Ajker Patrika

ক্রমেই কমছে ইলিশ কারণ খুঁজতে সমীক্ষা

  • চার বছরের ব্যবধানে ১ লাখ ৫ হাজার ৭৪৬ টন ইলিশ আহরণ কমেছে
  • কারণ খুঁজতে চার মাসব্যাপী সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শুরু মৎস্য অধিদপ্তরের
  • বরিশাল, ভোলা ও পটুয়াখালীতে কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে
খান রফিক, বরিশাল 
আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৮: ৩০
ক্রমেই কমছে ইলিশ কারণ খুঁজতে সমীক্ষা
ফাইল ছবি

প্রায় পাঁচ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে নদ-নদীতে জাতীয় মাছ ইলিশের আহরণ কমছে। সাধারণত জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসকে ইলিশের ভরা মৌসুম ধরা হয়। কিন্তু এই সময়েও জেলেরা কাঙ্ক্ষিত ইলিশ পাচ্ছেন না। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরের ব্যবধানে ১ লাখ ৫ হাজার ৭৪৬ টন ইলিশ আহরণ কমেছে।

এর কারণ খুঁজতে এবং উৎপাদন বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে বরিশাল, ভোলা ও পটুয়াখালীতে চার মাসব্যাপী সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) করবে মৎস্য অধিদপ্তর। গতকাল শনিবার দ্বীপ জেলা ভোলার মনপুরা উপজেলায় এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

দক্ষিণাঞ্চলে সমীক্ষা করার জন্য মৎস্য অধিদপ্তরের এই দলে রয়েছেন মৎস্য বিশেষজ্ঞ আতিকুল ইসলাম। সমীক্ষার বিভিন্ন দিক নিয়ে আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘কীভাবে মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণ করা যায় এবং উৎপাদন বাড়ানো যায়, তা খুঁজতে এই সমীক্ষা করা হবে। এ সময় নদীতে ইলিশের বিচরণক্ষেত্র পরিদর্শন করা হবে। একই সঙ্গে মৎস্য আহরণ এবং জেলেদের জীবনমানের উন্নয়নে করণীয় খোঁজার চেষ্টা করা হবে। এ জন্য সমীক্ষা দল দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন উপজেলার মৎস্য কর্মকর্তা, জেলে, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলবে।’

মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চার মাসব্যাপী এই সম্ভাব্যতা সমীক্ষা দলের প্রধান রয়েছেন মৎস্যবিজ্ঞানী ও গবেষক অধ্যাপক ড. মো. নিয়ামুল নাসের। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এবং বিভাগটির সাবেক চেয়ারম্যান। সমীক্ষা দল শনিবার থেকে টানা ৯ দিন দক্ষিণাঞ্চলের ভোলার মনপুরা, চরফ্যাশন; বরিশালের হিজলা, মেহেন্দীগঞ্জ এবং পটুয়াখালীর কলাপাড়া, মহিপুর, আলীপুর পরিদর্শন করবে। সেখানে মৎস্যঘাট, বাজার, ব্যবসায়ী, জেলেদের মতামত নেবে।

মৎস্য অধিদপ্তর জানিয়েছে,

হঠাৎ করে ইলিশের উৎপাদন কমেনি। প্রায় পাঁচ বছর ধরে তা আশঙ্কাজনক হারে কমছে।

বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পুরো বিভাগে ইলিশ উৎপাদন তিন অর্থবছর ধরে কমছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৭২ হাজার ৩৪৩ টন উৎপাদনের পর থেকে প্রতিবছর কমতে শুরু করেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৮৩৪ টনে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৭৮৩ টন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আরও কমে ২ লাখ ৬৬ হাজার ৫৯৭ টনে নেমে আসে। অর্থাৎ গত চার বছরের ব্যবধানে ১ লাখ ৫ হাজার ৭৪৬ টন ইলিশ আহরণ কমেছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের দুই মাসেও ইলিশ আহরণের চিত্র করুণ।

কয়েক বছর আগেও ভরা

মৌসুমে বরিশাল পোর্ট রোড মোকামে দৈনিক যেখানে হাজার মণ ইলিশ সরবরাহ হতো, সেখানে গত শুক্রবার সরবরাহ ছিল মাত্র ৬০ মণ। ইলিশ আহরণের একই অবস্থা বিভাগের সব জেলাতেই।

পোর্ট রোড মোকামের লিয়া আড়তের স্বত্বাধিকারী নাসির উদ্দিন বলেন, ‘বর্ষা হলো, তবু নদীতে ইলিশ মিলছে না। শুক্রবার প্রতি কেজি বড় ইলিশ বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৭৫০ টাকা দরে। জাটকা বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ৩৫০ টাকা কেজি এবং ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হয়েছে ২০০০ টাকা দরে। অথচ কয়েক বছর আগেও এই সময়ে দৈনিক হাজার মণ ইলিশ সরবরাহ থাকত এই মোকামে। ইলিশের অভাবে মাছ ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার উপক্রম হয়েছে।’

ইলিশ উৎপাদন কমে যাওয়ার সম্ভাব্য কিছু কারণ জানিয়েছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপকূলীয় অঞ্চল অধ্যয়ন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হাফিজ আশরাফুল হক। তাঁর মতে, ইলিশ স্রোতের মাছ। নদীতে বেশ দৌড়ায়। কিন্তু চ্যানেলগুলো মরে গেছে। সাগর থেকে নদীতে আসার সময় মোহনায় পানি ও স্রোত নেই। নদীগুলো খরায় শুকিয়ে গেছে। এ কারণে ইলিশের আকার ছোট হয়ে গেছে এবং অপরিণত অবস্থায় ডিম চলে আসছে। যে কারণে ইলিশ বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে। একসময় বরিশালের সবাই ইলিশ খেতে পারত, এখন মধ্যবিত্তরাও খেতে পারছে না। তাঁর ধারণা, ইলিশের পরিমাণ গত ১০ বছরে ১০ ভাগের ১ ভাগে নেমেছে।

সমীক্ষা দলের দায়িত্বে থাকা ইলিশ বিশেষজ্ঞ ড. আনিছুর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ইলিশের এই সংকট এক দিনে হয়নি। তা দূর করতে কী করা যায়, তা পর্যবেক্ষণের জন্য সমীক্ষা দল কাজ করবে।’

বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘বৃষ্টি বাড়ার সঙ্গে মাছ আহরণও বাড়ার কথা; কিন্তু মেঘনা, কালাবদর, ইলিশা, কীর্তনখোলায় কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। ইলিশের এই সংকট কীভাবে কাটিয়ে ওঠা যায়, সেই পথ খুঁজতে একটি সমীক্ষা দল কাজ করবে। তাদের সহায়তা করার জন্য আমাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত