Ajker Patrika

পিরোজপুরে গাছের গোড়ায় গোড়ায় এডিস, বাড়ছে ডেঙ্গু

খান র‌ফিক, ব‌রিশালতামিম সরদার, পিরোজপুর
আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২৬, ০২: ২৯
পিরোজপুরে গাছের গোড়ায় গোড়ায় এডিস, বাড়ছে ডেঙ্গু
ডেঙ্গু রোগীর বাড়তি চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অনেক রোগী‌কে মেঝেতে থেকেও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। গতকাল পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে। ছবি: আজকের পত্রিকা

ডেঙ্গু প‌রি‌স্থি‌তি ব‌রিশা‌লে ক্রমেই অবনতির দি‌কে যা‌চ্ছে। বিভা‌গের ছয় জেলার ম‌ধ্যে পি‌রোজপুরে ডেঙ্গুতে আক্রা‌ন্তের সংখ‌্যা সব‌চে‌য়ে বে‌শি। পি‌রোজপু‌রের এই অবস্থা সারা‌ দেশ‌কে ছা‌ড়ি‌য়ে যা‌চ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বিভা‌গের ৬ জেলার বি‌ভিন্ন হাসপাতা‌লে ১০২ জন ডেঙ্গু রোগী ভ‌র্তি হ‌য়ে‌ছে। এর ম‌ধ্যে পি‌রোজপু‌রে ২৬ জন।

কেন পিরোজপুরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ সব‌চে‌য়ে বেশি; তার তিনটি কারণ দেখি‌য়ে‌ছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) প্রতি‌নি‌ধিদল। এগু‌লো হ‌চ্ছে—মানু‌ষের স‌চেতনতার অভাব; অধিকাংশ বা‌ড়ির ভেতরে কুয়া ক‌রে গাছ লাগা‌নো এবং নেছারাবা‌দ উপ‌জেলায় নার্সা‌রিতে এডিস মশার উপ‌স্থি‌তি পাওয়া গে‌ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল পি‌রোজপুরের সিভিল সার্জন মো. ম‌তিউর রহমান আজ‌কের প‌ত্রিকা‌কে ব‌লেন, গত সপ্তা‌হে আইইডিসিআরের পাঁচ সদ‌স্যের এক‌টি প্রতি‌নি‌ধিদল পি‌রোজপুর এসে‌ছি‌ল। তারা তিন ‌দিন তদন্ত শে‌ষে ডেঙ্গুতে আক্রা‌ন্ত রোগীর সংখ‌্যা বে‌শি হওয়ার নেপ‌থ্যে ক‌য়েক‌টি কারণ দে‌খি‌য়ে‌ছে।

সি‌ভিল সার্জন কার্যাল‌য়ের তথ‌্যম‌তে, ডেঙ্গুর প্রজননস্থল শনাক্তে আইইডিসিআরের একটি দল মাঠপর্যা‌য়ে কাজ করেছে। সেখানকার সুপারি ও নারকেলগাছের গোড়ায় এবং নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার প্রজননস্থল পাওয়া গে‌ছে।

এদিকে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বৃ‌দ্ধি পাওয়ায় পিরোজপুর সদর হাসপাতালে সাধারণ রোগীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। গতকাল সদর হাসপাতা‌লে অনেক রোগী‌কে মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নিতে দেখা গে‌ছে।

ডেঙ্গু রোগী মাহফুজ বলেন, ‘পাঁচ দিন ধরে জেলা হাসপাতালে ভর্তি রয়েছি। প্রচুর রোগীর চাপ। ডেঙ্গু রোগী ও সাধারণ রোগীদের একসঙ্গে রাখা হয়েছে। ফলে ডেঙ্গু রোগীরা পর্যাপ্ত সেবা পাচ্ছে না। স্যালাইন, ওষুধও ডেঙ্গু রোগীরা ঠিকমতো পাচ্ছে না।

আরেক রোগী আলেয়া বেগম জানান, তিন দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। কিন্তু পর্যাপ্ত সেবা পাচ্ছেন না। নার্সদের ডাকলে ঠিকমতো পাওয়া যায় না; বাথরুমের অবস্থা ভয়াবহ। ঠিকমতো ওষুধও পাচ্ছেন না তাঁরা।

এক রোগীর স্বজন আব্দুল মালেক বলেন, ‘আমার ছেলে দুই দিন ধরে ভর্তি রয়েছে। আমরা না পারি হাসপাতালে থাকতে, না পারছি বাইরে থাকতে। এখানে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীদের বারান্দায়ও থাকতে দিচ্ছে। নতুন হাসপাতাল চালু করে না, পুরোনো হাসপাতালে বারান্দায় থাকতে দেয়। ভোগান্তি যেন কমছেই না।’

ভান্ডারিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের রোগী কায়সার জানান, ডেঙ্গু রোগীদের আলাদা করে সেবা দেওয়া হচ্ছে না। সবাইকে একসঙ্গে রাখা হচ্ছে। এতে আরও ডেঙ্গু ছড়াতে পারে বলে ধারণা করছে সবাই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নজর নেই এখানে।

নেছারাবাদ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের রোগী ও স্বজনেরা জানান, সেখানেও ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি রোগী ভর্তি রয়েছে।

পিরোজপুরের সিভিল সার্জন মো. মতিউর রহমান স্বীকার করে বলেন, জেলা হাসপাতালে ধারণক্ষমতার চেয়ে তিন গুণ রোগী ভর্তি রয়েছে। ১০০ শয্যার জেলা হাসপাতালে বিভিন্ন ওয়ার্ডে ৩০০ জনের বেশি রোগী ভর্তি রয়েছে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ২৬ জন ভর্তি হয়েছে। জেলা হাসপাতাল ও বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স মিলে জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ৬৭ জন ভর্তি রয়েছে।

সিভিল সার্জন দাবি করেন, ‘ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীদের স্যালাইন, পর্যাপ্ত ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়াও জেলা হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের টেস্ট করানো হচ্ছে। আমরা সাধ্যমতো ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী ও অন্য রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছি।’

সিভিল সার্জন অফিসের মেডিকেল অফিসার আরিফ হাসান বলেন, এ বছর ডেঙ্গু রোগীর চাপ কমছে না। একজন রোগীর চিকিৎসায় পাঁচ-ছয় ‌দিন লাগছে। এর মধ্যে নতুন রোগী ভর্তি হ‌চ্ছে।

ব‌রিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ‌্য অধিদপ্ত‌রের তথ‌্যম‌তে, গত জানুয়ারি মা‌স থে‌কে আগস্ট পর্যন্ত বিভা‌গের ছয় জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হ‌য়ে হাসপাতা‌লে ভ‌র্তি হ‌য়ে‌ছে ৫ হাজার ১০১ জন। তাদের ম‌ধ্যে সব‌চে‌য়ে বে‌শি আক্রান্ত পি‌রোজপুর জেলায় ১ হাজার ৩৮১ জন। দ্বিতীয় অবস্থা‌নে থাকা ঝালকাঠিতে আক্রান্ত ১ হাজার ৩০৮ জন। বিভা‌গে মারা গে‌ছে ৮ জন।

সূত্রমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের ৬ জেলার বি‌ভিন্ন হাসপাতালে ১০২ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী ভ‌র্তি হয়েছে। এর ম‌ধ্যে পি‌রোজপুরে ২৬ জন। দ্বিতীয় অবস্থা‌নে থাকা ঝালকাঠিতে আক্রান্ত ১৬ জন।

‌খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৮ মাসে পি‌রোজপুর জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ১ হাজার ৩৮১ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে, যা বরিশাল বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ। এ সময়ে ডেঙ্গুতে একজনের মৃত্যুও হয়েছে। চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১ হাজার ৩১৩ জন। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৬৭ জন।

বর্তমানে পিরোজপুর সদর হাসপাতালে ১৬ জন, নাজিরপুরে ৯, নেছারাবাদে ৮, কাউখালীতে ২, ভান্ডারিয়ায় ৩১ এবং মঠবাড়িয়ায় একজন চিকিৎসাধীন রয়েছে। গত ৮ মাসে সবচেয়ে বেশি, ৬৩৮ রোগী ভর্তি হয়েছে পিরোজপুর সদর হাসপাতালে। এ ছাড়া নাজিরপুরে ৮৩, নেছারাবাদে ২২৫, কাউখালীতে ১০০, ভান্ডারিয়ায় ২৭৫ এবং মঠবাড়িয়ায় ৬০ জন ভর্তি হয়েছে।

ব‌রিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ‌্য প‌রিচালক মো. রেফায়েতুল হায়দার ব‌লেন, পি‌রোজপু‌রে ডেঙ্গু রোগী বাড়‌ছে। এ জন‌্য সেখানকার সি‌ভিল সার্জনের স‌ঙ্গে কথা বল‌ছেন। জলাবদ্ধ স্থা‌নে যা‌তে মশার লার্ভা না জম‌তে পা‌ড়ে সে জন‌্য সামা‌জিকভা‌বে উদ্বুদ্ধ করার কথা ব‌লে‌ছেন। পাশাপা‌শি হাসপাতা‌লে রোগী‌দের চি‌কিৎসা নি‌শ্চিত করার নি‌র্দেশনা দেওয়া হ‌য়ে‌ছে।

ডা. রেফায়েত বলেন, ‘আতঙ্কিত না হয়ে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। মশা‌রি টানাতে হবে। কোনোভাবেই বা‌ড়ির আশপাশে মশার লার্ভা হতে দেওয়া যাবে না।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত