Ajker Patrika

পরিবার ভেবেছিল মৃত, ২৫ বছর পর স্বজনদের কাছে ফিরলেন ফরিদ

পাকিস্তান-ইরান ঘুরে তুরস্কে ১৪ বছর

বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা
পরিবার ভেবেছিল মৃত, ২৫ বছর পর স্বজনদের কাছে ফিরলেন ফরিদ
ঢাকার আশকোনায় ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে ফরিদকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ছবি: আজকের পত্রিকা

মাত্র ১০ বছর বয়সে বাবার হাত ধরে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন মোহাম্মদ ফরিদ। এরপর মানবপাচারের শিকার হয়ে এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরতে ঘুরতে কেটে গেছে ২৫ বছর। দীর্ঘদিন কোনো যোগাযোগ না থাকায় পরিবারের সদস্যরা ধরে নিয়েছিলেন, ফরিদ হয়তো আর বেঁচে নেই। অবশেষে ২৫ বছর পর দেশে ফিরে পরিবারের কাছে ঠাঁই হয়েছে তাঁর।

বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) ঢাকার আশকোনায় ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষে ফরিদকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এখন কক্সবাজারের উখিয়ায় থাকা বৃদ্ধ মা নূরজাহান বেগমের সঙ্গে দেখা করার অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।

ফরিদের ছোট ভাই সৈয়দ আলম বলেন, ‘আমরা ধরে নিয়েছিলাম, ফরিদ আর বেঁচে নেই। কিন্তু এত বছর পর তাঁকে ফিরে পেয়ে আমরা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না। কক্সবাজারে আমাদের বৃদ্ধ মা বড় ছেলের অপেক্ষায় আছেন। আমরা গরিব মানুষ। জানি না কী হবে। তবে আমরা আমাদের ভাইকে নিয়ে থাকব।’

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম জানায়, প্রায় ২৫ বছর আগে বাবার সঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যান ফরিদ। পরে তাঁরা পাকিস্তানে পৌঁছান। সেখানে জীবিকার সন্ধানে কাজ করার সময় চলন্ত ট্রেন থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে চিকিৎসকদের পরামর্শে তাঁর দুই পা কেটে ফেলতে হয়।

শারীরিক প্রতিবন্ধকতার পর এক মানবপাচারকারী তাঁকে ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখায়। এরপর পাকিস্তান থেকে ইরান হয়ে তুরস্কে পৌঁছান ফরিদ। তবে ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি।

তুরস্কের সমুদ্রতীরে পানি বিক্রি করে প্রায় ১৪ বছর কাটান তিনি। সেখানে অনিয়মিত অভিবাসী হিসেবে বসবাস করায় তুরস্কের পুলিশ তাঁকে তিনবার আটক করে ক্যাম্পে রাখে। সর্বশেষ গ্রেপ্তারের পর তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।

গত ১৮ আগস্ট ভোর সোয়া ৫টার দিকে টিকে-৭১২ ফ্লাইটে তুরস্ক থেকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান ফরিদ। দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার কারণে তিনি স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছিলেন না। নিজের ও বাবা-মায়ের নাম এবং ‘উখিয়া, কক্সবাজার’—এটুকু ছাড়া তেমন কোনো তথ্য দিতে পারছিলেন না তিনি।

বিমানবন্দরের এভসেক সিকিউরিটি ফরিদকে পাওয়ার পর প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের মাধ্যমে ব্র্যাকের আশকোনা মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে হস্তান্তর করে। এরপর ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কর্মীরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীদের সহায়তায় ১২ ঘণ্টার মধ্যে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার মরিচ্যা পালং ইউনিয়নের নাছির পাড়ায় তাঁর পরিবারের সন্ধান পান।

পরিবারের সন্ধান পাওয়ার পর বুধবার বিকেলে ভিডিও কলে ফরিদের সঙ্গে তাঁর ছোট ভাই সৈয়দ আলমের কথা বলিয়ে দেওয়া হয়। দীর্ঘ ২৫ বছর পর ভাইয়ের কণ্ঠ শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন পরিবারের সদস্যরা।

কথোপকথনের একপর্যায়ে সৈয়দ আলম ফরিদের হাতে ছয়টি আঙুল থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। ছোটবেলার এই শারীরিক বৈশিষ্ট্যই ফরিদের পরিচয় নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হয়ে ওঠে।

পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফরিদের বাবা আয়ুব আলী এখনো পাকিস্তানে রয়েছেন।

ফরিদকে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের সময় ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডের পরিচালক ও রেইজ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক সরকারের যুগ্ম সচিব এ টি এম মাহবুবুল করিম, ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল ইসলাম হাসান, শাহজালাল বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের উপপরিচালক শরিফুল ইসলাম, সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা এ কে এম রাসেলসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এ টি এম মাহবুবুল করিম বলেন, ‘মোহাম্মদ ফরিদের ঘটনা যে কাউকে স্পর্শ করবে। আমরা তাঁর পাশে থাকব।’

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, গত আট বছরে বিমানবন্দরে তাঁরা ৪১ হাজার প্রবাসীকে সহায়তা দিয়েছেন। এর মধ্যে ফরিদের মতো ১৬৪ জনকে পরিবারের কাছে নিরাপদে হস্তান্তর করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘১৭ কোটি মানুষের দেশে কাউকে খুঁজে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া কঠিন কাজ। তবে সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষ, প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক ও ব্র্যাকের সমন্বিত উদ্যোগে এমন কাজ সম্ভব হচ্ছে। শুধু পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া নয়, ফরিদ যাতে দীর্ঘ মেয়াদে ঘুরে দাঁড়াতে পারেন, সে জন্যও সহায়তা করার পরিকল্পনা রয়েছে।’

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের উপপরিচালক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘প্রবাসীরা বিভিন্ন সময়ে নানা সমস্যার মুখোমুখি হন। ফরিদের মতো জটিল ও মানবিক ঘটনায় ব্র্যাক পাশে থাকায় একটি মানবিক পুনর্মিলন সম্ভব হয়েছে।’

সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা এ কে এম রাসেল বলেন, ‘আমি দুই বছর ধরে বিমানবন্দরে কাজ করছি। আজকের এই পুনর্মিলন দেখে এবং এই প্রক্রিয়ার অংশীদার হতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত