Ajker Patrika

ময়মনসিংহ বিভাগ: ‘বিদ্রোহী’ ও জামায়াতের কৌশলে চ্যালেঞ্জের মুখে বিএনপি

  • ময়মনসিংহ জেলার ১১ আসনের ৯টিতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী
  • নেত্রকোনার ৫টি আসনের মধ্যে ১টিতে বিএনপির বিদ্রোহী
  • শেরপুরের ২টির মধ্যে ১টি এবং জামালপুরের ৫টির ১টিতে বিদ্রোহী
ইলিয়াস আহমেদ, ময়মনসিংহ 
ময়মনসিংহ বিভাগ: ‘বিদ্রোহী’ ও জামায়াতের কৌশলে
চ্যালেঞ্জের মুখে বিএনপি

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলায় আসন ২৪টি। এগুলোর মধ্যে শেরপুর-৩ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থীর মৃত্যুতে সেখানে স্থগিত করা হয়েছে ভোট গ্রহণ। বাকি ২৩টি আসনে জোরেশোরে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রচার। জামায়াতের প্রচারকৌশলের পাশাপাশি নিজ দলের ‘বিদ্রোহী’ (স্বতন্ত্র) প্রার্থীর কারণে জয়-পরাজয়ের জটিল সমীকরণে পড়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা।

ময়মনসিংহ জেলার ১১টি আসনের মধ্যে ৯টিতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। আর নেত্রকোনার ৫টি আসনের ১টিতে বিএনপির বিদ্রোহী, শেরপুরের ২টির ১টি এবং জামালপুরের ৫টি আসনের মধ্যে ১টিতে বিদ্রোহী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বাকি আসনগুলোতে জামায়াত মনোনীত প্রার্থীদের সঙ্গে তুমুল লড়াই হবে ধানের শীষের প্রার্থীদের।

ময়মনসিংহ-১ আসন: এই আসনে ঘোড়া প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা সালমান ওমর রুবেলের চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছেন ধানের শীষের প্রার্থী কেন্দ্রীয় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। তবে প্রিন্স ধানের শীষ প্রতীককে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে দেখছেন। তাঁদের ছাড়াও আরও চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

ময়মনসিংহ-২ আসন: বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য শাহ্ শহীদ সারোয়ার একটি হত্যা মামলায় জেলে থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। ১ ফেব্রুয়ারি তিনি জামিনে বের হলে ঘোড়া প্রতীকের প্রচারে নতুন মাত্রা পায়। এই আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মোতাহার হোসেন তালুকদার।

ফুলপুর বাজারের ব্যবসায়ী হামিদ খান বলেন, সারোয়ারের বাড়ি ফুলপুর হওয়ায় এখানে তিনি একচেটিয়া ভোট পাবেন। তারাকান্দার ভোটেও ভাগ বসাবেন। নির্বাচন খুবই জটিল সমীকরণে এগোচ্ছে। তাঁদের ছাড়াও প্রচারের মাঠে আরও পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

ময়মনসিংহ-৩ আসন: দলের দুঃসময়ে হামলা-মামলায় জেল খেটেও দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন বহিষ্কৃত নেতা সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আহাম্মদ তায়েবুর রহমান হিরন। ঘোড়া প্রতীক নিয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন তিনি।

এখানে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন প্রকৌশলী এম ইকবাল হোসাইন। এখানকার ভোটার আল-আমিন হোসেন বলেন, বিএনপি প্রার্থী নির্ধারণে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে ভোটের হিসাব এখনই মেলানো খুব কঠিন। এই আসনে আরও তিন প্রার্থী প্রচারে রয়েছেন।

ময়মনসিংহ-৪ আসন: সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই আসনে ধানের শীষ নিয়ে বিরামহীন প্রচারে রয়েছেন বিভাগীয় বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ। তবে ছাড় দিয়ে কথা বলছেন না ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মহানগর জামায়াতের আমির মাওলানা কামরুল আহসান এমরুল।

বোররচর গ্রামের কৃষক শহীদুল ইসলাম বলেন, ফজর নামাজ পড়েই জামায়াতের কর্মী-সমর্থকেরা প্রচার শুরু করেন। মানুষ বলছে, আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জাতীয় পার্টিকে ক্ষমতায় দেখছি, কিন্তু জামায়াতকে দেখিনি। এবার কী হয় বলাও যাচ্ছে না। এই দুজন ছাড়া আরও সাতজন প্রার্থী ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন।

ময়মনসিংহ-৫ আসন: এই আসনে ধানের শীষ নিয়ে লড়ছেন দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক জাকির হোসেন বাবলু। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী কেন্দ্রীয় জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদের সদস্য অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ। এই দুই প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকেরা নিজেদের গুণগান গেয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন প্রচার। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের কথা বলছেন ভোটাররা।

অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ রুখতে মানুষ দাঁড়িপাল্লাকে বেছে নেবে।

ধানের শীষের প্রার্থী জাকির হোসেন বাবলু বলেন, ভোট কারচুপির ষড়যন্ত্রের আশঙ্কায় রয়েছে সাধারণ ভোটাররা। মানুষ ধানের শীষের বাইরে যাবে না।

এই আসনে প্রচারের মাঠে দেখা গেছে আরও তিন প্রার্থীকে।

ময়মনসিংহ-৬ আসন: আসনটিতে বিএনপি এবং জামায়াতের বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। ধানের শীষের প্রার্থী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আখতারুল আলম। এই আসনে ফুটবল প্রতীক নিয়ে বিএনপির সাবেক এমপি শামছ উদ্দিন আহমেদের স্ত্রী আখতার সুলতানা প্রচারের মাঠে আলোচনায় রয়েছেন। জামায়াত মনোনীত প্রার্থী কামরুল হাসানের পাশাপাশি প্রচারে সাড়া ফেলেছেন জামায়াতের বহিষ্কৃত নেতা অধ্যাপক জসিম উদ্দিন। প্রচারের মাঠে আরও একজন প্রার্থীকে দেখা গেছে।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শারমিন নাহার বলেন, চার প্রার্থীকে ঘিরেই মূলত নির্বাচন। তবে যে-ই পাস করুক, ভোটের ব্যবধান খুব বেশি একটা হবে না।

ময়মনসিংহ-৭ আসন: ত্রিশালে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ডা. মাহাবুবুর রহমান লিটনের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সাবেক এমপি আব্দুল খালেক সরকারের ছেলে মুহাম্মদ আনোয়ার সাদাত। তিনি কাপ-পিরিচ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। গত উপজেলা নির্বাচনেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছিলেন সাদাত।

সাদাত বলেন, ‘চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার কয়েক দিন পরেই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে ক্ষমতায় বসা হয়নি। তাই জনগণ এবারও ভোট দিয়ে আমাকে তাঁদের খেদমত করার সুযোগ দেবেন।’ তবে ওই দুজন ছাড়াও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঠে রয়েছেন আরও চারজন প্রার্থী।

ময়মনসিংহ-৮ আসন: দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত বিএনপির সাবেক এমপি শাহ নুরুল কবির শাহিন দল থেকে পদত্যাগ করে ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের হয়ে হাতপাখা প্রতীকে লড়ছেন। এখানে বিএনপির শক্তিশালী প্রার্থী প্রকৌশলী লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু। ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী এলডিপির অ্যাডভোকেট আওরঙ্গজেব বেলাল। এই তিনজন ছাড়া ভোটের মাঠে রয়েছেন আরও এক প্রার্থী।

ময়মনসিংহ-৯ আসন: এই আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ইয়াসের খান চৌধুরীর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী তাঁর চাচি হাঁস প্রতীকের হাসিনা খান চৌধুরী। হাসিনা খান চৌধুরী চারবারের সাবেক এমপি খুররম খান চৌধুরীর স্ত্রী। তাঁদের নিজস্ব একটি ভোটব্যাংক রয়েছে। বর্তমানে প্রচার চলছে সমানে সমান।

হাসিনা খান চৌধুরী বলেন, ‘মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে শুধু প্রার্থী হয়েছি। আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই।’

ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, ‘দলীয় নেতা-কর্মীরা আমার পক্ষে রয়েছে। মানুষ স্বতন্ত্র কাউকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন না।’

এই আসনে আরও চার প্রার্থী প্রচারের মাঠে রয়েছেন।

ময়মনসিংহ-১০ আসন: এই আসনে বিএনপির প্রার্থী আক্তারুজ্জামান বাচ্চু। তাঁর শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হাঁস প্রতীকের আবু বকর সিদ্দিকুর রহমান। তিনি জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক। আরও সাতজন প্রার্থী মাঠে থাকলেও ভোটাররা বলছেন, এই দুজনের মধ্যেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে।

ময়মনসিংহ-১১ আসন: ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুকে মনোনয়ন দেওয়ার পর পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে উত্তাল হয়ে ওঠে ভালুকার রাজনীতি। হরিণ প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহাম্মদ মোর্শেদুল আলম আলোচনায় রয়েছেন।

হবিরবাড়ি এলাকার ভোটার আজহারুল ইসলাম বলেন, কয়েকটি ইউনিয়নে হরিণ প্রতীকে একচেটিয়া ভোট আসবে।

ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু বলেন, ‘যে যত কথাই বলুক না কেন, মানুষের আস্থা তারেক রহমানে। ধানের শীষ জোয়ারে ভাসছে। বিজয় আমাদেরই হবে।’

জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রার্থী ডা. জাহেদুল ইসলামসহ প্রচারে রয়েছেন আরও তিনজন।

জামালপুরের চিত্র

৫টি আসন নিয়ে জামালপুর জেলা। এগুলোর মধ্যে একটি ছাড়া বাকি চারটিতে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মনে করছেন ভোটাররা। প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঠে রয়েছেন ৩১ জন প্রার্থী।

জামালপুর-৩ (মেলান্দহ-মাদারগঞ্জ) আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস ভোটারদের। এখানে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে মেলান্দহ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলকে। বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী হিসেবে মেলান্দহ উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাদিকুর রহমান ছিদ্দিকী শুভ লড়ছেন কাপ-পিরিচ প্রতীক নিয়ে। এতে ভোটাররা কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছেন।

ধানের শীষের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল বলেন, ‘যারা দলের বিপক্ষে, তাদেরকে দলও ভালোবাসে না, ভোটাররাও না। বিজয় ধানেই আসবে।’

এই আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে মাওলানা মুজিবুর রহমান আজাদীও আলোচনায় রয়েছেন।

নেত্রকোনার চিত্র

নেত্রকোনা জেলায় ৫টি আসন। প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২৫ জন প্রার্থী। তাঁদের মধ্যে তিনটি আসনে বিএনপি প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে মনে করছেন ভোটাররা। বাকি তিনটিতে বিএনপির অবস্থান শক্ত বলে ধারণা তাঁদের।

নেত্রকোনা-৩ (কেন্দুয়া-আটপাড়া) আসনে ধানের শীষে নির্বাচন করছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলাম হিলালী। তাঁর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ঘোড়া প্রতীক নিয়ে লড়া বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন ভূইয়া দুলাল। তিনি উপজেলা বিএনপির সদস্য ও কেন্দুয়া উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান।

এ ছাড়া নেত্রকোনা-১ (কলমাকান্দা-দুর্গাপুর) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সঙ্গে সমানতালে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আলহাজ গোলাম রব্বানী। ভোটাররা মনে করেন, প্রচারের মাঠে কেউ কাউকে ছাড় দিয়ে কথা বলছেন না। ভোটও টানবেন সমানে সমান।

রিকশাচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে এই দুই প্রার্থীর মধ্যে। তবে কে বিজয়ী হবে, এখনো বলা যাচ্ছে না।

নেত্রকোনা-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী আবু তাহের তালুকদার এবং জামায়াতের প্রার্থী মাছুম মোস্তফার মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। সেখানে জামায়াতের শক্ত অবস্থান রয়েছে বলে মনে করছেন ভোটাররা।

শেরপুরের চিত্র

৩টি আসন নিয়ে শেরপুর জেলা। জামায়াতের প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদল মারা যাওয়ায় শেরপুর-৩ আসনে নির্বাচন স্থগিত করেছেন নির্বাচন কমিশন।

শেরপুর-১ (সদর) আসনে বিএনপির প্রার্থী ডা. সানসিলা জেবরীন প্রিয়াংকা। আর মোটরসাইকেল প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা শফিকুল ইসলাম। জামায়াতের প্রার্থী হয়ে লড়ছেন হাফিজ রাশেদুল ইসলাম।

ভোটার সাইফ উদ্দিন বলেন, ধানের শীষের ভোট দুই ভাগ হবে। প্রিয়াংকা সহজে জয় পাবেন না। জয়ের জন্য সামনের দিনগুলো তাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে হবে।

শেরপুর-২ আসনে বিএনপি প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের প্রার্থী। তবে বিএনপির অবস্থান শক্ত বলে মত ভোটারদের।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত