িত্ব তাঁর কাঁধে এসে পড়েছে।

বলছিলাম ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার ৮ নম্বর পক্ষিয়া ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ এলাকার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা রিজিয়া বিবির কথা। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তিনি আজ মানবেতর জীবন যাপন করছেন। সংসারে নেই কোনো উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, নেই মাথা গোঁজার নিশ্চিন্ত ব্যবস্থা, রোগবালাইয়ে ভালো চিকিৎসা। দুই মাদ্রাসাপড়ুয়া নাতিকে নিয়ে চরম কষ্টে দিন পার করছেন রিজিয়া বিবি।

রিজিয়া জানান, ২০ থেকে ২৫ বছর আগে নদীতে মাছ ধরতেন তাঁর স্বামী বেলায়েত। কিন্তু ৮ থেকে ১০ বছর স্বামী কোনো কাজ করতে পারেন না। উল্টো স্বামীকে রোজগার করে খাওয়াতে হয় তাঁর। ভিক্ষা করে চলে তাঁদের সংসার। একমাত্র ছেলে কয়েক বছর আগে মা-বাবাকে ফেলে কোথায় চলে গেছেন জানেন না তিনি। অভাবের তাড়নায় একদিন ছেলের বউ ও নাতিদের রেখে ঘর ছাড়লেন। এখন নিজে অর্ধাহারে-অনাহারে থাকলেও ৬ ও ৮ বছর বয়সী দুই নাতিকে পড়ান মেঘনার তীরে বেড়িবাঁধ নূরানী মাদ্রাসায়।

রিজিয়া বিবির ভিটায় গিয়ে দেখা গেল, ছোট্ট একটা টিনের ঘর। ভাঙাচোরা কতগুলো টিন দিয়ে তৈরি ঘরটি ঝড়-বাদলে কীভাবে টিকে রয়েছে, ভেবে অবাক হতে হয়। সেখানেই একটি ভাঙা চৌকিতে শুয়েছিলেন এই রিজিয়া বিবি। জানালেন, প্রায়ই তাঁর দিন কাটে অনাহারে-অর্ধাহারে। কখনো প্রতিবেশীদের সহায়তা, আবার কখনো আল্লাহর ভরসায় চলে তাঁর সংসার। এখন তাঁর একটাই চাওয়া—দুই নাতিকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ করা। কিন্তু অভাবের সংসারে সেই চাওয়াটুকুও যেন আর পূরণ হয় না।

রিজিয়া বিবি বলেন, ‘না খাইয়া থাকতে থাকতে এখন আর খিদা লাগে না রে বাজান। মাঝেমধ্যে দুইটা পান্তা ভাত কচলাইয়া খাই। এইটাতেই চইলা যায় দিন। শুধু নাতি দুইটারে মানুষ করার চেষ্টা করি, কিন্তু সামর্থ্য নাই। এই দ্যাশের বড়লোকরা খালি যদি একটু সাহায্য করত, তাইলে আল্লাহর রহমতে আমরা বাঁচতে পারি।’

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, রিজিয়া বিবির পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে। শয্যাশায়ী স্বামী আর দুই নাতিসহ তাঁর পাশে দাঁড়ানোর মতো কোনো স্বজন নেই। এমনকি তদবিরকারী না থাকায় সরকারের বয়স্ক ভাতা বা ভিজিএফ কার্ডও জোটেনি তাঁদের।

রিজিয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে পক্ষিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন মাতব্বর বলেন, ‘বিষয়টি শুনেছি। খুব দ্রুতই আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করব।’

ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবির সেলিম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘রিজিয়ার বিষয়টি আপনার মাধ্যমে শুনলাম। খুবই খারাপ লাগছে, অনাহারে জীবন কাটায়, পান্তা ভাত কচলে খায়, বিষয়টি খুবই মর্মান্তিক। আমরা খুব দ্রুতই দেখব তিনি কেন সরকারি কোনো সহযোগিতা পাচ্ছেন না। এ বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করব, যাতে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেতে পারেন।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত