Ajker Patrika

মার্কিন হামলায় ৩ ভারতীয় নাবিকের মৃত্যুর পর ট্রাম্প-মোদি সম্পর্ক নিয়ে যেসব প্রশ্ন উঠছে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
মার্কিন হামলায় ৩ ভারতীয় নাবিকের মৃত্যুর পর ট্রাম্প-মোদি সম্পর্ক নিয়ে যেসব প্রশ্ন উঠছে
ওপরে বাম দিক ট্রাম্প-মোদির একটি ফাইল ছবি, এরপর মাঝে মহামারির সময়ে মাস্ক পরিহিত অবস্থায় মোদি এবং সবশেষে ওমান উপকূলের কাছে বাণিজ্যিক জাহাজ এমটি সেত্তেবেল্লোতে মার্কিন হামলায় নিহত এক ভারতীয় নাবিকের পরিবারের সদস্য। ছবি: পিটিআই

গত সপ্তাহে ওমান উপসাগরে কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তিন ভারতীয় নাবিক নিহত হয়েছেন। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এটিই প্রথম কোনো ঘটনা, যেখানে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর সরাসরি হামলায় ভারতীয় নাগরিকেরা নিহত হয়েছেন।

আগামী ১৭ জুন ফ্রান্সে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসার কথা রয়েছে। তার ঠিক আগমুহূর্তে ঘটে যাওয়া এই হত্যাকাণ্ড এবং এর বিপরীতে নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়া ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও দ্বিপক্ষীয় কূটনীতিতে বেশ কিছু গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

প্রথমেই প্রশ্ন উঠেছে, যে ট্রাম্পের সঙ্গে মোদির এত ভালো সম্পর্ক (ট্রাম্প-মোদি ব্রোমান্স) তাঁর দেশের সামরিক বাহিনী কীভাবে ভারতীয় জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করে। তবে কী, মোদি সরকারকে ট্রাম্প প্রশাসন উপেক্ষা করছে?

এই ঘটনার পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মার্কিন দূতাবাসের অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান (শার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স) জেসন মিক্‌সকে দুইবার তলব করে বেসামরিক জাহাজে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের প্রতিবাদ জানায়। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর গত ১২ জুন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে ফোনে কথা বলেও প্রতিবাদ জানান। তবে জয়শঙ্করের প্রতিবাদের জবাবে রুবিও মার্কিন হামলাকে সম্পূর্ণ বৈধ দাবি করে জানান, আমেরিকার স্বার্থে এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের সুরক্ষায় তাঁরা এই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া জারি রাখবেন। ভারতীয়দের হত্যার বিষয়ে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো দুঃখপ্রকাশ, ক্ষমা প্রার্থনা কিংবা ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা আর ঘটবে না—এমন কোনো আশ্বাস দেওয়া হয়নি।

এই পুরো পরিস্থিতি ওয়াশিংটনের আধিপত্যবাদী এবং ভারতের উদ্বেগকে অগ্রাহ্য করার মনোভাবকেই স্পষ্ট করে। অর্থাৎ, বছরের পর বছর ধরে নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের কৌশলগত অংশীদারত্ব বা সমান মর্যাদার যে বুলি আওড়ানো হচ্ছিল, তা মার্কিন একতরফা ব্লকেডের সামনে মুখ থুবড়ে পড়েছে। আর এখানে ভারতীয় নাবিকদের জীবনের নিরাপত্তা কার্যত গুরুত্বহীন।

দ্বিতীয়ত, নাগরিকদের জীবন সুরক্ষায় প্রধানমন্ত্রী মোদি কী সফল?

২০২২ সালে তিনি অপারেশন গঙ্গা পরিচালনা করে ইউক্রেন থেকে ২০ হাজার ভারতীয় নাগরিককে দেশে ফিরিয়ে এনেছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি বিশ্বমঞ্চে নিজেকে একজন শক্তিশালী নেতা হিসেবে জাহির করেন। কিন্তু ওমান ও পারস্য উপসাগরে কর্মরত ৫০০-এর বেশি ভারতীয় নাবিকের জীবন রক্ষায় মোদি সরকার বড় ধরনের ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

মার্কিন হামলায় নিহত চিফ ইঞ্জিনিয়ার পাতনালা সুরেশ, ইঞ্জিন ফিটার শিবানন্দ চৌরাসিয়া এবং ডেক ক্যাডেট আদিত্য শর্মার মৃত্যুর পরও মোদি সরকার সরাসরি বা প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নাম ধরে নিন্দা জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে (প্রকৃতপক্ষে পারেনি)। এটি স্পষ্ট করে, রাষ্ট্র তার নাগরিকদের রক্ষা করবে কি না, তা অপরাধী দেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে।

তৃতীয়ত, পরাশক্তিদের সামনে কী মোদির হিন্দুত্ববাদী সরকার ‘নতজানু’ নীতি গ্রহণ করছে?

একটি বিষয় আপনারা সবাই জানেন, ভারতের বর্তমান হিন্দুত্ববাদী সরকার ছোট কোনো প্রতিবেশী দেশ কূটনৈতিক লাইন অতিক্রম করলে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও তাৎক্ষণিক প্রতিশোধের হুংকার ছাড়ে। কিন্তু যখন কোনো পশ্চিমা পরাশক্তি সরাসরি ভারতীয় নাগরিকদের হত্যা করে, তখন সেই ‘দৃঢ় ও আপসহীন’ নেতৃত্ব অদৃশ্য হয়ে যায় এবং তা ব্যুরোক্রেটিক শব্দচয়নের আড়ালে ঢাকা পড়ে।

এই ধরনের নমনীয়তা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই নয়, চীনের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। ২০২০ সালে গলওয়ানে চীনের হাতে ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার পরও সরকার চীনা কূটনীতিককে তলব করেনি। উল্টো প্রধানমন্ত্রী মোদি দাবি করেছিলেন, কোনো চীনা সেনা ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করেনি। এমনকি সম্প্রতি গলওয়ান সংঘর্ষ নিয়ে বলিউডে সিনেমা তৈরিতেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে যেন চীনকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখানো না হয়। পরাশক্তিদের সামনে এই নীরবতা মোদি সরকারের দেশীয় ‘স্ট্রংম্যান’ ইমেজকে ধূলিসাৎ করে দেয়।

চতুর্থত, আইনি মারপ্যাঁচে কী মোদি সরকার রাজনৈতিক জবাবদিহি এড়ানোর চেষ্টা করছে?

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় শুরু থেকেই প্রচার করছে, আক্রান্ত জাহাজগুলো (এমটি মারিভেক্স, এমটি সেত্তেবেলো এবং এমটি জলবীর) বিদেশি পতাকাবাহী (পালাউ বা গিনি-বিসাউ) ছিল এবং সেগুলো ভারতের মালিকানাধীন নয়। এই আন্তর্জাতিক আইনি মারপ্যাঁচ মূলত দেশীয় রাজনৈতিক জবাবদিহি এড়ানোর একটি কৌশল।

বিশ্বের মার্চেন্ট নেভিতে ভারত দ্বিতীয় বৃহত্তম নাবিক সরবরাহকারী দেশ। সরকারের এই রহস্যজনক নীরবতায় ‘ফরওয়ার্ড সিমেনস ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া’র মতো দেশীয় সামুদ্রিক ইউনিয়নগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এই পদক্ষেপ বিদেশে কর্মরত লাখ লাখ ভারতীয় চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকের জন্য একটি বিপজ্জনক বার্তা দেয় যে—বিদেশি জাহাজে তাঁরা শোষিত বা নিহত হলে নয়াদিল্লি কোনো রাজনৈতিক বা আইনি সুরক্ষা দেবে না। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে সম্পূর্ণ একা আন্তর্জাতিক আদালতে লড়াই করতে হবে।

পঞ্চম ও শেষ প্রশ্ন হলো, মোদি সরকার কী ‘মুক্ত জাহাজ চলাচল’ নীতির কথা ভুলে গেছে?

বছরের পর বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত এবং তাদের ‘কোয়াড’ মিত্ররা (জাপান ও অস্ট্রেলিয়া) ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ‘মুক্ত জাহাজ চলাচল’ বা ‘ন্যাভিগেশনের স্বাধীনতা’ রক্ষার নামে তাদের বিশাল নৌ-উপস্থিতিকে বৈধতা দিয়ে এসেছে। কিন্তু ওমান উপকূলে যুক্তরাষ্ট্রের এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সেই যুক্তিকেই উল্টে দিয়েছে।

বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র মূলত আন্তর্জাতিক রুটে যাতায়াতের স্বাধীনতাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। এভাবে চলতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্র একদিন নিজের ইচ্ছামতো আন্তর্জাতিক জলসীমায় যেকোনো বাণিজ্যিক জাহাজকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু বানাবে। এরপর সামুদ্রিক নিয়ম-শৃঙ্খলকে একটি অনিয়ন্ত্রিত ‘গানবোট ডিপ্লোমেসি’র যুগে ঠেলে দেবে। ভারতসহ অন্যান্য দেশ, যারা জ্বালানি নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ এমন পরিস্থিতিতে ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় এই দেশগুলোর কিছুই করার থাকবে না। ঠিক যেমন, তিন নাবিকের মৃত্যুতে চুপ হয়ে আছে মোদির হিন্দুত্ববাদী সরকার।

দ্য ওয়্যার থেকে অনুবাদ করেছেন জগৎপতি বর্মা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত