Ajker Patrika

বাস রুট রেশনালাইজেশনের জরিপ: রাজধানীতে সড়ক ৪ হাজার কিমি বাসের উপযোগী ২৮০ কিমি

তৌফিকুল ইসলাম, ঢাকা
বাস রুট রেশনালাইজেশনের জরিপ: রাজধানীতে সড়ক ৪ হাজার কিমি বাসের উপযোগী ২৮০ কিমি
ফাইল ছবি

ঢাকা মহানগরের প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার সড়কের মধ্যে লেনভিত্তিক বাস চলাচলের উপযোগী মাত্র ২৮০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় রয়েছে ১৬৮ কিলোমিটার এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ১১২ কিলোমিটার। বাস রুট রেশনালাইজেশন নিয়ে মাঠপর্যায়ের জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) বলছে, পুরো ৪ হাজার কিলোমিটার সড়ককে বাস চলাচলের জন্য বিবেচনা করা হয়নি। লেনভিত্তিক যেসব সড়কে বাস চলাচলের মতো পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে, শুধু সেগুলো বাসের উপযোগী হিসেবে ধরা হয়েছে। অন্য সড়কগুলো ছোট যানবাহনের জন্য ব্যবহৃত হবে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এর পেছনে ঢাকার অপরিকল্পিত নগরায়ণও দায়ী। ঢাকা উত্তর কিছুটা পরিকল্পিত হলেও দক্ষিণ অংশ অনেকটা অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। ফলে অনেক সড়ক বড় বাস চলাচলের উপযোগী করে তৈরি হয়নি।

ঢাকা মহানগরে বাস রুট রেশনালাইজেশন কার্যক্রম নিয়ে গত ২৮ সেপ্টেম্বর মতবিনিময় সভায় মাঠপর্যায়ের জরিপের এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সভার কার্যবিবরণী থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

জরিপে মহানগরের সচল ৯৮টি বাস রুটে ১০ হাজারের বেশি যাত্রীর ওঠানামা এবং ৩৫ হাজারের বেশি যাত্রীর উৎস ও গন্তব্যের তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

পাশাপাশি ৫২টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে টানা ৭২ ঘণ্টা যানবাহন গণনা করা হয়। ড্রোনের মাধ্যমে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার বাস নেটওয়ার্কের প্রকৌশলের চিত্রও ধারণ করা হয়েছে বলে জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে।

জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে বিদ্যমান ৯৮টি সচল বাস রুট পুনর্বিন্যাস করে ৩২টি মূল রুট করার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত রুটের প্রায় ৭০ শতাংশ বিদ্যমান রুটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

জরিপের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক (সচিব) মোহাম্মদ মসিউর রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘জরিপে ৪ হাজার কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ২৮০ কিলোমিটারকে বাস চলাচলের উপযোগী বলা হয়েছে। তবে এই হিসাব করা হয়েছে লেনভিত্তিক সড়ক ধরে। যেসব সড়কে বাস চলাচলের মতো পর্যাপ্ত লেন নেই, সেগুলোকে বাসের উপযোগী হিসেবে ধরা হয়নি। এসব সড়কে রিকশা, অটোরিকশাসহ ছোট যানবাহন চলাচল করবে। সব মিলিয়ে বাস রুট রেশনালাইজেশন বাস্তবায়ন করে কোম্পানিভিত্তিক বাস না চলালে বাসব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আসবে না।’

বাস রুট রেশনালাইজেশন সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরে কোম্পানির মাধ্যমে বাস পরিচালনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সরকার কোনো ব্যক্তি বা একক বাসমালিকের সঙ্গে নয়, কোম্পানির সঙ্গে সরাসরি জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করবে। প্রতিটি রুটে একটি কোম্পানির অধীনে বাস চালিয়ে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, দুর্ঘটনা ও দূষণ কমানো এবং নির্ধারিত স্থানে যাত্রী ওঠানামা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে কয়েকটি রুটে ১২ মিটার দীর্ঘ ৫২ আসনের আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব বাস চালুর প্রস্তাব রয়েছে।

ফিটনেস, শৃঙ্খলা ও আইন ভঙ্গের দায় কোম্পানিকে নিতে হবে। অনিয়ম হলে মালিককে কোম্পানি থেকে বহিষ্কার ও বাসের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্ধারিত সময়ে সেবা ও চালকদের আচরণে পরিবর্তন না এলে রুট পারমিট বাতিল করে নতুন কোম্পানি বা বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

আগামী দুই মাসের মধ্যে মহানগরের সব বাসের মেরামত ও রং করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কাজ শেষ না হলে বাস চলাচল বন্ধ থাকবে। অবৈধ, জীর্ণ, রুট লঙ্ঘনকারী ও পারমিটবিহীন বাস বন্ধে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এবং মালিক সমিতি রুট ও এলাকাভিত্তিক টিম গঠন করবে। কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা নিয়ে ১৫ দিনের মধ্যে অংশীজনদের সঙ্গে সভা হবে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী মো. জোবায়ের মাসুদ বলেন, ‘গত দুই বছরে অটোরিকশার সংখ্যা বেড়ে ঢাকার সড়কের বড় একটি অংশ দখল হয়েছে। এর সঙ্গে ভ্যান, ফুটপাত এবং দোকান-মার্কেটের মালামাল ওঠানামার কারণে সড়কের জায়গা সংকুচিত হয়েছে। কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনায় আমরা আগ্রহী। এটি বাস্তবায়ন হলে পরিবহন খাতে নানা ধরনের অতিরিক্ত খরচ কমবে এবং মালিকদের আয়ও সুরক্ষিত হবে।’

অবশ্য ২৮০ কিলোমিটার সড়ককে বাস চলাচলের উপযোগী হিসেবে দেখানো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘২৮০ কিলোমিটার সড়ককে বাস চলাচলের উপযোগী বলা হলেও এই জরিপের যথার্থতা নিয়ে আমার প্রশ্ন আছে। কিছু সড়ক যে আগের তুলনায় সংকুচিত হয়েছে, তা স্পষ্ট। হকার, রাইড শেয়ারিংয়ের গাড়ি, মোটরসাইকেল, ইজিবাইক এবং মার্কেট-দোকানের দখলে সড়কের কার্যকর প্রস্থ কমেছে। এসব দখল ও প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে বাস চলাচলের উপযোগী সড়ক বাড়াতে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া দরকার।’

এসব সমস্যার সমাধানের বিষয়ে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘পুরো নগর অনেকটা অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। ফলে সব সড়ককে বাস চলাচলের উপযোগী করা সম্ভব নয়। শুধু দখল উচ্ছেদ করে সমস্যার সমাধানও হবে না। দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে সড়কব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি পথচারীসহ বিভিন্ন ধরনের যাতায়াত ব্যবস্থাকেও পরিকল্পনায় গুরুত্ব দিতে হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
১
২
৩
৪
৫
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত