Ajker Patrika

যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি ও সুদের চাপ: সংকটের মধ্যেও বিশ্ববাজারে কেন কমছে সোনার দাম

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ১৪ জুন ২০২৬, ১২: ১৫
যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি ও সুদের চাপ: সংকটের মধ্যেও বিশ্ববাজারে কেন কমছে সোনার দাম
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা ও যুদ্ধের সময় সাধারণত সোনার বাজার চাঙা হয়ে ওঠে। নিরাপদ বিনিয়োগের আশ্রয় হিসেবে বিনিয়োগকারীরা তখন ঝুঁকে পড়েন এই মূল্যবান ধাতুর দিকে। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি বাড়লে সোনাকে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এবার দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালিয়ে কয়েক মাসব্যাপী যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে সোনার দাম বাড়ার বদলে চাপের মুখে পড়েছে। গত ২৮ জানুয়ারি প্রতি ট্রয় আউন্স (৩১ দশমিক ১ গ্রাম) সোনার দাম উঠেছিল ৫ হাজার ৩০৩ ডলারে। কিন্তু শুক্রবার সেই দাম নেমে এসেছে ৪ হাজার ২৩৫ ডলারে।

বিশ্লেষকদের মতে, এর মূল কারণ মূল্যস্ফীতির চাপ এবং সুদের হার নিয়ে বদলে যাওয়া প্রত্যাশা।

মূল্যস্ফীতির পেছনে হরমুজ প্রণালির প্রভাব

বর্তমান মূল্যস্ফীতির বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি। যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইরান এই জলপথে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে। অথচ বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ এটি। ফলে তেল ও গ্যাস পরিবহন ব্যাহত হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে জ্বালানির বাজারে। তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে মূল্যস্ফীতিও।

যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ২ শতাংশে, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সময়ে দেশটির শ্রমবাজারও স্থিতিশীল রয়েছে। ফলে বাজারে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, কেন্দ্রীয় ব্যাংক দ্রুত সুদের হার কমাবে, তা অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। বরং এখন অনেকেই আশঙ্কা করছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ানোর পথেও যেতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো।

কেন সুদহার বাড়লে চাপে পড়ে সোনা

সোনাকে সাধারণত মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে সুরক্ষামূলক সম্পদ হিসেবে ধরা হলেও এর একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সোনাকে ‘নন-ইয়েল্ডিং অ্যাসেট’ বলা হয়। অর্থাৎ এটি নিজে থেকে কোনো আয় দেয় না। লভ্যাংশ নেই, সুদ নেই। বিনিয়োগকারী লাভ করবেন তখনই, যখন সোনার বাজারমূল্য বাড়বে। আর্থিক ওয়েবসাইট অপশনস্প্রেডার্স ডটকমের প্রধান অপশন বিশ্লেষক জাস্টিন কার্ডওয়েল আল জাজিরাকে বলেন, ‘সম্পদ হিসেবে সোনা বাস্তব অর্থের সবচেয়ে কাছাকাছি জিনিসগুলোর একটি। এটি লভ্যাংশ দেয় না, আবার দাম না বাড়া পর্যন্ত অতিরিক্ত মূল্যও তৈরি করে না। মানুষ সোনা কেনে এর মূল্যবৃদ্ধির প্রত্যাশায়।’

তাঁর মতে, এ কারণেই উচ্চ সুদের হার সোনার সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। কার্ডওয়েল বলেন, ‘যদি সুদহার বেশি থাকে এবং মানুষ ডলারের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তাহলে বিনিয়োগ হিসেবে সোনার আকর্ষণ কমে যায়।’

ডলার শক্তিশালী হলে কেন দুর্বল হয় সোনা

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান সংঘাত ডলারকে শক্তিশালী করেছে। আর যেহেতু আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার মূল্য নির্ধারণ হয় ডলারে, তাই সাধারণত এ দুটির সম্পর্ক উল্টো দিকে চলে। নোবল গোল্ড ইনভেস্টমেন্টসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কলিন প্লুম বলেন, ‘ডলার শক্তিশালী হলে সোনা চাপের মুখে পড়ে। আর ডলার দুর্বল হলে সোনার দাম বাড়ে। এখন ডলার শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, আর সেই চাপ অনুভব করছে সোনা।’

তবে তিনি ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। প্লুম বলেন, ‘এ বছরের বাকি সময় এবং সম্ভবত আগামী কয়েক বছরেও সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, এরপর কী ঘটবে।’ তাঁর ভাষায়, কয়েক মাস আগেও বাজারে ধারণা ছিল সুদের হার কমবে। ফলে সম্পদের দাম বাড়ছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। তিনি বলেন, ‘এখন আমরা এমন এক বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে সুদের হার বৃদ্ধির বাস্তব সম্ভাবনাও রয়েছে। এই পরিবর্তন সব সম্পদের ওপর প্রভাব ফেলে, আর সুদের হারের বিষয়ে সোনা বিশেষভাবে সংবেদনশীল।’

ট্রাম্পের চাপ, ফেডের হিসাব আর সোনার ভবিষ্যৎ

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভকে সুদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে বাজার বিশ্লেষণভিত্তিক সিএমই ফেডওয়াচ টুল এখন দেখাচ্ছে, ডিসেম্বরের মধ্যে সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশের বেশি।

কলিন প্লুমের মতে, এটি সোনার বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। তিনি বলেন, ‘সুদের হার আর মূল্যস্ফীতি যেন দোলনার দুই প্রান্ত, আর মাঝখানে বসে আছে সোনা। ২০২৬ সালের বাস্তবতা হলো, দুটোই একসঙ্গে ঘটছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সুদের হারের দিকটাই জিতছে। এ কারণেই সোনা প্রতিকূলতার মুখে রয়েছে।’

যুদ্ধ শেষ হলে কি বাড়বে সোনার দাম

শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতার খবর প্রকাশের পর সোনার দাম আগের দিনের তুলনায় সামান্য বেড়ে লেনদেন শেষ করে। জাস্টিন কার্ডওয়েলের মতে, যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা সোনার জন্য ইতিবাচক সংকেত হতে পারে। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনার খবর সোনার জন্য ইতিবাচক হতে পারে। কারণ, তখন ধারণা তৈরি হবে যে মূল্যস্ফীতি কমবে।’

তবে তাঁর সতর্কতা, বাস্তব পরিস্থিতি বদলাতে এখনো কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। কার্ডওয়েল বলেন, ‘সোনা এখন যে দামের পরিসরে রয়েছে, সেটি সম্ভবত একটি সমর্থন অঞ্চল। যুদ্ধ শেষ হলেও আরও অনেক কারণ থাকবে, যা সোনার দামকে খুব বেশি ওপরে উঠতে দেবে না।’

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত