Ajker Patrika

রাজশাহী বিভাগ: বিএনপির বড় পরীক্ষা বেশির ভাগ আসনেই

  • ২৭ আসনে জামায়াত ও দলের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীরা বিএনপির প্রার্থীদের জন্য চ্যালেঞ্জ
  • এর মধ্যে ৭টিতে জামায়াতের প্রার্থী শক্ত অবস্থানে, ২০টিতে লড়াই হবে সমানে সমান
  • মোট ৩৯ আসনের মধ্যে ১২টিতে বিএনপির প্রার্থীদের এগিয়ে রাখছেন ভোটাররা
 রিমন রহমান, রাজশাহী
রাজশাহী বিভাগ: বিএনপির বড় পরীক্ষা বেশির ভাগ আসনেই

রাজশাহী বিভাগের বেশির ভাগ আসনেই বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে বিএনপি। কোথাও জামায়াতের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আবার কোথাও ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর কারণে ভোটের দিন যতই এগিয়ে আসছে, ততই বিএনপির ভোটের হিসাবনিকাশ জটিল হচ্ছে। বিএনপির প্রার্থীরা অবশ্য বলছেন, ভোটের মাঠে ধানের শীষেরই জোয়ার আছে। তবে তারা এখন ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছেন।

রাজশাহী বিভাগের ৮ জেলায় মোট সংসদীয় আসন ৩৯টি। এর মধ্যে অন্তত ২৭ আসনে জামায়াতে ইসলামী এবং দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরা বিএনপির প্রার্থীদের চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন। আর মাঠের পরিস্থিতিতে বাকি ১২ আসনে বিএনপির প্রার্থীদের এগিয়ে রাখছেন এলাকার ভোটাররা। যে ২৭ আসনে ভোটের হিসাব জটিল, তার মধ্যে অন্তত ৭টি আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা ভালো অবস্থানে আছেন বলে তাদের দাবি। অন্য ২০টি আসনে লড়াই হবে সমানে সমান।

এ পরিস্থিতিতে সব দলের প্রার্থীদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ভোটারদের কাছে টানার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। নির্বাচিত হলে তারা সবাই একসঙ্গে নিরাপদে এলাকায় থাকার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।

বিভাগের আসনগুলোর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এমন একজন বিএনপি নেতা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘কিছু কিছু এলাকায় প্রার্থী দেওয়ার ক্ষেত্রে ভুল হয়েছে। ফলে দ্বন্দ্ব বেড়ে গেছে। এ জন্য সমস্যা হচ্ছে। নীতিনির্ধারকেরা সমস্যা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন।’ তবে ভোটের আগে শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষ ধানের শীষ প্রতীক দেখেই ভোট দেবে বলে তাঁর দাবি।

৮ আসনে বিদ্রোহ

বিভাগের ৮টি আসনে বিদ্রোহের মুখে পড়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা। এসব আসনে ভোটের হিসাব জটিল। এর মধ্যে রাজশাহী-৫ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী অধ্যাপক নজরুল ইসলামের সঙ্গে বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন দলের নেতা ইসফা খায়রুল হক শিমুল ও রেজাউল করিম।

নাটোর-১ আসনে ধানের শীষের ফারজানা শারমীন পুতুলকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন বিদ্রোহী তাইফুল ইসলাম টিপু। নাটোর-৩ আসনে বিএনপির আনোয়ারুল ইসলাম আনুর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন বিদ্রোহী দাউদার মাহমুদ। নওগাঁ-১ আসনে বিএনপির মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে রয়েছেন সাবেক এমপি ছালেক চৌধুরী। নওগাঁ-৩ আসনে বিএনপির ফজলে হুদার সঙ্গে লড়ছেন বিদ্রোহী পারভেজ আরেফিন সিদ্দিকী। পারভেজ সাবেক ডেপুটি স্পিকার আখতার হামিদ সিদ্দিকীর ছেলে। নওগাঁ-৬ আসনে সাবেক প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবিরও বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন দলের প্রার্থী শেখ মো. রেজাউল ইসলামের সঙ্গে।

পাবনা-৩ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী হাসান জাফির তুহিনের সঙ্গে লড়ছেন সাবেক এমপি কে এম আনোয়ারুল ইসলাম। পাবনা-৪ আসনে হাবিবুর রহমান হাবিবের সঙ্গে রয়েছেন বিদ্রোহী জাকারিয়া পিন্টু। বিএনপির এই বিদ্রোহের সুযোগ খুঁজছে জামায়াত।

রাজশাহী-৫ আসনের বিদ্রোহী প্রার্থী ইসফা খায়রুল হক শিমুল বলেন, ‘আমি দুঃসময়ে নেতা-কর্মীদের পাশে থেকেছি। তাঁরাই আমাকে ভোটের মাঠে এনেছেন। তাঁদের রেখে সরতে পারি না।’

২২ আসনে লড়াই জমাচ্ছে জামায়াত

রাজশাহী বিভাগের অন্তত ২২ আসনে লড়াই জমিয়ে তুলেছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা। কোথাও কোথাও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে তাঁরা সুবিধা পাচ্ছেন। এর মধ্যে রাজশাহী-১ আসনে বিএনপির মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীনের সঙ্গে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, রাজশাহী-৩ আসনে বিএনপির শফিকুল হক মিলনের সঙ্গে জামায়াতের আবুল কালাম আজাদ, রাজশাহী-৪ আসনে ধানের শীষের ডি এম ডি জিয়াউর রহমান জিয়ার সঙ্গে জামায়াতের ডা. আব্দুল বারী সরদার, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির হারুনুর রশীদের সঙ্গে জামায়াতের নুরুল ইসলাম বুলবুল, নাটোর-২ আসনে বিএনপির রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর সঙ্গে জামায়াতের ইউনুস আলী ও নাটোর-৪ আসনে বিএনপির আব্দুল আজিজের সঙ্গে জামায়াতের আব্দুল হাকিমের লড়াই হবে।

নওগাঁ-১ আসনে বিএনপি ও তাদের বিদ্রোহীর সঙ্গে লড়াই জমিয়েছেন জামায়াতের মাহবুবুল আলম, নওগাঁ-২ আসনে বিএনপির সামসুজ্জোহা খানের সঙ্গে জামায়াতের এনামুল হক, নওগাঁ-৪ আসনে বিএনপির ইকরামুল বারী টিপুর সঙ্গে জামায়াতের আব্দুর রাকিব, নওগাঁ-৫ আসনে বিএনপির জাহিদুল ইসলাম ধলুর সঙ্গে জামায়াতের আবু সাদাত মো. সায়েম, জয়পুরহাট-১ আসনে বিএনপির মাসুদ রানা প্রধানের সঙ্গে জামায়াতের ফজলুর রহমান সাঈদ, সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপির এম আকবর আলীর সঙ্গে জামায়াতের রফিকুল ইসলাম খান, সিরাজগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির আমিরুল ইসলাম খানের সঙ্গে জামায়াতের আলী আলমের লড়াই হবে বলে ভোটাররা জানিয়েছেন।

এ ছাড়া পাবনা-১ আসনে বিএনপির শামসুর রহমানের সঙ্গে প্রয়াত মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান, পাবনা-৩ আসনে বিএনপির হাসান জাফির তুহিনের সঙ্গে জামায়াতের মুহাম্মদ আলী আছগার, পাবনা-৪ আসনে বিএনপির হাবিবুর রহমান হাবিবের সঙ্গে জামায়াতের আবু তালেব মণ্ডল ও পাবনা-৫ আসনে বিএনপির শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের সঙ্গে জামায়াতের ইকবাল হোসাইন লড়াই জমিয়েছেন।

দলের দুর্গ হিসেবে খ্যাত বগুড়ার বেশির ভাগ আসনেও বিএনপিকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। এর মধ্যে বগুড়া-১ আসনে বিএনপির কাজী রফিকুল ইসলাম ও জামায়াতের মো. শাহাবুদ্দিন; বগুড়া-২ আসনে বিএনপির মীর শাহে আলম ও জামায়াতের আবুল আজাদ মোহাম্মদ শাহাদুজ্জামান; বগুড়া-৩ আসনে বিএনপির আব্দুল মহিত তালুকদার ও জামায়াতের নূর মোহাম্মদ; বগুড়া-৪ আসনে বিএনপির মোশারফ হোসেন ও জামায়াতের মোস্তফা ফয়সাল এবং প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার বগুড়া-৭ আসনে বিএনপির মোরশেদ মিলটন ও জামায়াতের গোলাম রাব্বানীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে এলাকার লোকজন জানিয়েছেন।

১২ আসনে নিরাপদে ধানের শীষ

এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভাগের ৩৯ আসনের মধ্যে অন্তত ১২টিতে এখন ধানের শীষ তুলনামূলক নিরাপদে রয়েছে। এর মধ্যে বগুড়া-৬ আসনে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ধানের শীষ নিরাপদে। বগুড়া-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী গোলাম মোহাম্মদ সিরাজও ভোটের মাঠে এগিয়ে আছেন।

অন্য জেলাগুলোর মধ্যে রাজশাহী-২ আসনে ধানের শীষের মিজানুর রহমান মিনু, রাজশাহী-৬ আসনে আবু সাঈদ চাঁদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনে শাহজাহান মিঞা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনে আমিনুল ইসলাম, জয়পুরহাট-২ আসনে আব্দুল বারী, সিরাজগঞ্জ-১ আসনে সেলিম রেজা, সিরাজগঞ্জ-২ আসনে ইকবাল হাসান মাহমুদ, সিরাজগঞ্জ-৩ আসনে আয়নুল হক, সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে এম এ মুহিত ও পাবনা-২ আসনে এ কে এম সেলিম রেজা হাবিবকে এগিয়ে রাখছেন ভোটাররা।

আবার যেসব আসনে জামায়াত হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করছে সেগুলোর মধ্যে রাজশাহী-৪ আসনের ডা. আব্দুল বারী, নাটোর-৪ আসনের আব্দুল হাকিম, নওগাঁ-১ আসনের মাহবুবুল আলম, বগুড়া-২ আসনের আবুল আজাদ মোহাম্মদ শাহাদুজ্জামান, বগুড়া-৭ আসনে গোলাম রাব্বানী, জয়পুরহাট-১ আসনে ফজলুর রহমান সাঈদ ও পাবনা-৪ আসনে আবু তালেব মণ্ডলকে এগিয়ে রাখছেন ভোটাররা।

১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের কারণে জামায়াত বিভাগের তিনটি আসন ছেড়ে দিয়েছে। এর মধ্যে নাটোর-৩ আসনে এনসিপির জার্জিস কাদিরকে এবং সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে এনসিপির এস এম সাইফ মোস্তাফিজকে সমর্থন দিয়েছে জামায়াত। জোটসঙ্গীদের নিয়েও দুই আসনেই এনসিপির শাপলা কলির অবস্থান দুর্বল বলে মত ভোটারদের। সিরাজগঞ্জ-৩ আসনে ১১ দলীয় জোটের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের রিকশা প্রতীকের প্রার্থী মুহা. আব্দুর রউফ সরকারকে সমর্থন দিয়েছে জামায়াত। এখানেও অবস্থা একই।

ষড়যন্ত্র দেখছেন বিএনপির প্রার্থীরা

বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ে বেশ বেকায়দায় আছেন নওগাঁ-৬ আসনের বিএনপির প্রার্থী শেখ মো. রেজাউল ইসলাম। তবে তিনি বলেন, ‘আমার এখানে কোনো বিদ্রোহী প্রার্থী নেই। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী। ২০ বছর আগে তিনি একবার এমপি হয়েছিলেন। এখন মানুষ তাঁকে চেনে না। এখানে ধানের শীষ ভালো অবস্থানে আছে। আমরা এখন ষড়যন্ত্র দেখতে পাচ্ছি। সেটা মোকাবিলা করছি।’

কারা ষড়যন্ত্র করছে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনারা সেটা জানেন। জামায়াত সিল তৈরি করতে গিয়ে ধরা পড়ল, সেটা কি আপনারা জানেন না? আমরা এখন সেদিকেই মনোযোগ দিচ্ছি।’

একইভাবে ষড়যন্ত্রের কথা বললেন বগুড়া-৩ আসনের বিএনপির প্রার্থী আব্দুল মহিত তালুকদার। তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষের মধ্যে ধানের শীষের ভালো প্রভাব। এখন আমরা ষড়যন্ত্রের কথা শুনছি। জামায়াত কারচুপি করতে পারে। এটাই এখন চ্যালেঞ্জ।’

জানতে চাইলে জামায়াতের রাজশাহী জোনের পরিচালক ও বগুড়া-১ আসনের দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী মো. শাহাবুদ্দিন বলেন, ‘কোথাও ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত করার প্রয়োজন নেই। আমাদের জোনে দু-একটি আসন বাদে সবখানেই দাঁড়িপাল্লার অবস্থান ভালো।’

বিভাগের ৩৯ আসনের মধ্যে কোথাও কোথাও সমস্যা থাকার কথা স্বীকার করলেন বিএনপির রাজশাহী বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহীন শওকত। তিনি বলেন, ‘আমাদের কিছু আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী আছে। কিছু এলাকায় জামায়াতের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী। সেখানে কিছু সমস্যা আছে। আমরা চেষ্টা করছি শেষ পর্যন্ত যেন বিদ্রোহী প্রার্থীরা সরে যান। সে ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জগুলো কমে আসবে। বাকি আসনগুলোতে বিএনপির অবস্থান ভালো।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত