
ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেত বলেছিলেন, কাতারের সমর্থনে তুরস্ক এখন ইসরায়েলের জন্য ইরানের চেয়েও বড় কৌশলগত হুমকি হয়ে উঠছে। তখন তাঁর কথাটি কেবলই একটি সাধারণ সতর্কবার্তা ছিল না। বরং তাঁর এই মন্তব্য ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা উদ্বেগের আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ইসরায়েল এখন আশঙ্কা করছে, তারা কেবল একটি শত্রু রাষ্ট্র নয়, বরং ঐতিহাসিকভাবে সমৃদ্ধ এবং অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী এক নতুন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।
কয়েক দশক ধরে ইসরায়েলের প্রধান মাথাব্যথার কারণ ছিল ইরান এবং তার শিয়া বলয় (হিজবুল্লাহ, সিরিয়া ও লেবানন)। কিন্তু বেনেতের কথায় ফুটে উঠেছে এক নতুন সুন্নি অক্ষের ছবি। ন্যাটো সদস্য এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির দেশ তুরস্ক এখন একটি শক্তিশালী সুন্নি বলয় তৈরি করছে, যা ইরানের শিয়া বলয়ের চেয়েও শক্তিশালী হতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ মেলিহা আলতুনিসিক বলেন, ‘এরদোয়ান অত্যন্ত চতুর ব্যক্তি। ইরানের মতো কেবল আদর্শ নয়, তুরস্ক আদর্শের সঙ্গে বাস্তববাদের সংমিশ্রণ ঘটাতে জানে, যা তাদের আরও বেশি বিশ্বাসযোগ্য ও অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে।’
ইসরায়েলি কৌশলবিদদের মতে, মূল হুমকি কেবল তুরস্ক নয়; বরং তুরস্ক-কাতার জোট। এই দুই দেশ মিলে ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’-এর আদর্শ ছড়িয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ ইসরায়েলের। তাদের প্রভাব এখন সিরিয়া ও গাজা ছাড়িয়ে সৌদি আরবের দিকেও ছড়িয়ে পড়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্রটি হলো—তুরস্ক, কাতার এবং তাদের মিত্র পরমাণু শক্তিধর পাকিস্তানের একটি নতুন অক্ষ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের বিশেষজ্ঞ স্টিভেন কুক বলেন, ‘ইসরায়েল এতকাল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সামলানোর কৌশল সাজিয়েছে। কিন্তু তুরস্ক যদি সৌদি আরব বা পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করে ফেলে, তবে এক রাতেই পুরো কৌশলগত মানচিত্র বদলে যাবে। তখন এটি কেবল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয় থাকবে না, এটি হবে পরমাণু শক্তিধর একটি সুন্নি বিশ্বের মুখোমুখি হওয়া।’
তুরস্ক ও ইসরায়েলের এই দ্বন্দ্ব কেবল আদর্শিক বা সামরিক নয়, বরং ব্যাপকভাবে অর্থনৈতিকও। ২০২৪ সালের মে মাসে তুরস্ক ইসরায়েলের সঙ্গে সব ধরনের আমদানি-রপ্তানি ও বাণিজ্য লেনদেন সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। সিমেন্ট, অ্যালুমিনিয়াম ও সারের মতো ৫৪টি পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে শুরু হওয়া এই পদক্ষেপ এখন পূর্ণাঙ্গ বয়কটে রূপ নিয়েছে। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ দাবি করেছেন, এরদোয়ান হামাসকে সমর্থন দিতে গিয়ে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ বলি দিচ্ছেন।
তবে বাণিজ্য বিশ্লেষক সানি মান মনে করেন, তুরস্কের এই সিদ্ধান্ত নজিরবিহীন। একটি জি-২০ ভুক্ত দেশ যখন কেবল রাজনৈতিক কারণে অন্য একটি দেশের ওপর পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তখন তা সেই দেশের অর্থনৈতিক শক্তিরই পরিচয় দেয়।
এই রেষারেষির একটি ঐতিহাসিক দিকও রয়েছে। ১৯১৭ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিন ছিল অটোমান বা উসমানীয় শাসনের অধীনে। এরদোয়ান প্রায়ই তাঁর বক্তব্যে এই অটোমান সাম্রাজ্য ও তাঁদের ঐতিহ্যের কথা বলেন।
অ্যারিয়েল ইউনিভার্সিটির ড. আসসা ওফির বলেন, ‘তুরস্কের অনেকের কাছে ফিলিস্তিন ইস্যুটি কেবল সহমর্মিতা নয়, এটি একটি ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার।’ এখানেই ইসরায়েলের আসল ভয়। ইরান শিয়া আদর্শে বিশ্বাসী হওয়ায় আরব বিশ্বে তাদের গ্রহণযোগ্যতা সীমিত। কিন্তু তুরস্ক তার অটোমান ঐতিহ্যের কারণে এই অঞ্চলে সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক বৈধতা দাবি করতে পারে।
ফলে প্রশ্ন উঠছে, ইসরায়েলের এই সতর্কতা কি আসলেই বাস্তবসম্মত নাকি কোনো উসকানি? কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, তুরস্ককে ‘নতুন ইরান’ হিসেবে চিহ্নিত করা একটি কৌশলগত ভুল হতে পারে। এটি সমাধানের চেয়ে বরং সংঘাতকে ত্বরান্বিত করবে। ইসরায়েলের তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের মোশে দায়ান সেন্টারের জোনাথন ঘারিয়ানি যুক্তি দেন, ইসরায়েল-তুরস্ক সম্পর্ক সব সময়ই সহযোগিতা ও সংঘাতেরে দোলাচলেই ছিল। ১৯৯০-এর দশকে যেখানে সামরিক সহযোগিতা ছিল, আজ সেখানে চলছে অর্থনৈতিক যুদ্ধ।
তবে নাফতালি বেনেতের বক্তব্য উসকানি হোক বা সতর্কতা, একটি সত্য তো বেরিয়েই এসেছে—ইসরায়েল এখন কেবল শত্রুর শত্রুতাকে নয়, বরং সেই শত্রুর বিশ্বজুড়ে গ্রহণযোগ্যতা ও শক্তিকেও ভয় পেতে শুরু করেছে। আর এই নতুন বাস্তবতা মধ্যপ্রাচ্যকে আবারও এক ভয়াবহ সংঘাতের চক্রে আটকে ফেলতে পারে, যার কেন্দ্রে থাকবে তুরস্ক।
মিডল ইস্ট মনিটর থেকে অনুবাদ করেছেন জগৎপতি বর্মা

মধ্যপ্রাচ্যের মানুষকে যখন নিজেদের কথা খোলাখুলি বলার সুযোগ দেওয়া হয়, তখন ইসরায়েল, এবং দেশটিকে ঘিরে থাকা পশ্চিমা ঐকমত্য সম্পর্কে একেবারেই ভিন্ন এক চিত্র সামনে আসে। সম্পর্ক ‘স্বাভাবিকীকরণ’ বা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিসে’ সদস্যপদ—এসব আসলে একধরনের ফাঁকা বুলি মাত্র।
৪ ঘণ্টা আগে
৬৭ বছর বয়সী লারিজানি রেভল্যুশনারি গার্ডসের সাবেক কমান্ডার। বর্তমানে কার্যত তিনিই ইরান পরিচালনা করছেন। তাঁর এই উত্থান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে সাইডলাইনে ঠেলে দিয়েছে। হার্ট সার্জন থেকে রাজনীতিবিদ হওয়া পেজেশকিয়ান তাঁর মেয়াদের এক বছর অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যে পার করছেন।
১৭ ঘণ্টা আগে
গত বছরের নভেম্বরের শুরুর দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি পোস্ট নাইজেরিয়ায় আতঙ্ক তৈরি করে। তিনি লিখেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ মন্ত্রণালয় ‘ডিপার্টমেন্ট অব ওয়ার’ পশ্চিম আফ্রিকার এই দেশে ‘গানস-আ-ব্লেজিং’ বা সর্বশক্তি নিয়ে অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
১ দিন আগে
গত বছরের শেষ দিকে তুরস্কের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দেশটির ভেতরে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের হয়ে কাজ করা একটি গুপ্তচর নেটওয়ার্ক সম্পর্কে নতুন তথ্য প্রকাশ করেছে। তুরস্কের ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশন (এমআইটি), পাবলিক প্রসিকিউটর অফিস এবং ইস্তাম্বুল সিকিউরিটি ডাইরেক্টরেটের যৌথ তদন্তে দুজনকে...
১ দিন আগে