Ajker Patrika

ইরানে যুদ্ধের প্রস্তুতি ও টিকে থাকার লড়াইয়ের কেন্দ্রে এখন লারিজানি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ইরানে যুদ্ধের প্রস্তুতি ও টিকে থাকার লড়াইয়ের কেন্দ্রে এখন লারিজানি
ইরানের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান আলী লারিজানি। ছবি: সংগৃহীত

ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য সামরিক হামলার মুখে টিকে থাকতে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক পরিস্থিতি সামলাতে একটি মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ইরান। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে প্রায় কোণঠাসা করে সব ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন ঝানু রাজনীতিবিদ আলী লারিজানি। ধারণা করা হচ্ছে, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অত্যন্ত আস্থাভাজন এই নেতার কাঁধেই এখন ইরানের অস্তিত্ব রক্ষার ভার।

আলী লারিজানি এই অবস্থানে আসবেন—এমন পরিকল্পনার অনেক কিছুই গত জুনের ইসরায়েলি হামলার শিক্ষা থেকে নেওয়া হয়েছে। কারণ, ওই যুদ্ধের প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ইরানের সিনিয়র সামরিক কমান্ডের চেইন ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধবিরতির পরপরই খামেনি লারিজানিকে ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধানের দায়িত্ব দেন এবং যুদ্ধের সময় সামরিক বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য অ্যাডমিরাল আলী শামখানির নেতৃত্বে একটি নতুন ‘ন্যাশনাল ডিফেন্স কাউন্সিল’ গঠন করেন। এরপর গত বছরের ডিসেম্বর থেকে দেশব্যাপী বিক্ষোভ এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক হামলার হুমকির পর থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে পুরোপুরি আলী লারিজানির ওপর আস্থা রাখছেন।

৬৭ বছর বয়সী লারিজানি রেভল্যুশনারি গার্ডসের সাবেক কমান্ডার। বর্তমানে কার্যত তিনিই ইরান পরিচালনা করছেন। তাঁর এই উত্থান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে সাইডলাইনে ঠেলে দিয়েছে। হার্ট সার্জন থেকে রাজনীতিবিদ হওয়া পেজেশকিয়ান তাঁর মেয়াদের এক বছর অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যে পার করছেন। এ ছাড়া তিনি প্রকাশ্যেই বলেছেন, ‘আমি একজন চিকিৎসক, রাজনীতিবিদ নই। আমার কাছ থেকে ইরানের বহুমুখী সমস্যার সমাধানের আশা করবেন না।’

গত কয়েক মাসে লারিজানির দায়িত্বের পরিধি ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। ইসলামি শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে হওয়া সাম্প্রতিক বিক্ষোভ দমনের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। বর্তমানে তিনি ভিন্নমত দমন করা, রাশিয়া, কাতার ও ওমানের মতো শক্তিশালী মিত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে পারমাণবিক আলোচনার তদারকি করছেন। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের সময় ইরান পরিচালনার পরিকল্পনাও তিনি তৈরি করছেন বলে জানা গেছে।

দোহা সফরে গিয়ে আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লারিজানি বলেছিলেন, ‘আমরা প্রস্তুত। আমরা নিশ্চিতভাবে আগের চেয়ে শক্তিশালী। গত সাত-আট মাসে আমরা যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়েছি। আমাদের দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করে তা সংশোধন করেছি। তবে আমরা যুদ্ধ করতে চাই না এবং আমরা যুদ্ধ শুরু করব না। তারা যদি আমাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়, তবে আমরা পাল্টা জবাব দেব।’

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি তাঁর ঘনিষ্ঠদের নির্দেশ দিয়েছেন, কেবল মার্কিন বা ইসরায়েলি বোমা নয়, শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর সম্ভাব্য গুপ্তহত্যা থেকেও ইসলামিক রিপাবলিককে রক্ষা করতে হবে। তিনি সামরিক ও সরকারি প্রতিটি পদের জন্য চার স্তরের উত্তরাধিকারী বা বিকল্পের নাম চূড়ান্ত করে রেখেছেন। যদি খামেনি নিজে নিহত হন বা যোগাযোগের বাইরে চলে যান, তবে একটি নির্দিষ্ট নেতৃত্ব যাতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সেই দায়িত্ব তিনি অর্পণ করেছেন।

গত জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় খামেনি তাঁর তিনজন সম্ভাব্য উত্তরসূরি মনোনীত করেছিলেন বলে জানা যায়। তবে তাঁদের নাম কখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। লারিজানি সম্ভবত সেই তালিকায় নেই, কারণ, তিনি উচ্চপর্যায়ের শিয়া আলেম নন। এটি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার জন্য একটি মৌলিক যোগ্যতা।

কিন্তু উত্তরসূরির তালিকায় না থাকলেও লারিজানি খামেনির বিশ্বস্তদের মধ্যে অন্যতম একজন। এই তালিকায় আরও রয়েছেন সাবেক বিপ্লবী গার্ডসের প্রধান মেজর জেনারেল ইয়াহিয়া রহিম সাফাভি, বর্তমান স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ এবং খামেনির চিফ অব স্টাফ আলী আসগর হেজাজি।

জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ ভালি নাসের বলেন, খামেনি এখন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। তিনি নিজেকে ‘শহীদ’ হিসেবে দেখতেও প্রস্তুত এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করছেন, যাতে তাঁর উত্তরাধিকার টিকে থাকে। তিনি জানেন, যুদ্ধের ফলেই উত্তরাধিকার পরিবর্তনের প্রশ্নটি সামনে আসতে পারে।

আর ইরান ধরেই নিয়েছে, মার্কিন সামরিক হামলা এখন অনিবার্য। সশস্ত্র বাহিনীকেও রাখা হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কতায়। ইরাক সীমান্ত ও পারস্য উপসাগরের দক্ষিণাঞ্চলে ব্যালিস্টিক মিসাইল লাঞ্চার মোতায়েন করা হয়েছে। গত সপ্তাহে এক বক্তৃতায় খামেনি হুংকার দিয়ে বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী হয়তো এমন এক থাপ্পড় খাবে যে, তারা আর উঠে দাঁড়াতে পারবে না। তিনি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ারও হুমকি দেন।

ধারণা করা হচ্ছে, যুদ্ধ শুরু হলে ইরান প্রথমে প্রতিটি শহরে বাসিজ মিলিশিয়া ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের মোতায়েন করবে, যাতে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা রোধ করা যায় এবং বিদেশি চরদের ধরা যায়। খামেনি বা শীর্ষ নেতারা নিহত হলে দেশ কে চালাবেন—তার একটি সম্ভাব্য তালিকাও করা হয়েছে। এই তালিকায় লারিজানি শীর্ষে আছেন, তারপরে রয়েছেন স্পিকার ঘালিবাফ। অবাক করার মতো বিষয় হলো, সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানিও এই তালিকায় রয়েছেন।

গত এক মাসে লারিজানির উপস্থিতি যখন তুঙ্গে, পেজেশকিয়ান তখন ক্রমেই ম্লান হয়ে গেছেন। লারিজানি মস্কোতে পুতিনের সঙ্গে দেখা করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন এবং দীর্ঘ টেলিভিশন ইন্টারভিউ দিচ্ছেন। অন্যদিকে পেজেশকিয়ান লারিজানির কর্তৃত্ব মেনে নিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে। একটি কেবিনেট মিটিংয়ে পেজেশকিয়ান জানান, ইন্টারনেটের বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার জন্য তিনি লারিজানিকে অনুরোধ করেছেন—যা স্পষ্ট করে দেয় যে, প্রেসিডেন্ট হয়েও কাজ করতে তাঁকে লারিজানির কাছেই ধরনা দিতে হচ্ছে।

এমনকি গত জানুয়ারিতে মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ যখন মৃত্যুদণ্ড নিয়ে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে চেয়েছিলেন, তখনো প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেছিলেন লারিজানির কাছ থেকে অনুমতি নিতে।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমস থেকে সংক্ষেপে অনুবাদ করেছেন জগৎপতি বর্মা

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত