Ajker Patrika

তাইওয়ানে সম্ভাব্য আক্রমণের আগে ইরান যুদ্ধে অনেক কিছুই পরখ করছে চীন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
তাইওয়ানে সম্ভাব্য আক্রমণের আগে ইরান যুদ্ধে অনেক কিছুই পরখ করছে চীন
তাইওয়ানের স্বাধীনতা ইস্যুতে পররাষ্ট্র দপ্তরের ভাষায় ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে যুক্তরাষ্ট্র। ছবি: সংগৃহীত

ইরান যুদ্ধ চীনের সামনে এক বিরল সুযোগ এনে দিয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে চাপের মুখে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা কীভাবে কাজ করে, তা কাছ থেকে দেখার সুযোগ পাচ্ছে বেইজিং। একই সঙ্গে এটি আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে, যেকোনো যুদ্ধে প্রতিপক্ষও ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন চীন, তাইওয়ান ও অন্য কয়েকটি দেশের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছে। তাঁরা বিশ্লেষণ করেছেন, পারস্য উপসাগর ও এর আশপাশে গত দুই মাসের যুদ্ধ ভবিষ্যতে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের সম্ভাব্য চিত্র সম্পর্কে কী ইঙ্গিত দেয়। তাঁরা সতর্ক করেছেন, চীন যেন নিজের শক্তিকে অতিমূল্যায়ন না করে। একই সঙ্গে তারা বলছেন, বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতার অভাব এবং সংঘাতের প্রভাবকে অতিরিক্ত সংকীর্ণভাবে দেখার প্রবণতা বেইজিংয়ের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।

চীনের বিমানবাহিনীর সাবেক কর্নেল ফু চিয়ানশাও বলেন, এই যুদ্ধ থেকে তার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি বা পিএলএ কখনোই নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অবহেলা করতে পারবে না। তিনি উল্লেখ করেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট ও টার্মিনাল হাই-অলটিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (থাড) ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ফাঁক খুঁজে বের করার উপায় পেয়েছে। ফু চিয়ানশাও বলেন, ‘ভবিষ্যতের যুদ্ধে নিজেদের অজেয় রাখতে হলে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করতে বড় ধরনের প্রচেষ্টা চালাতে হবে।’

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পিএলএ দ্রুত আক্রমণাত্মক সমরশক্তি বাড়িয়েছে। তারা বহরে এমন ক্ষেপণাস্ত্র যুক্ত করেছে, যেগুলো হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল বহন করতে পারে এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর এড়িয়ে যেতে সক্ষম। সেই সঙ্গে এসব অস্ত্র উৎক্ষেপণের প্ল্যাটফর্মও বাড়ানো হয়েছে।

পিএলএ এয়ার ফোর্স দ্রুতগতিতে পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমানও যুক্ত করছে। ব্রিটিশ থিংক ট্যাংক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট–রুসির তথ্য অনুযায়ী, দূরপাল্লার নির্ভুল হামলার সক্ষমতায় ব্যবহারের জন্য চীন প্রায় এক হাজার জে-২০ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করবে। এগুলোকে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের সমতুল্য হিসেবে দেখেন।

চীন যুক্তরাষ্ট্রের বি-২ বা বি-২১ বোমারু বিমানের মতো দীর্ঘপাল্লার স্টেলথ বোমারুও তৈরি করছে। তবে সেগুলোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে। চীন বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ড্রোন নির্মাতা। বিশ্লেষকদের মতে, তাদের উৎপাদন সক্ষমতা এতটাই বিশাল যে বিপুল সংখ্যক মানববিহীন অস্ত্র ব্যবস্থা তারা অল্প সময়ে তৈরি করতে পারে।

বিশ্লেষণধর্মী প্ল্যাটফর্ম ওয়ার অন দ্য রকসে প্রকাশিত ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘চীনের বেসামরিক নির্মাতারা এক বছরেরও কম সময়ে নিজেদের উৎপাদনব্যবস্থা বদলে বছরে এক বিলিয়ন অস্ত্রসজ্জিত ড্রোন তৈরি করতে সক্ষম।’

কিছু বিশ্লেষক সতর্ক করে বলেছেন, তাইওয়ান এখনো এমন বিপুল সংখ্যক ড্রোন হামলার মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়। সম্প্রতি প্রকাশিত এক সরকারি তদারকি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাইওয়ানের বর্তমান ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা ‘অকার্যকর’ এবং তা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও সামরিক ঘাঁটির জন্য ‘বড় নিরাপত্তা ঝুঁকি’ তৈরি করছে।

তবে এটাও সত্য, তাইওয়ানও নিশ্চুপ বসে নেই। তারা নিজেদের প্রতিরোধব্যবস্থা উন্নত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাইওয়ানের প্রধান ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান থান্ডার টাইগারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিন সু বলেন, তাইওয়ানের ড্রোনের গণহারে উৎপাদন সক্ষমতায় আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘শত্রুকে মোকাবিলা করতে আমাদের দিন-রাত অবিরাম উৎপাদন চালিয়ে যেতে হবে।’

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও এই যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিচ্ছে। সেখানে ক্রমেই উপলব্ধি বাড়ছে যে, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কোনো সংঘাত হলে ওয়াশিংটন আক্রমণকারী নয়, বরং প্রতিরক্ষার ভূমিকায় থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল স্যামুয়েল পাপারো এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট শুনানিতে বলেন, ড্রোন যুদ্ধকে আক্রমণকারী পক্ষের জন্য অনেক বেশি ব্যয়বহুল করে তুলেছে।

তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে সংঘাত হলে দ্বীপটি বা যুক্তরাষ্ট্র ড্রোন ব্যবহার করে তাইওয়ান প্রণালী পাড়ি দেওয়া চীনা জাহাজ ও বিমানকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। এসব জাহাজ বা বিমানে হয়তো কয়েক লাখ পিএলএ সেনা বহন করা হবে, যারা তাইওয়ানে হামলা ও দখল অভিযানে অংশ নেবে।

প্রতিটি জাহাজ, প্রতিটি বিমান এবং তাতে থাকা সেনাদের মূল্য সেই ড্রোনগুলোর তুলনায় বহুগুণ বেশি, যেগুলো সেগুলো ধ্বংস করতে পারে। এই বৈষম্যই এক ধরনের প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে। ইরানের যুদ্ধে তার প্রতিফলনও দেখা গেছে। ইরানের অ্যাসিমেট্রিক বা অসমমিত যুদ্ধকৌশল নিয়ে সতর্ক থাকার কারণে মার্কিন নৌবাহিনী খুব কম ক্ষেত্রেই হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করে পারস্য উপসাগরে জাহাজ পাঠিয়েছে।

বেইজিং প্রায় নিশ্চিতভাবেই লক্ষ্য করেছে যে, অ্যাডমিরাল পাপারো তাইওয়ান প্রণালীকে হাজার হাজার ড্রোন দিয়ে ভরে ফেলার পক্ষে কথা বলেছেন। আকাশে, পানির ওপর এবং সমুদ্রের নিচে ছড়িয়ে থাকা এসব ড্রোন চীনা বাহিনীকে লক্ষ্যবস্তু করবে, যাতে পিএলএর জন্য প্রণালী পেরিয়ে তাইওয়ানে অগ্রসর হওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

শত্রুরও থাকে নিজস্ব হিসাব–নিকাশ

ইরান যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিতে চাওয়া সব সামরিক শক্তির জন্য এটিই বড় বাস্তবতা—আপনার শত্রুও শিখছে। আর সে সেই শিক্ষা এমনভাবে প্রয়োগ করতে পারে, যা আপনি কল্পনাও করেননি। ইরান যুদ্ধ শুরুর দুই মাসের বেশি সময় পরও বহু বিশ্লেষক এখনো বিস্মিত হয়ে ভাবছেন, যুদ্ধকালীন ওয়াশিংটনের নেতারা কীভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আগে থেকে পরিকল্পনা করেননি।

অনেকে আবার প্রশ্ন তুলছেন, এত ভয়াবহ সামরিক আঘাতের পরও ইরানি সরকার কীভাবে এখনো টিকে আছে। তবে একই সঙ্গে তারা বেইজিংয়ের জন্যও এতে স্পষ্ট কিছু শিক্ষা দেখতে পাচ্ছেন। অরাজনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফাউন্ডেশন অব ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের জ্যেষ্ঠ ফেলো ক্রেই সিঙ্গেলটন বলেন, ‘কৌশলগত বিজয় মানেই রাজনৈতিক ফল নয়।’ তিনি বলেন, ‘সামরিক চাপ...টেকসই রাজনৈতিক সমঝোতায় পরিষ্কারভাবে রূপ নেয়নি।’ তাঁর ভাষায়, ইরান যুদ্ধ ‘চীনের জন্য এটি একটি মৌলিক শিক্ষা আরও জোরালোভাবে তুলে ধরে—যুদ্ধক্ষেত্রে সফলতা মানেই আপনি যে চূড়ান্ত ফল চান, সেটি পাওয়া নয়।’

এরপর আসে আরেকটি বিষয়, যা চীনা সামরিক বাহিনীর নেই বললেই চলে—বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতা। পিএলএ সর্বশেষ প্রকৃত যুদ্ধ দেখেছে ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভিয়েতনাম সংঘাতে। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ইরাকে দুই দফা বড় অভিযান চালিয়েছে, আফগানিস্তানে দীর্ঘ যুদ্ধ করেছে, আর কসোভো ও পানামার মতো জায়গায় দ্রুত সামরিক অভিযানও পরিচালনা করেছে। চীনা সামরিক বিশ্লেষক সং জংপিং ইরান সংঘাত নিয়ে বলেন, ‘প্রকৃত যুদ্ধ দেখতে এমনই।’

আগামী এক দশকের মধ্যে যদি চীন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায়, তাহলে ওয়াশিংটনের হাতে এমন বিপুলসংখ্যক সামরিক সদস্য থাকবে, যারা বর্তমান পারস্য উপসাগরীয় সংঘাতে সরাসরি লড়েছে অথবা অন্তত যুদ্ধ পরিকল্পনার অংশ ছিল। তারা সহযোদ্ধাকে হারিয়েছে, সামরিক সম্পদ হারিয়েছে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিশাল জয় অর্জন করেছে এবং অত্যন্ত উচ্চমানের নির্ভুল যুদ্ধ পরিচালনা করেছে।

এবং তারা নিজেদের বদলেছে। উদাহরণ হিসেবে, শাস্তিমূলক বিমান হামলা থেকে সরে এসে ইরানি বন্দর অবরোধে মনোযোগ দেওয়া, অথবা একটি এডব্লিউএসিএস রাডার বিমান হারানোর পর যুদ্ধবিমান রাখার আশ্রয়কেন্দ্র আরও সুরক্ষিত করা। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের মধ্যে থাকা অবস্থায় পিএলএ কত দ্রুত এমন পরিবর্তনশীল যুদ্ধক্ষেত্রের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে, সেটি এখনো অজানা।

সিঙ্গাপুরের এস. রাজারত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো ড্রিউ থম্পসন ফেলো, ঐতিহাসিক উদাহরণ হিসেবে কোরীয় যুদ্ধের কথা টানেন। সর্বশেষ এই যুদ্ধেই যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সরাসরি মুখোমুখি হয়েছিল।

চীনের হাতে তখন সোভিয়েত নির্মিত মিগ–১৫ যুদ্ধবিমান ছিল, যা প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পাইলটরা তুলনামূলক দুর্বল এফ-৮৬ উড়িয়েও ভালো করেছিল। কারণ, তাদের অনেকেরই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা ছিল। থম্পসনের ভাষায়, ‘একজন অসাধারণ পাইলট মাঝারি মানের বিমান নিয়েও সব সময় উন্নত বিমান থাকা একজন মাঝারি মানের পাইলটকে হারাবে।’

ইরান যুদ্ধ থেকে আরেকটি শিক্ষা হলো, যখন একটি পরাশক্তি ও অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্রের মধ্যে এ ধরনের যুদ্ধ হয়, তখন তা সব সময় পরিচ্ছন্ন বা দ্রুত শেষ করার মতো অভিযান হয় না। ক্রেইগ সিঙ্গেলটন বলেন, ‘বিশ্ব সরবরাহব্যবস্থার মধ্যে ঝুঁকি ঢুকিয়ে দিতে এবং একটি কৌশলগত সংকীর্ণ পথকে কাজে লাগাতে ইরানের সক্ষমতা দেখিয়ে দিয়েছে, কী দ্রুত একটি স্থানীয় সংঘাত আন্তর্জাতিক রূপ নিতে পারে।’

তাঁর মতে, ‘বেইজিংয়ের জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা যে—তাইওয়ানকে ঘিরে যেকোনো পরিস্থিতি সঙ্গে সঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি প্রবাহ এবং তৃতীয় পক্ষের শক্তিগুলোকে এমনভাবে জড়িয়ে যে, আগেভাগে এটা কল্পনা করাও কঠিন।’

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত