Ajker Patrika

সাড়ে ৪ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলা: পরোয়ানা থানায় পৌঁছাতে সময় লাগল ৬ মাস

সোহেল মারমা, চট্টগ্রাম 
সাড়ে ৪ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলা: পরোয়ানা থানায় পৌঁছাতে সময় লাগল ৬ মাস
এসএ গ্রুপের এমডি শাহাবুদ্দিন আলম। ফাইল ছবি

চট্টগ্রামে চেক জালিয়াতি ও প্রতারণার মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে করা মামলায় এসএ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শাহাবুদ্দিন আলমের স্ত্রীসহ পরিবারের পাঁচ সদস্যের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দীর্ঘ ছয় মাস পর থানায় এসে পৌঁছেছে।

জানা গেছে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রাম আদালতে চেক জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগ এনে শাহাবুদ্দিন আলমসহ তাঁর পরিবারের পাঁচ সদস্যকে বিবাদী করে চট্টগ্রাম আদালতে মামলা করেন মো. হোসাইন নামের একজন ব্যবসায়ী। তিনি চট্টগ্রামের পাইকারী বাজার চাক্তাই এলাকার মেসার্স হোসাইন অ্যান্ড ট্রেডার্সের মালিক।

মামলায় শাহাবুদ্দিনের পাশাপাশি অন্য বিবাদীরা হলেন শাহাবুদ্দিনের স্ত্রী ইয়াছমিন আলম, দুই ছেলে সাজ্জাদ আরেফিন আলম ও শাহরিয়ার আরেফিন আলম এবং শাহাবুদ্দিনের ভাই মনজুর আলম।

মামলার অভিযোগে, এসএ গ্রুপের এমডি শাহাবুদ্দিন আলমের সঙ্গে তেলের ডিও ও রিফাইন্ড চিনি-সংক্রান্ত ব্যবসায় অর্থ-সংক্রান্ত লেনদেনের জেরে বাদী ৪ কোটি ২৬ লাখ ৮১ হাজার টাকা পাওনা রয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়। আসামিদের বিরুদ্ধে ২০১২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে টাকাগুলো আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির এমডিসহ অন্যান্য কর্ণধার পাওনা টাকা পরিশোধে নিশ্চয়তা দিয়ে বাদীকে পাওনার সমপরিমাণ টাকার একটি চেক দিলে, তা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে প্রত্যাখ্যাত হয়। পরে পাওনা টাকা পরিশোধের জন্য আশ্বস্ত করে এলেও টাকাগুলো আর পরিশোধ করেনি বলে অভিযোগ করা হয়।

২০২৫ সালের ১৩ জুলাই চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের একটি আদালত এই মামলায় পরে শাহাবুদ্দিন ছাড়া অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন।

মামলার বাদী মো. হোসাইন বলেন, ‘আদালতের আদেশের পর সাধারণত দ্রুত সময়ে ডাকযোগে বা বিশেষ বাহকের মাধ্যমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাগুলো সংশ্লিষ্ট থানায় পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু আদালতের কিছু অসাধু কর্মচারীর যোগসাজশে আসামিপক্ষ এই পরোয়ানাগুলো এত দিন ধামাচাপা দিয়ে রেখেছিল। পরে বিভিন্ন মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করলে ছয় মাস পর চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি শাহাবুদ্দিনের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাগুলো বন্দর থানায় পৌঁছায়। একই মামলার ধারাবাহিকতায় পরে শাহাবুদ্দিনের মা লায়লা বেগমের বিরুদ্ধেও ২২ জানুয়ারি চট্টগ্রামের চতুর্থ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। সেই পরোয়ানা ২৫ জানুয়ারি খুলশী থানায় পৌঁছায়।’

হোসাইন বলেন, ‘আসামি শাহাবুদ্দিন গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আদেশের আগেই জামিন নিয়ে নেন।

ওয়ারেন্টের নথি থেকে জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট আদালতের আদেশের পর বিচারক ও বেঞ্চ সহকারী তারিকুল ইসলামের স্বাক্ষরসহ আসামিদের বিরুদ্ধে পরোয়ানাপত্র ইস্যু হলেও সেখান থেকে তা ডেসপাস শাখায় পৌঁছাতে ১৭ দিন লেগে যায়। ৩১ জুলাই সিএমএম আদালতের ডেসপাস শাখা পরোয়ানাগুলোতে স্বাক্ষর করে। পরে সেখান থেকে তা বিবাদীদের বর্ণিত ঠিকানা বন্দর থানা-পুলিশের কাছে পৌঁছায় প্রায় সাড়ে পাঁচ মাসের মাথায়।’

জানতে চাইলে বন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুর রহিম শুক্রবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ওয়ারেন্টগুলো থানায় পৌঁছেছে। ওয়ারেন্টগুলো থানায় পৌঁছার পর আসামিদের ওয়ারেন্ট তামিল করতে অভিযান চলছে।’

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম চতুর্থ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বেঞ্চ সহকারী মোহাম্মদ বখতিয়ার উদ্দিন বলেন, ‘আদালত আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আদেশ জারির পর আমাদের এখান থেকে সেদিনই নথিগুলো সংশ্লিষ্ট শাখায় ফরওয়ার্ড করে দেওয়া হয়। পরে ডেসপাস শাখা, জিআরও শাখা ও অনলাইনে কেএসপি (অনলাইন সিস্টেমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার নথি এন্ট্রি) করতে গিয়ে হয়তো সেখানে কিছু সময় লাগে। তারপর ওয়ারেন্টগুলো থানায় পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। এতে কোনো কোনো সময় থানায় ওয়ারেন্ট পৌঁছাতে দেরি হতে পারে।’

ফৌজদারি কার্যবিধির বিধান এবং আদালত পরিচালন বিধি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আদালতের আদেশ বা পরোয়ানা জারির পর সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী বা সংশ্লিষ্ট কর্মচারী সেটি স্বাক্ষর করানোর জন্য বিচারকের কাছে পাঠান। বিচারকের স্বাক্ষরের পর সেটি আদালতের ডেসপাস বা জারিকারক শাখায় যায়। সেখান থেকে পুলিশ সদর দপ্তর বা সরাসরি থানায় পাঠানো হয়। আইনজীবীরা বলছেন, আদালতের যেকোনো আদেশ বা পরোয়ানা দ্রুততম সময়ে কার্যকর করতে হবে। দীর্ঘসূত্রতা হলে সংশ্লিষ্ট আদালতের কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।

জানা গেছে, থানায় ওয়ারেন্ট পৌঁছার পর ১৭ জানুয়ারি আসামিদের গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে বর্ণিত ঠিকানায় অভিযান চালায় বন্দর ও খুলশী থানা-পুলিশ। তবে ওই সময় শাহাবুদ্দিনের পরিবারের কাউকে পায়নি পুলিশ। এর আগে বাদীপক্ষ ১৪ জানুয়ারি শাহাবুদ্দিনের মা, স্ত্রী, সন্তান ও ভাই দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে পারেন এই মর্মে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ইমিগ্রেশনে পাঠানোর জন্য পিটিশন দিলে কোর্ট সেটি নথিজাত করেন।

এসএ গ্রুপের বিরুদ্ধে দুদক, খাদ্য মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাৎ, চেক প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে বলেও জানা গেছে। এর আগে ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে ২৭৮ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ আদায়ের দুই মামলায় চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালত এসএ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ব্যবসায়ী শাহাবুদ্দিন আলম ও তাঁর স্ত্রী ইয়াসমিন আলমকে পাঁচ মাস করে দেওয়ানি আটকাদেশ দিয়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত