Ajker Patrika

এক মন্দিরেই ১০১ প্রতিমা, ৪ যুগের কাহিনিতে সাজছে ব্যতিক্রমী পূজামণ্ডপ

জাহিদ হাসান, যশোর 
এক মন্দিরেই ১০১ প্রতিমা, ৪ যুগের কাহিনিতে সাজছে ব্যতিক্রমী পূজামণ্ডপ
১০১ প্রতিমায় চার যুগের কাহিনিতে সাজছে চাঁচড়া শ্রীহরি মন্দির। ছবি: আজকের পত্রিকা

সারি সারি ছোট-বড় প্রতিমা। দেব-দেবীর নানান রূপ। একটি-দুটি নয়, এক ছাদের নিচে ঠাঁই পেয়েছে ১০১টি প্রতিমা। সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি—এই চার যুগের ধর্মীয় ও পৌরাণিক নানা উপাখ্যান ফুটিয়ে তোলা হয়েছে প্রতিমার শৈল্পিক রূপান্তরের মাধ্যমে।

যশোর শহরতলির চাঁচড়া বর্মণপাড়া শ্রীহরি মন্দিরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব ঘিরে করা হয়েছে এই ব্যতিক্রমী আয়োজন।

এই বিশাল আয়োজনে জায়গা পেয়েছে সরস্বতী, শিব, রাধা-কৃষ্ণ, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, লক্ষ্মী-নারায়ণ, রাম-সীতা, হনুমান, কপূতা রাক্ষসী, কুম্ভকর্ণ, জগদ্ধাত্রী, কালী, মনসাসহ বিভিন্ন দেব-দেবী ও পৌরাণিক চরিত্র।

মৃৎশিল্পীদের টানা দুই মাসের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় কাঁচা মাটির কাঠামো প্রাণ ফিরে পাচ্ছে এসব প্রতিমায়। শেষ সময়ে এখন চলছে রঙের কাজ। চার যুগের আবহ নিয়ে তৈরি এই ব্যতিক্রমী মণ্ডপ শুধু স্থানীয়দের মধ্যেই উচ্ছ্বাস জাগায়নি; বরং শরতের শুভ্রতা, ঢাকের বাদ্য আর প্রতিমার বৈচিত্র্যে দূরদূরান্তের দর্শনার্থীদেরও দারুণভাবে আকৃষ্ট করবে। দিনরাত পরিশ্রমের পর এখন উৎসবের প্রহর গুণছেন প্রতিমা ভাস্করেরা। উৎসব শুরুর আগেই এটি দেখতে ইতিমধ্যে দূরদূরান্ত থেকে ভক্তরা আসতে শুরু করেছেন।

মন্দির কর্তৃপক্ষের আশা, এই আয়োজন সনাতন ধর্মের নতুন প্রজন্মকে তাদের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ধর্মীয় শিক্ষা সম্পর্কে জানতে সাহায্য করবে।

স্থানীয় বাসিন্দা শিপ্রা বর্মন বলেন, ‘আমরা প্রতিবছর অন্য এলাকায় যাই প্রতিমা দেখতে। এবার আমাদের গ্রামে এত সুন্দর একটা পূজা হচ্ছে, এটা আমাদের অনেক দিনের স্বপ্ন ছিল। অনেক দিন ধরে আমাদের মনে এই আশা ছিল। ভগবান এবার আমাদের সেই আশাটা পূর্ণ করেছেন, তাই আমরা অনেক খুশি।’

দীপঙ্কর বর্মন নামের অপর এক স্থানীয় বলেন, ‘আমাদের বর্মণপাড়াতে ১০১টি প্রতিমার মাধ্যমে সনাতন ধর্মের চার যুগ তুলে ধরা হয়েছে। নতুন প্রজন্মের কাছে হিন্দু ধর্মের যুগে যুগে যে পরিবর্তন, তা দেখে ভালো লাগছে এবং নতুন কিছু শিখতে পারছি।’

বর্মণপাড়া গ্রাম উন্নয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক শিমুল বর্মণ জানান, ‘সারা বিশ্বে যে অশান্তি চলছে, আমরা শান্তির বার্তা আনার জন্য আমাদের এই থিমটা তৈরি করেছি। সনাতনীদের চারটি যুগ আছে—সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি। এই যুগ অনুসারে দুষ্টদের দমন করার জন্য যুগে যুগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বিভিন্ন রূপে আবির্ভূত হয়েছেন। সেই ভাবটাই আমরা এখানে প্রতিমার মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। ইতিমধ্যে ব্যাপক সাড়াও পাচ্ছি। অনেক দর্শনার্থী আসা শুরু করেছেন। আমরা আশা করছি, এখানে ব্যাপক লোকসমাগম ঘটবে।’

মন্দিরটির ভাস্কর আকাশ মণ্ডল বলেন, ‘চার যুগের কাহিনিতে দুই মাস ধরে প্রতিমাগুলো তৈরি করেছি। ইতিমধ্যে রঙের কাজও শেষের দিকে। রাতদিন কাজ করছি, সামান্য কিছু সাজসজ্জার কাজ বাকি রয়েছে। দর্শনার্থীরা দেখতে এসে যখন কাজের প্রশংসা করছেন, তখন মন আনন্দে উদ্বেলিত হচ্ছে।’

শারদীয় দুর্গোৎসব ঘিরে চাঁচড়ার এমন ব্যতিক্রমী প্রতিমার আয়োজনের পাশাপাশি যশোরের আটটি উপজেলায় এবার মোট ৭৪৩টি মন্দির ও মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। সবখানেই চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। বিভিন্ন মণ্ডপে এখন প্রতিমা তৈরি ও সাজসজ্জার ধুম। অনেকেই বায়না দেওয়া প্রতিমা নিতেও আসছেন।

যশোর শহরের বেজপাড়া সর্বজনীন পূজা মন্দিরের ভাস্কর শঙ্কর মণ্ডল জানান, এবার তিনি ৩৭টি প্রতিমা তৈরি করছেন। সময়মতো সরবরাহ দিতে দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।

পূজা উদযাপন পরিষদ যশোরের সভাপতি দীপঙ্কর দাস রতন জানান, গত বছরের চেয়ে এবার ২৮টি বেশি মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘মণ্ডপে ডিজে না বাজিয়ে ভক্তিগীতি বাজানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি মন্দিরের জন্য হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে সম্প্রীতি কমিটি গঠন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

এদিকে জেলার মণ্ডপগুলোতে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কা নেই। শঙ্কাহীন পরিবেশে যেন নির্বিঘ্নে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়, সেজন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত