Ajker Patrika

বান্দরবানের থানচি: সাঙ্গুর পাথর অবাধে লুট

  • শুকিয়ে যাওয়া সাঙ্গু নদী থেকে অবৈধভাবে পাথর ও বালু উত্তোলন চলছে
  • পাথর গুঁড়া করে বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা নির্মাণ প্রকল্পে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে
মংবোওয়াংচিং মারমা অনুপম থানচি (বান্দরবান)
বান্দরবানের থানচি: সাঙ্গুর পাথর অবাধে লুট
থানচির পর্যটন স্থান তিন্দু বাজার এলাকায় সাঙ্গু নদী থেকে অবৈধভাবে পাথর তুলে ভেঙে রাখা হয়েছে। ছবি: আজকের পত্রিকা

বান্দরবানের থানচি উপজেলার অন্যতম পর্যটন স্থান তিন্দু বাজার এলাকায় শুকিয়ে যাওয়া সাঙ্গু নদী থেকে অবৈধভাবে পাথর ও বালু উত্তোলন চলছে। এসব পাথর গুঁড়া করে বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা নির্মাণ প্রকল্পে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে। এতে একদিকে পর্যটন স্থানের আকর্ষণ হারানোর শঙ্কা, অন্যদিকে পরিবেশেরও ক্ষতি হচ্ছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ তুলেছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, থানচির তিন্দু বাজারের পাশ দিয়ে সাঙ্গু নদী বয়ে গেছে। শুষ্ক মৌসুম হওয়ায় নদীর বিভিন্ন স্থানে পানি শুকিয়ে গেছে। এসব স্থানে বড়-ছোট বিভিন্ন আকারের পাথর বেরিয়ে এসেছে। বাজারের পাশের একটি স্থানে নদী থেকে পাথর তুলে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। গত ডিসেম্বর থেকে তিন্দু বাজারের মুখে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) তল্লাশি চৌকি এবং পাশের এলাকা থেকে পাথর উত্তোলন করে আসছেন কয়েকজন ঠিকাদার।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, বিশালাকার পাথরগুলো রাতে বারুদের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এবং ক্রাশার দিয়ে ছোট টুকরো ও গুঁড়া করা হয়। পরে সেগুলো তিনটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ প্রকল্পে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে তিন্দু মাধ্যমিক উচ্চবিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ, তিন্দু বৌদ্ধবিহারে ভবন নির্মাণ এবং তিন্দু বাজারের একটি স্থাপনা নির্মাণ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নের ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দে তিন্দু গ্রোপিংপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবন নির্মাণের কার্যাদেশ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আগমা এন্টারপ্রাইজ। এটির মালিক রেমাক্রী ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান মুইশৈথুই মারমা রনি। তিনি কাজ না করে পাঁচ বছর ফেলে রেখে গত জানুয়ারিতে কাজ শুরু করেন। একই অবস্থা বৌদ্ধবিহারের একতলার ভবন নির্মাণ, বাজার সেট নির্মাণকাজ শুরু করেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি।

পাথর ও বালু উত্তোলন করে ভেঙে প্রকল্পের কাজে সরবরাহকারী স্থানীয় যুব লীগের নেতা শৈবাসিং মারমা বলেন, ‘আগমা এন্টারপ্রাইজ ঠিকাদার সংস্থার মালিক মুইশৈথুই মারমা রনির কথা অনুযায়ী আমি সাঙ্গু নদী থেকে পাথর ও বালু তুলে সেগুলো সরবরাহ করছি। আমার সঙ্গে রেমাক্রী বাজারে ছাত্রলীগের কর্মী হ্লাচিংমং মারমারও শেয়ার রয়েছে।’

তিন্দু মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বামং খিয়ান বলেন, ‘ইট ও পাথরের কংক্রিট মিশ্রণ করে ইতিমধ্যে ঢালাইয়ের কাজ শুরু করেছেন ঠিকাদার।’

রেমাক্রী ইউপি সদস্য ক্রানিঅং মারমা বলেন, ‘বছরের বিভিন্ন সময়ে দেশ-বিদেশের পর্যটকেরা থানচির পাহাড়-নদীঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে আসেন। বিশেষ করে নদীর পাড় ও পাথরময় প্রাকৃতিক দৃশ্য পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। সেখান থেকে পাথর উত্তোলনের ফলে দৃশ্যপটের স্বাভাবিক সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহেও বিরূপ প্রভাব পড়বে।’

অভিযোগের বিষয়ে আগমা এন্টারপ্রাইজের মালিক মুইশৈথুই মারমার মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।

থানচি জেলা পরিষদের সদস্য খামলাই ম্রো বলেন, ‘অপরিকল্পিতভাবে পাথর উত্তোলন চলতে থাকলে ভূমিক্ষয়, নদীভাঙন ও জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে পর্যটনশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নৌযান চালক ও গাইডদের জীবিকায় প্রভাব পড়বে।’

তিন্দু ইউপি চেয়ারম্যান ভাগ্য চন্দ্র ত্রিপুরা বলেন, ‘সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও পরিবেশ সংরক্ষণ ও পর্যটন সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে কাজ করা প্রয়োজন।’

এ বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের বান্দরবান ইউনিটের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইয়াছির আরফাত বলেন, ‘স্থানীয় পাথর ও বালুর ব্যবহারের কোনো সুযোগ নেই। যদি কোনো অনিয়ম বা পরিবেশগত ক্ষতির বিষয় প্রমাণিত হয়, তাহলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বান্দরবান জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরে উপপরিচালক মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘পাথর, বালু উত্তোলনের বিষয়টি খনিজ সম্পদ বিভাগে। আমাদের অধিদপ্তর পরিবেশ নিয়ে কাজ করে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত