Ajker Patrika

পাকিস্তান-সৌদি-তুরস্কের সামরিক জোটে ‘যোগ দিতে পারে ইসরায়েলও’, আছে শর্ত

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ৩১ মে ২০২৬, ০৯: ৩৮
পাকিস্তান-সৌদি-তুরস্কের সামরিক জোটে ‘যোগ দিতে পারে ইসরায়েলও’, আছে শর্ত
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। ছবি: এএফপি

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান জানিয়েছে, পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিসরের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত যে জোটের আলোচনা চলছে, ভবিষ্যতে তাতে শর্ত সাপেক্ষে যোগ দিতে পারে ইসরায়েলও। শর্তটি হলো, ১৯৬৭ সালের সীমান্ত অনুসারে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন।

জাপানি সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা জানান তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ২৫ মে আঙ্কারায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে ফিদান ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রেক্ষাপটে মধ্যম শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘তুরস্ক, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, সৌদি আরব, জার্মানি, ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্যের মতো মধ্যম শক্তির দেশগুলোর আরও ঘনিষ্ঠভাবে সহযোগিতা করা প্রয়োজন।’

চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার পর জাপান তুরস্কের তৃতীয় বৃহত্তম এশীয় বাণিজ্যিক অংশীদার। গত বছর দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৫ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল জাপানের রপ্তানি। দুই দেশ এক দশকের বেশি সময় ধরে একটি অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি এবং একটি সামাজিক নিরাপত্তা চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছে। সামাজিক নিরাপত্তা চুক্তি না থাকায় জাপানি প্রবাসীদের উভয় দেশেই প্রিমিয়াম পরিশোধ করতে হচ্ছে।

বর্তমান দায়িত্ব নেওয়ার আগে এক দশকের বেশি সময় তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এমআইটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ফিদান। ২০২৩ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং আঙ্কারার পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান স্থপতি হিসেবে বিবেচিত হন। ইউক্রেন, গাজা ও ইরানকে ঘিরে চলমান বিভিন্ন সংঘাতে আঞ্চলিক কূটনীতির সামনের সারিতেও রয়েছেন তিনি।

তুরস্ক বর্তমানে কাতারসহ অন্যান্য আঞ্চলিক দেশের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার পাকিস্তানি প্রচেষ্টাকে সমর্থন করছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা সম্পর্কে ফিদান বলেন, ‘উভয় পক্ষই ইতিবাচক উপসংহারে পৌঁছাতে চায়। একটি চুক্তি এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি কাছাকাছি।’

ফিদান আরও বলেন, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। তেল-বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে বিঘ্নিত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো একটি পরিকল্পনার রূপরেখা তৈরি করেছে। তাতে বলা হয়েছে, প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সমঝোতা হলে এরপর তারা ‘পারমাণবিক আলোচনা শুরু করবে।’

ফিদানের মতে, হরমুজে কার্যত অচলাবস্থা ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ের ওপরই অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।’ একই সঙ্গে ‘জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্যনিরাপত্তা এবং মূল্যবৃদ্ধিসহ আন্তর্জাতিক প্রভাবও বিশাল।’ তিনি বলেন, ‘এটি এমন একটি পরিস্থিতিতে পরিণত হয়েছে, যা পারমাণবিক ইস্যুর চেয়েও এখন বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে।’

ফিদান মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যদি বৈরিতা অবসানের বিষয়ে একমত হতে পারে, তাহলে গাজা উপত্যকার জন্য একটি শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা দ্রুত এগোতে পারবে। মে মাসের শেষ দিকে মধ্যপ্রাচ্যের নেতাদের সঙ্গে এক ফোনালাপে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তুরস্ককে আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ইসরায়েল ও কয়েকটি আরব দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য এই চুক্তিগুলো করা হয়েছিল।

এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ফিদান ইসরায়েলের সঙ্গে আঙ্কারার দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘১৯৪৯ সাল থেকেই তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।’ গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর আগে ‘আমরা ১০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উপভোগ করছিলাম’ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

ফিদান বলেন, ‘আমরা যখন বাণিজ্য বন্ধ করেছি, তখন খুব স্পষ্টভাবেই বলেছি যে ইসরায়েলকে ফিলিস্তিনিদের হত্যা বন্ধ করতে হবে এবং গাজার মানুষের খাদ্য, আশ্রয়, ওষুধ ও পানির মতো মৌলিক প্রয়োজনীয়তার প্রবেশাধিকার বাধাগ্রস্ত করা বন্ধ করতে হবে। এসব শর্ত পূরণ হলে আমরা আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারব, কোনো সমস্যা নেই। আমরা দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান চাই।’

তুরস্ককে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য কৌশলগত হুমকি হিসেবে তুলে ধরে ইসরায়েলি রাজনীতিকদের বক্তব্যও খারিজ করে দেন ফিদান। তিনি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সব সময় একটি শত্রুর প্রয়োজন হয়, যাতে তারা নিজেদের আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এগিয়ে নিতে পারে। কিন্তু সবাই জানে, ইসরায়েল শুধু নিরাপত্তার পেছনে নয়, আরও ভূমি দখলের লক্ষ্যেই এগোচ্ছে।’

তিনি গাজা, পশ্চিম তীর, সিরিয়া ও লেবাননে ইসরায়েলের বর্তমান দখলদারত্বের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত ‘শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক ব্যবস্থাকেও আরও অস্থিতিশীল করে তোলার হাত থেকে ইসরায়েলকে বিরত রাখা।’ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি সহযোগিতা-ভিত্তিক ‘আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম’-এর ধারণাও তুলে ধরেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘অঞ্চলের সব দেশেরই একে অপরের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া উচিত।’ সাম্প্রতিক ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশগুলোর সামনে ‘বাস্তবিক অর্থে সহযোগিতা শুরু করার একটি সোনালি সুযোগ’ এসেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তাঁর মতে, এই কাঠামোয় পাকিস্তান, তুরস্ক, সৌদি আরব, মিসর, পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। তাঁর মতে, ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে হয়তো ইরানেরও এর অংশ হওয়া উচিত।’ তিনি আরও বলেন, ‘১৯৬৭ সালের সীমান্তের ভিত্তিতে একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিলে ভবিষ্যতে ইসরায়েলও এই প্ল্যাটফর্মে যোগ দিতে পারে।’ ফিদানের ভাষায়, ‘যদি সেই সমস্যার সমাধান হয়, তাহলে আমার মনে হয় আঞ্চলিক দেশগুলোও ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।’

জুলাই মাসে আঙ্কারায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করবে তুরস্ক। ফিদান বলেন, সব মিত্রদেশ সম্মত হলে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মতো ন্যাটোর ইন্দো-প্যাসিফিক অংশীদার দেশগুলোর নেতা ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের আমন্ত্রণ জানাতে চায় তুরস্ক। তিনি জানান, তুর্কি সরকার ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে মিলে সম্মেলনের কর্মসূচি চূড়ান্ত করার কাজ করছে। তার ইঙ্গিত, আমন্ত্রণপত্র পাঠানোর সম্ভাবনা বেশ জোরালো।

ন্যাটো সম্পর্কে সংশয়ী হিসেবে পরিচিত ট্রাম্প সম্মেলনে যোগ দেবেন কি না, এমন প্রশ্নে আশাবাদী সুরে ফিদান বলেন, গত এক মাসে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান একাধিকবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের কোনো আলাপেই ট্রাম্প অংশগ্রহণ না করার কথা বলেননি। ফিদান বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমাদের সব প্রস্তুতিই এমনভাবে নেওয়া হচ্ছে, যাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে স্বাগত জানানো যায়।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত