Ajker Patrika

সৌদিকে রক্ষায় মক্কা চুক্তি বাস্তবায়নের ‘সময় এসেছে’, ‘যেকোনো পর্যায়ে’ যাওয়ার ঘোষণা পাকিস্তানের

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
সৌদিকে রক্ষায় মক্কা চুক্তি বাস্তবায়নের ‘সময় এসেছে’, ‘যেকোনো পর্যায়ে’ যাওয়ার ঘোষণা পাকিস্তানের
পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ। ছবি: এএফপি

সৌদি আরবের ওপর ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলা বাড়তে থাকায় পাকিস্তান-সৌদি আরব-তুরস্কের মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি বাস্তবায়নের ‘সময় এসেছে’ বলে মন্তব্য করেছেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ। একই সময়ে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে আরও সরাসরি বার্তা দেওয়া হয়েছে, সৌদি আরব আক্রান্ত হলে দেশটিকে রক্ষায় ইসলামাবাদ ‘যেকোনো পর্যায়ে’ যেতে প্রস্তুত।

গত বুধবার পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম জিও নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে খাজা আসিফ বলেন, পাকিস্তান সৌদি আরব এবং ইসলামের দুই পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এমনকি মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি না থাকলেও এসব স্থান রক্ষা করা পাকিস্তানের দায়িত্ব বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘মক্কা চুক্তি আমাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য এবং আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করব।’ তবে পাকিস্তান কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাননি।

এর পরদিন সৌদি সংবাদমাধ্যম আরব নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ও ইন্টার-সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনসের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী আরও শক্ত ভাষায় পাকিস্তানের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান কূটনৈতিক ও সরাসরি—দুইভাবেই সৌদি আরবের পাশে রয়েছে।’ এরপর তিনি বিশেষভাবে ‘সরাসরি’ শব্দটির ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘আমরা যেকোনো পর্যায়ে যাব।’

আহমেদ শরিফ চৌধুরী বলেন, সৌদি আরবের নিরাপত্তার প্রতি পাকিস্তানের প্রতিশ্রুতি নিঃশর্ত এবং এই প্রতিশ্রুতির মধ্যে মক্কা ও মদিনার সুরক্ষাও রয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয়। সৌদি আরবের বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আমরা দেশটিকে রক্ষা করে যাব।’

মক্কা চুক্তি কতটা সামরিকভাবে বাধ্যতামূলক?

গত ৭ আগস্ট মক্কায় পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক ‘জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

এই বিধানের কারণে চুক্তিটিকে ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, বিধানটিকে ন্যাটোর অনুচ্ছেদ–৫ এর মতো আক্ষরিক অর্থে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। এর অন্যতম কারণ, চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিধান এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ফলে কোনো সদস্য আক্রান্ত হলে অন্য দুই দেশকে ঠিক কী ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নিতে হবে, সে বিষয়ে প্রকাশ্য নথিতে স্পষ্টতা নেই।

এখানেই পাকিস্তানের সাম্প্রতিক বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গত সপ্তাহে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছিল, মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় কোনো পাকিস্তানি সামরিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে তখন আলোচনা হচ্ছিল না। তবে একই সঙ্গে ইসলামাবাদ বলেছিল, ‘সময় এলে’ তারা পদক্ষেপ নেবে।

সামরিক বাহিনীর সর্বশেষ বক্তব্য সেই অবস্থানের তুলনায় বেশি স্পষ্ট ও জোরালো। তবে আহমেদ শরিফ চৌধুরী জানাননি, সৌদি আরব নতুন করে পাকিস্তানের কাছে আরও সেনা, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণ চেয়েছে কি না।

সৌদিতে পাকিস্তানের সামরিক উপস্থিতি

সৌদি আরবে পাকিস্তানের সামরিক উপস্থিতি অবশ্য নতুন নয়। দুই দেশের ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের ‘স্ট্র্যাটেজিক মিউচুয়াল ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্টে’ও এক দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসনকে উভয় দেশের বিরুদ্ধে হামলা হিসেবে বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছিল। এরপর ২০২৬ সালের মে মাসে পাকিস্তান সৌদি আরবে প্রায় ৮ হাজার সেনা, জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানের একটি স্কোয়াড্রন, ড্রোন এবং এইচকিউ-৯ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করে। ওই মোতায়েনের খবর সে সময় রয়টার্স জানিয়েছিল।

এখন হুতি হামলা বাড়ার ফলে সৌদি আরবের বিদ্যমান বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সক্ষমতার ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, রিয়াদ পাকিস্তান, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও মিসরসহ কয়েকটি মিত্র দেশের কাছে সহায়তা চেয়েছে। তবে সৌদির সর্বশেষ অনুরোধের পর ওই সময় পর্যন্ত কোনো দেশ প্রকাশ্যে অতিরিক্ত সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়নি।

পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা কি চুক্তির আওতায়?

মক্কা চুক্তির সবচেয়ে স্পর্শকাতর প্রশ্নগুলোর একটি হলো পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রতিরোধ সক্ষমতা এর আওতায় পড়বে কি না। আহমেদ শরিফ চৌধুরী এ বিষয়ে সরাসরি কোনো নিশ্চয়তা দেননি, আবার সম্ভাবনাটিও স্পষ্টভাবে নাকচ করেননি।

এ নিয়ে ইসলামাবাদের আগের বক্তব্যও একরকম ছিল না। ২০২৫ সালে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের পর খাজা আসিফ বলেছিলেন, প্রয়োজন হলে পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা সৌদি আরবের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু পরে রয়টার্সকে তিনি বলেন, পারমাণবিক অস্ত্র ওই চুক্তির ‘বিবেচনায় নেই।’ ফলে নতুন চুক্তির অধীনে পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা কীভাবে বিবেচিত হবে, সে বিষয়ে এখনো প্রকাশ্য অবস্থান পরিষ্কার নয়।

ইরানকে পাকিস্তানের কূটনৈতিক বার্তা

সৌদি নিরাপত্তার বিষয়ে কঠোর সামরিক অবস্থানের পাশাপাশি পাকিস্তান সংঘাতকে আরও বিস্তৃত হওয়া ঠেকাতে কূটনৈতিক পথও সক্রিয় রেখেছে। খাজা আসিফ জানিয়েছেন, সৌদি আরবের পক্ষ থেকে ইরানের কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দিয়েছে পাকিস্তান। রিয়াদের উদ্বেগ হলো, ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা হুতিরা যেন সৌদি আরবের ওপর হামলা বন্ধ করে। খাজা আসিফ বলেন, তিনি মনে করেন না রাষ্ট্র হিসেবে ইরান এই পরিস্থিতিতে আরেকটি ফ্রন্ট খুলবে। কারণ ইরান ইতোমধ্যে এই অঞ্চলের একটি যুদ্ধে জড়িয়ে আছে। পাকিস্তান সংঘাত ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখবে বলেও জানান তিনি।

গত বুধবার পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির টেলিফোনে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে কথা বলেন। তখন আরাগচি চীন সফরে ছিলেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তারা আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। তবে হুতিদের হামলার বিষয়টি সরাসরি আলোচনায় উঠেছিল কি না, তা জানানো হয়নি।

আহমেদ শরিফ চৌধুরী বলেন, এসব বিষয়ে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব সৌদি আরবের নেতৃত্বের সঙ্গে ‘নিয়মিত যোগাযোগ’ রাখছে। একই সঙ্গে বৃহত্তর সংকটের ‘আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধান’ খুঁজতে পাকিস্তান আঞ্চলিক সরকারগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করছে।

পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা

সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি পাকিস্তান নিজেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতের একজন মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও তুলে ধরছে। ইসলামাবাদ কয়েক মাস ধরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনায় মধ্যস্থতা করেছে। এর ফল হিসেবে জুনে ‘ইসলামাবাদ মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ বা ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক তৈরি হয়।

এই সমঝোতায় যুদ্ধ বন্ধ করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে বিরোধ সমাধানের জন্য একটি কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সামরিক উত্তেজনা আবার বেড়ে যায় এবং সমঝোতা বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেওয়ায় আলোচনা থেমে যায়। আহমেদ শরিফ চৌধুরী ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারককে ‘একটি ঐকমত্যের দলিল’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, জটিল এই সামরিক পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার ‘একমাত্র বাস্তব পথ’ এটি।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে শিগগির আলোচনায় ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কোনো সময়সীমা জানাননি তিনি। তাঁর ভাষ্য, অবিশ্বাস, ‘বিঘ্নসৃষ্টিকারী’ এবং ‘বিরোধীদের’ উপস্থিতির মধ্যেও পাকিস্তান অভিন্ন জায়গা খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

সামনে যেসব প্রশ্ন

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে পাকিস্তানের অবস্থানের দুটি দিক একই সঙ্গে স্পষ্ট হচ্ছে। একদিকে সৌদি আরবের নিরাপত্তার বিষয়ে ইসলামাবাদ ক্রমেই জোরালো সামরিক নিশ্চয়তা দিচ্ছে। অন্যদিকে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক অন্যান্য পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সংঘাতের বিস্তার ঠেকানোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও চালাচ্ছে।

তবে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির বাস্তব প্রয়োগ এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। বিশেষ করে কোনো সদস্যের ওপর হামলার পর অন্য সদস্যদের বাধ্যতামূলক সামরিক পদক্ষেপ কী হবে, সৌদি আরবের বর্তমান অনুরোধের জবাবে পাকিস্তান নতুন করে কী মোতায়েন করবে, এবং পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রতিরোধ সক্ষমতা কোনো পরিস্থিতিতে এই নিরাপত্তা নিশ্চয়তার অংশ হবে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।

এর মধ্যে সৌদি আরবে হুতি হামলায় হতাহতের ঘটনা এবং গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামোয় ড্রোন হামলা রিয়াদের নিরাপত্তা উদ্বেগকে আরও বাড়িয়েছে। ফলে ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত মক্কা চুক্তি কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি হিসেবে থাকবে, নাকি এর বাস্তব সামরিক তাৎপর্যও সামনে আসবে, সেটিই এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত