Ajker Patrika

মোসাদ বনাম এমআইটি: ‘অপারেশন ফেইলিং লায়ন’—তুরস্কে ইসরায়েলের গোয়েন্দা ব্যর্থতার গল্প

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০: ৫৬
মোসাদ বনাম এমআইটি: ‘অপারেশন ফেইলিং লায়ন’—তুরস্কে ইসরায়েলের গোয়েন্দা ব্যর্থতার গল্প
মোসাদকে ঠেকিয়ে দিতে বেশ কৌশলী হতে হয়েছে তুরস্ককে। ছবি: দ্য ক্রেডল

গত বছরের শেষ দিকে তুরস্কের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দেশটির ভেতরে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের হয়ে কাজ করা একটি গুপ্তচর নেটওয়ার্ক সম্পর্কে নতুন তথ্য প্রকাশ করেছে। তুরস্কের ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশন (এমআইটি), পাবলিক প্রসিকিউটর অফিস এবং ইস্তাম্বুল সিকিউরিটি ডাইরেক্টরেটের যৌথ তদন্তে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তদন্তে জানা যায়, সারকান চিচেক নামে এক ব্যক্তি, যিনি মুহাম্মদ ফাতিহ কেলেস নামেও পরিচিত, আর্থিক ঋণের কারণে নিজের নাম পরিবর্তন করেছিলেন। ২০২০ সালে তিনি ‘প্যান্ডোরা ইনভেস্টিগেশনস’ নামে একটি কোম্পানি গড়ে তোলেন। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি ইসরায়েলের ইলেকট্রনিক অপারেশনস সেন্টারে ‘ফয়সাল রশিদ’ কোড নামে কাজ করা এক মোসাদ এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। অভিযোগ, তিনি মোসাদের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির কর্মকাণ্ডে অংশ নেন।

তদন্তকারীরা জানান, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের নীতির বিরোধিতা করেন এমন এক ফিলিস্তিনি কর্মীর ওপর নজরদারির নির্দেশ পান চিচেক। বিনিময়ে তিনি ৪ হাজার মার্কিন ডলার সমমূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি পান। গত বছরের ১ ও ২ আগস্ট ইস্তাম্বুলের বাসাকশেহির জেলায় তিনি নজরদারি চালান। নিরাপত্তা ক্যামেরায় তাঁর চলাফেরা ধরা পড়ে। তদন্তে আইনজীবী তুঘরুলহান দিপের সংশ্লিষ্টতার কথাও উঠে আসে। তিনি জনসাধারণের রেকর্ড থেকে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে তা মোসাদের কাছে বিক্রি করেন। তিনি মুসা কোচ নামের আরেকজনের সঙ্গে কাজ করছিলেন। মুসা কোচ আগে ইসরায়েলের কাছে তথ্য পাচারের অভিযোগে ১৯ বছরের কারাদণ্ড পান।

এটি ছিল তুরস্কের অভ্যন্তরে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সর্বশেষ তৎপরতা ফাঁসের গল্প। তবে মোসাদের প্রথম দিকের আলোচিত কর্মকাণ্ডের একটি ছিল ১৯৬০ সালে আর্জেন্টিনা থেকে কুখ্যাত নাৎসি যুদ্ধাপরাধী এডলফ আইখম্যানকে নাটকীয়ভাবে অপহরণ। পরে ১৯৭২ সালের মিউনিখ অলিম্পিক হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর সংগঠনের সদস্যদের হত্যার ঘটনাও বিশ্বজুড়ে শিরোনাম হয়।

এ ধরনের হত্যা, অপহরণ ও নাশকতার ঘটনা ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু অন্য দেশের অনুমতি ছাড়া তাদের সার্বভৌম ভূখণ্ডে এ ধরনের অভিযান আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। এসব অভিযানে প্রায়ই অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘিত হয়। বেআইনি শক্তি প্রয়োগ করা হয়। ন্যায্য বিচার পাওয়ার অধিকার ও জীবনের অধিকারের মতো মৌলিক মানবাধিকার ক্ষুণ্ন হয়।

দশকের পর দশক ধরে ইসরায়েলের গোয়েন্দা কার্যক্রম এক ধরনের দায়মুক্তির আবরণে ছিল। অনেকের কাছে এতে মোসাদের ভাবমূর্তি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী গুপ্তচর সংস্থা হিসেবে গড়ে ওঠে। কিন্তু বিশেষ করে তুরস্কে সেই ভাবমূর্তি এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। ইরানের ভেতরে স্থানীয় এজেন্ট ব্যবহার করে কিছু গোয়েন্দা সাফল্য পেয়েছে মোসাদ। বিশেষ করে ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’ নামে পরিচিত হাইপ্রোফাইল মিশনে। তবে তুরস্কের ভেতরে তারা ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

কিন্তু ২০২১ সাল থেকে তুরস্কের ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশন (এমআইটি) ও পুলিশ বাহিনী একের পর এক পাল্টা গোয়েন্দা অভিযানের মাধ্যমে মোসাদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোসাদের গোপন কার্যক্রম উন্মোচন করে তুরস্ক বড় ধরনের গোয়েন্দা সাফল্য দেখিয়েছে।

সমন্বিতভাবে কাজ করে এমআইটি ও পুলিশ একাধিক গুপ্তচর চক্র ভেঙে দেয়। এর মাধ্যমে দেশটির ভেতরে ইসরায়েলের গভীর পরিকল্পনা প্রকাশ পায়। ২০২১ সালে ইস্তাম্বুলকেন্দ্রিক চার প্রদেশে অভিযান চালিয়ে প্রথম বড় নেটওয়ার্ক উন্মোচন করা হয়। অভিযোগ ছিল, তারা ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছিল। ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২২ সালে আরও বড় একটি নেটওয়ার্ক ধরা পড়ে। ৬৮ সদস্যের এই চক্রে বেসরকারি গোয়েন্দা ও বেসামরিক ব্যক্তিরা ছিল। তারা মোসাদকে ঠিকানা, ফ্লাইটের তথ্য ও নজরদারি নথি সরবরাহ করেছিল বলে অভিযোগ।

পরের বছর ৫৬ সদস্যের একটি ‘ঘোস্ট সেল’ উন্মোচিত হয়। অভিযোগ ছিল, তারা তুরস্কে বিদেশি কূটনীতিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের লক্ষ্য করছিল। সাতজনকে আটক করা হয়। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ‘মোল অপারেশন’ নামে আট প্রদেশে একযোগে অভিযান চালানো হয়। ৩৪ জনকে আটক করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে ব্ল্যাকমেল, নজরদারি ও অপহরণের চেষ্টা করার অভিযোগ আনা হয়।

এর কয়েক মাস পর মার্চে একটি বেসরকারি গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক ধরা পড়ে। তারা সরাসরি ইসরায়েলি হ্যান্ডলারদের সঙ্গে কাজ করছিল এবং মাটির কাছাকাছি থেকে তাৎক্ষণিক গোয়েন্দা তথ্য দিচ্ছিল বলে অভিযোগ। এপ্রিল মাসে আরেকটি বড় অভিযান চালিয়ে পারিবারিকভাবে পরিচালিত একটি গুপ্তচর চক্র ভেঙে দেওয়া হয়। আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে জাল নথি তৈরি, লক্ষ্য অনুসরণ ও সাইবার নজরদারির অভিযোগ ছিল। আদালত তাদের মোট ১০০ বছরের কারাদণ্ড দেন।

২০২৪ সালের আগস্টে সবচেয়ে আলোচিত গ্রেপ্তার হয়। কসোভোতে জন্ম নেওয়া লিরিদোন রেক্সেপি, যাকে তুরস্কে মোসাদের আর্থিক সমন্বয়কারী বলা হয়, তাকে ইস্তাম্বুলে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তে জানা যায়, তিনি ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের মাধ্যমে সীমান্তপারের অভিযানে জড়িত এজেন্টদের অর্থ পাঠিয়েছিলেন। এর মধ্যে সিরিয়ায় মিশনও ছিল। এসব অভিযান শুধু তাৎক্ষণিক হুমকি ঠেকায়নি। স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, তুরস্কের মাটিতে মোসাদ স্থায়ী ও টেকসই উপস্থিতি গড়ে তুলতে পারবে না।

তুরস্কে মোসাদের বড় ধাক্কাগুলোর একটি ছিল কৌশলগতভাবে তাদের উন্মোচিত হওয়া। ওমর আলবেলবাইসি, যিনি ‘ডেজার্ট ফ্যালকনস’ নামে পরিচিত একটি মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সাইবার গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ, মোসাদের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত লক্ষ্য হন। এই গোষ্ঠী ইসরায়েলের আয়রন ডোম আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যাহত করার জন্য পরিচিত।

ইসরায়েলের লক্ষ্য ছিল তাঁকে অপহরণ করা। সাইবার তথ্য বের করে নেওয়া। নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া। পরিকল্পনায় ছিল নরওয়ে ও ব্রাজিলের ভুয়া চাকরির প্রস্তাব। অর্থের লোভ। জটিল সাইবার ফাঁদ। শেষ পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় তাঁকে কোণঠাসা করে অপহরণ করে মোসাদ এজেন্টরা। তারা ভাবেনি, তুরস্ক নীরবে এতে যুক্ত থাকবে। মালয়েশিয়ার পুলিশ ও তুরস্কের এমআইটির সমন্বিত চেষ্টায় ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে আলবেলবাইসিকে উদ্ধার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাঁকে নির্যাতন করা হয়েছিল বলে জানা যায়।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা ছিল, অভিযানে জড়িত এজেন্টদের ছবি ও পরিচয় পরে প্রকাশ করা হয়। গোয়েন্দা মহলে এটি কার্যত সংশ্লিষ্ট অপারেটিভদের নিষ্ক্রিয় করে দেওয়ার সমান। এটি শুধু প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ ছিল না। এটি ছিল কৌশলগত পাল্টা আঘাত। মোসাদের জন্য এটি এক মোড় ঘোরানো ঘটনা। শিকারি থেকে তারা নিজেই শিকারে পরিণত হয়।

মোসাদের পরিচিতি গোপন যুদ্ধের ওপর দাঁড়িয়ে। নিখুঁত আঘাত। গোপন অভিযান। নাশকতা। কিন্তু তুরস্ক এমন একটি দেশ, যেখানে এই মডেল বারবার ব্যর্থ হয়েছে। ২০২১ সাল থেকে আঙ্কারা সক্রিয় পাল্টা গোয়েন্দা নীতি গ্রহণ করেছে। শুধু প্রতিক্রিয়াশীল নয়; প্রতিরোধমূলক ও শাস্তিমূলকও। তুরস্ক শুধু মোসাদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেয়নি। তাদের বিরুদ্ধে খোলা আদালতে বিচার করেছে। অপরাধ প্রকাশ্যে এনেছে। গোয়েন্দা লড়াইয়ে যে গোপনীয়তা দেখা যায়, তার বিপরীতে এটি ছিল স্বচ্ছ পদক্ষেপ।

মোসাদের প্রচলিত কৌশল যেমন প্রযুক্তিগত নজরদারি, স্থানীয় সহযোগী ব্যবহার, ডিজিটাল ফাঁস—এসব তুরস্কে কঠিন প্রতিরোধের মুখে পড়েছে। স্থানীয় আইন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও মাঠপর্যায়ের অভিযান গোপন তৎপরতার জন্য প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। তুরস্ক এখন শুধু গুপ্তচর ধরছে না, তাদের ফাঁদে ফেলছে। ইচ্ছাকৃতভাবে যোগাযোগ শুরু করছে। প্রমাণসহ প্রকাশ করছে। মোসাদের মতো গোপন সংস্থার জন্য এটি এক নতুন ধরনের হুমকি।

নিয়মিত নজরদারি, অভ্যন্তরীণ সমন্বয়, উন্নত প্রযুক্তি ও আইনি তদারকির মাধ্যমে তুরস্ক এমন একটি মডেল দাঁড় করিয়েছে, যা শুধু মোসাদ নয়, যেকোনো বিদেশি গোয়েন্দা হুমকি মোকাবিলা করতে সক্ষম। মোসাদের একচ্ছত্র আধিপত্যের ধারণা এখন বদলে যাচ্ছে। তাদের ছায়াও আলোর মুখ দেখছে। তুরস্ক এখন গোয়েন্দা যুদ্ধে নেতৃত্বের ভূমিকায়। শুধু প্রতিক্রিয়া নয়, নিয়ম নির্ধারণেও তারা সক্রিয়।

টিআরটি গ্লোবাল ও মিডল ইস্ট মনিটর অবলম্বনে লিখেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত