Ajker Patrika

স্কুল ফিডিংয়ে বদলাচ্ছে চরাঞ্চলের শিক্ষাচিত্র

খোরশেদ আলম সাগর, লালমনিরহাট
স্কুল ফিডিংয়ে বদলাচ্ছে চরাঞ্চলের শিক্ষাচিত্র
স্কুল ফিডিংয়ের খাবার হাতে ভোটমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ছবি: আজকের পত্রিকা

তিস্তা, ধরলা ও সানিয়াজান নদীবেষ্টিত লালমনিরহাটের দুর্গম চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে বদলে যাচ্ছে চিত্র। একসময় যেসব শিশু ক্ষুধা আর দারিদ্র্যের কারণে নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসতে চাইত না, পুষ্টিকর টিফিন পেয়ে এখন তারাই ছুটছে স্কুলে। বাড়ছে উপস্থিতি, কমছে ঝরে পড়ার প্রবণতা। পাশাপাশি দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ে থাকার শক্তি পাওয়ায় পাঠদানে মনোযোগও বাড়ছে।

সরকারের পাইলট স্কুল ফিডিং কার্যক্রমের এমন ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে জেলার পাটগ্রাম ও কালীগঞ্জ উপজেলার ৩১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের দাবি—চরাঞ্চলের শিশুদের জন্য সুফল বয়ে আনা এই কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে সারা দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সম্প্রসারণ করা হোক।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর পাটগ্রাম ও কালীগঞ্জ উপজেলার বিদ্যালয়গুলোতে স্কুল ফিডিং কার্যক্রম শুরু হয়। প্রাক্‌-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা বিনা মূল্যে পুষ্টিকর টিফিন পাচ্ছে। পাটগ্রাম উপজেলায় ২২ হাজার ৮২৯ জন এবং কালীগঞ্জ উপজেলায় ১৯ হাজার ৮৫০ জন শিক্ষার্থী প্রতিদিন এ সুবিধার আওতায় রয়েছে।

ক্লাসের বিরতিতে শিক্ষার্থীদের উন্নতমানের বনরুটি, ডিম, দুধ ও কলা দেওয়া হয়। প্রতিদিন বনরুটির সঙ্গে একদিন প্যাকেটজাত ২০০ মিলিলিটার দুধ এবং অন্যদিন কলা দেওয়া হয়। সপ্তাহের বাকি তিন দিন বনরুটির সঙ্গে থাকে সিদ্ধ ডিম।

বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা বলছেন, আগে দুপুরের পর অনেক শিক্ষার্থী ক্ষুধা ও দুর্বলতার কারণে পাঠদানে মনোযোগ হারিয়ে ফেলত। এখন পুষ্টিকর খাবার পাওয়ায় তারা দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ে থাকতে পারছে। বেড়েছে উপস্থিতিও।

তিস্তা নদীবেষ্টিত ভোটমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আসাদুজ্জামান দুলু জানান, তাঁর বিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী তিস্তা নদী পেরিয়ে চরাঞ্চল থেকে আসে। সকালে বাড়িতে খেয়ে বিদ্যালয়ে এসে দীর্ঘ সময় থাকার কারণে দুপুরের পর অনেকেই দুর্বল হয়ে পড়ত। এতে পাঠদানে মনোযোগ কমে যেত এবং ঝরে পড়ার হারও উদ্বেগজনক ছিল।

তিনি বলেন, ‘স্কুল ফিডিং চালুর পর পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে। পুষ্টিকর খাবার পেয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বেড়েছে। বর্তমানে উপস্থিতির হার ৯৫ থেকে ৯৭ শতাংশ। শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এখন বসার জায়গা দিতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে।’

মদনপুর বৈরাতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হেশনে হাসিন কিংবদন্তি ও তাসলিমা ইয়াসমিন হুমায়রা জানায়, সকালে বাড়ি থেকে খেয়ে স্কুলে এসে বিকেল পর্যন্ত থাকা তাদের জন্য কষ্টকর ছিল। ক্ষুধার কারণে ক্লাসে মনোযোগও থাকত না। এখন স্কুলেই পুষ্টিকর খাবার পাওয়ায় দীর্ঘ সময় ক্লাস করার শক্তি পাচ্ছে তারা।

অভিভাবক আজিজার রহমান ও মঞ্জুম আলী বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। প্রতিদিন সন্তানদের টিফিনের জন্য খাবার বা টাকা দেওয়া সম্ভব হয় না। স্কুলে খাবার দেওয়ার পর শিশুরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাচ্ছে। তাই এই কার্যক্রম চালু রাখা দরকার।’

স্কুল ফিডিংয়ের আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো স্থানীয় নারীদের কর্মসংস্থান। বিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায় নারীদের মাধ্যমে সিদ্ধ ডিম ও কলা সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে স্থানীয় বেকার নারীরা উদ্যোক্তা হিসেবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।

বাস্তবায়নকারী সংস্থা ইএসডিওর জেলা ম্যানেজার বাবুল আক্তার জামান বলেন, স্বয়ংক্রিয় মেশিনে তৈরি বনরুটি এবং স্থানীয় নারীদের মাধ্যমে সিদ্ধ ডিম ও কলা সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতিটি বিদ্যালয়ের পাশে একজন করে নারীকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। তাঁরা প্রতি সপ্তাহে বিল পান। এতে একজন নারী মাসে প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা আয় করার সুযোগ পাচ্ছেন।

হাতীবান্ধা উপজেলা সদরের আল মদিনা বেকারি থেকে স্বয়ংক্রিয় মেশিনে তৈরি বনরুটি সরকারি লোগোযুক্ত প্যাকেটে বিদ্যালয়গুলোতে সরবরাহ করা হচ্ছে। দুধ সরবরাহ করছে আরডিএ নামের একটি এনজিও। দরপত্রের মাধ্যমে সরকার দুটি সংস্থাকে খাবার সরবরাহের দায়িত্ব দিয়েছে।

লালমনিরহাট জেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আহসান হাবিব বলেন, ‘আগে এসব বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ। স্কুল ফিডিং চালুর পর তা বেড়ে ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ হয়েছে। উপস্থিতি বৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পুষ্টি ও পাঠদানে মনোযোগও বেড়েছে। বিশেষ করে চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে এ কার্যক্রম ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।’

জেলার তিস্তা, ধরলা ও সানিয়াজান নদীবেষ্টিত ৩৬টি চরাঞ্চলের অনেক বিদ্যালয়েই দীর্ঘদিন শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি ও ঝরে পড়া ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। স্কুল ফিডিং চালু হওয়া বিদ্যালয়গুলোতে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। ফলে চরাঞ্চলের শিশুদের পুষ্টি ও শিক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন ধরে রাখতে পাইলট প্রকল্পটি সারা দেশে সম্প্রসারণের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত