Ajker Patrika

হাওরে কৃষকের নিরানন্দ ঈদ

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধিনেত্রকোনা প্রতিনিধিকিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
হাওরে কৃষকের নিরানন্দ ঈদ
গোখাদ্যের সংকট মোকাবিলায় পচা খড় শুকিয়ে বাড়ি নিচ্ছেন কৃষক। গতকাল সুনামগঞ্জের হালি হাওরপারের কালীপুর এলাকায়। ছবি: আজকের পত্রিকা

অতিবৃষ্টি আর ঢলের পানিতে সৃষ্ট অকালবন্যায় হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ঈদুল আজহার আগমনে কৃষকের ঘরে ছিল না উৎসবের আমেজ। অনেক কৃষক এবার কোরবানি দিতে পারেননি। পরিবারের সদস্যদের জন্য কিনতে পারেননি নতুন কাপড়ও। এদিকে খড় না থাকায় গৃহপালিত প্রাণী কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন অনেকে।

নেত্রকোনা: নেত্রকোনা জেলার খালিয়াজুরী উপজেলা সদরের কুঁড়িহাটি গ্রামের আরিফুজ্জামান মল্লিক বলেন, ‘আট একর জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করেছিলাম। কিন্তু অতিবৃষ্টির কারণে ফসল তলিয়ে যায়। কিছু জমির ধান উচ্চ দামে শ্রমিক দিয়ে কাটানো হলেও ঘরে তুলতে পারিনি। বৃষ্টির কারণে কাটা ফসল না শুকাতে পেরে নষ্ট হয়ে গেছে।’

একই উপজেলার গছিখাই গ্রামের কৃষক হালিম মিয়ার এবার ১৬ একর জমির ধান বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘এই একটা ফসলের ওপর আমাদের সারা বছরের খরচ, আচার-অনুষ্ঠান সবকিছু নির্ভর করে। ফসল শেষ মানে আমাদের সবকিছু শেষ।’

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নেত্রকোনার ১০ উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ৭৮ হাজার কৃষক। জেলায় সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে ৭৫ হাজার ৯৪৯ দশমিক ৪৩ টন বোরো ধান, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৭২ কোটি ১৫ লাখ টাকা। তবে কৃষকের দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক গুণ বেশি।

সুনামগঞ্জ: সুনামগঞ্জের হাওরে থইথই অবস্থা বিরাজ করলেও এখনো কেটে রাখা ধানের স্তূপ পানি থেকে টেনে তোলার চেষ্টা করছেন অনেকে। নষ্ট ধান রোদে শুকাতে ব্যস্ত রয়েছেন কেউ কেউ। ফলনের বড় অংশ হারানোর পাশাপাশি খড় না থাকায় গৃহপালিত প্রাণী পানির দরে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে।

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় বোরোচাষি প্রায় ৪ লাখ। এদের অধিকাংশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সরকারি সহায়তার তালিকায় নাম ওঠেনি প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের। অনিয়ম-স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি হয়নি এমন লোকজনের নাম তালিকাভুক্ত করার অভিযোগ করেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।

তবে এসব অভিযোগ স্বীকার করে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মতিউর রহমান খান বলেন, তালিকাভুক্ত ১ লাখ ২৯ হাজার ৫৫৯ জনের মধ্যে ৬৪ হাজার ৩৮৪ জনের তালিকা অনুমোদন হয়েছে। প্রতিজনকে ৩ হাজার টাকা ও ১৫ কেজি করে চাল তিন মাস দেওয়া হবে।

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার সোনামড়ল হাওরের কৃষক চন্দন তালুকদার বলেন, ‘সব ধান কাটতে না পারায় প্রয়োজনীয় খড়ও পাওয়া যায়নি। গোখাদ্যের অভাবে ছোট-বড় ১২টি গরুর মধ্যে ৪টা বিক্রি করে দিয়েছি।’

কিশোরগঞ্জ

কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার জয়কা ইউনিয়নের রামনগর গ্রামের বাসিন্দা আবু বকর প্রতিবছরই বড় পরিসরে কৃষিকাজ করেন। তিনি বলেন, ‘ঈদের আগে কিছু ধান বেচে মাদ্রাসাপড়ুয়া ছোট ছেলেকে একটি পাঞ্জাবি আর নিজের জন্য লুঙ্গি কিনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভেজা ধান কেউ কেনেনি। ফলে ঈদের কেনাকাটা হয়নি। কোরবানি তো বহুদূরে।’

একই গ্রামের আরেক কৃষক হুমায়ুন মিয়া বলেন, শুধু মানুষ নয়, এবার গবাদিপশুও খাবারের জন্য কষ্ট করবে। খড় সংগ্রহ করতে পারেননি বেশির ভাগ কৃষক। ফলে অনেকে গরু, ছাগল, মহিষ বেচে দিচ্ছেন।

কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ২৬ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত মাত্র ৯ দিনের বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হাওরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যার মধ্যে ক্ষয়ক্ষতির তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে কিশোরগঞ্জ।

কিশোরগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. বদরুদ্দোজা জানান, প্রাথমিকভাবে ৫২ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা করা হয়েছে। সরকার টানা তিন মাস তাঁদের সহায়তা দেবে। বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা মাসে সাড়ে ৭ হাজার টাকা, মাঝারি ক্ষতিগ্রস্তরা ৫ হাজার এবং কম ক্ষতিগ্রস্তরা আড়াই হাজার টাকা করে পাবেন। পাশাপাশি সবাইকে প্রতি মাসে ২০ কেজি করে খাদ্য সহায়তাও দেওয়া হবে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত