Ajker Patrika

গাইবান্ধায় তিস্তা-যমুনা-ব্রহ্মপুত্রের তাণ্ডবে বিলীন ৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঝুঁকিতে আরও ৬টি

আনোয়ার হোসেন শামীম, গাইবান্ধা
গাইবান্ধায় তিস্তা-যমুনা-ব্রহ্মপুত্রের তাণ্ডবে বিলীন ৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঝুঁকিতে আরও ৬টি
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীগর্ভে বিলীন। ছবি: আজকের পত্রিকা

গাইবান্ধায় তিস্তা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর ভয়াবহ ভাঙনে একের পর এক বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ইতিমধ্যে নদীগর্ভে চলে গেছে আটটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। আরও কয়েকটি বিদ্যালয় রয়েছে ভাঙনের ঝুঁকিতে। ভবন হারিয়ে কোথাও খোলা আকাশের নিচে, আবার কোথাও ছাপড়ার নিচে চলছে শিশুদের পাঠদান। এতে ব্যাহত হচ্ছে পড়াশোনা, কমছে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ভাঙন চললেও স্থায়ী প্রতিরোধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

এ ছাড়া ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে ছয়টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ভবন না থাকায় খোলা আকাশের নিচে চলছে আটটি বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম। কোথাও আবার একটি ছাপড়ার নিচে দুই-চারজন শিক্ষার্থী নিয়ে চলছে পাঠদান। এতে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও কমেছে। ফলে শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সরেজমিনে জেলার চরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি বিদ্যালয় ঘুরে দেখা যায়, কিছুদিন আগেও যেখানে ছিল ভবন, শ্রেণিকক্ষ, বেঞ্চ, টেবিল ও শিক্ষার্থীদের কোলাহল। এখন সেখানে শুধু পানি আর পানি। বাধ্য হয়ে খোলা আকাশের নিচে পাঠদান করছেন শিক্ষকেরা। শিক্ষার পরিবেশ না থাকায় উপস্থিতির হারও কমেছে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে উপস্থিতি কিছুটা বেশি। ভোরের পাখিসহ আশপাশের এলাকায় দিনের পর দিন তীব্র ভাঙনে নদী গিলে খাচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি আর মানুষের বেঁচে থাকার স্বপ্ন। ভাঙন থেকে রক্ষা পায়নি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও। মাদ্রাসা-মসজিদও নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। কেউ আশ্রয় নিয়েছেন আত্মীয়ের বাড়ি, কেউ সড়কের পাশে। আবার কেউ নদীর কূলেই অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছেন।

স্থানীয়রা বলছেন, এ বছর কয়েক দফা ভাঙনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট, বসতভিটাসহ অসংখ্য আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

ফুলছড়ি উপজেলার উত্তর খাটিয়ামারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ঈশা মনি বলে, ‘গত বছরও আমরা বিদ্যালয়ে সুন্দরভাবে পড়াশোনা করেছি। তখন পড়াশোনায় আমাদের ভালো মনোযোগ ছিল। কিন্তু এ বছর হঠাৎ নদীভাঙনে বিদ্যালয়টি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এখন আমাদের পড়াশোনা করতে অনেক অসুবিধা হচ্ছে।’

আরেক শিক্ষার্থী নয়ন মিয়া বলে, ‘স্কুলটি নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ায় পড়াশোনায় আর মনোযোগ দিতে পারছি না। চোখের সামনে এভাবে সবকিছু নদীতে বিলীন হয়ে গেলে আমরা যাব কোথায়?’

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের লাল চামার গ্রামের একটি জনপদের নাম ভোরের পাখি। একসময় চর এলাকার এই জনপদে শত শত পরিবার বাস করত। এ বছর কয়েক দফা ভাঙনে হারিয়ে যেতে বসেছে এই জনপদ। তিস্তার ভাঙনে এরই মধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে দশটিরও বেশি বিদ্যালয় ও মাদ্রাসাসহ তিন শতাধিক পরিবারের বসতভিটা। হারিয়েছে শত শত বিঘা আবাদি জমি। সর্বস্ব হারিয়ে নদীর পাড়ে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন ভাঙনকবলিত এসব মানুষ।

গেল দুই সপ্তাহে তিন শতাধিক ঘরবাড়ির পাশাপাশি চর এলাকার শিশুদের একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও চলে গেছে নদীগর্ভে। ভোরের পাখি এলাকাই এখন অস্তিত্ব সংকটে।

ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুর রহমান বলেন, বিদ্যালয়টি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় অন্য জায়গায় খোলা আকাশের নিচে পাঠদান চলছে।

স্থানীয়দের দাবি, নদীভাঙনে কার্যকর কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পুরো গ্রামই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।

ভোরের পাখি এলাকার সাইফুল মিয়া বলেন, নদী ভাঙতে ভাঙতে এলাকার কোনো চিহ্ন নেই। দ্রুত বাঁধ নির্মাণ না হলে মানচিত্র থেকে ভোরের পাখি এলাকার আশপাশও বিলীন হয়ে যাবে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লক্ষ্মণ কুমার দাশ বলেন, ‘চরে কখন কোন এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়, জানার উপায় নেই। ফলে স্থায়ীভাবে ভবন নির্মাণও সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীদের পাঠদান যেন বিঘ্ন না ঘটে, প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের এ বিষয়ে নির্দেশনা হয়েছে।’

গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘নদীর ভয়াবহ ভাঙন ঠেকাতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। যেসব এলাকা নতুন করে ভাঙছে, সেসব এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলা হবে।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত