
ইরান আগেই সতর্ক করেছিল—দেশটির ওপর কোনো হামলা হলে তা পুরো অঞ্চলে বড় ধরনের সংঘাত ছড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হয়তো সেই সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দেয়নি, অথবা তারা মনে করেছিল এই ঝুঁকি নেওয়া যায়। যুদ্ধ শুরুর ১১ দিন পর দেখা যাচ্ছে, সবচেয়ে বেশি মূল্য দিচ্ছে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।
আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটির দিকে ১ হাজার ৭০০টিরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়া হয়েছে। এর মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি ভূপাতিত করা সম্ভব হয়েছে। বাকিগুলো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।
গত সপ্তাহে সিএনএনের সাংবাদিক জেক ট্যাপারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বীকার করেন, যুদ্ধের সবচেয়ে বড় চমক ছিল, ইরান যে এত দ্রুত তার আরব প্রতিবেশীদের ওপর হামলা চালাবে, তা তিনি ভাবেননি।
গত রোববার ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানায়, তারা তাদের সামরিক শক্তির প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যবহার করছে প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর ভেতরে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ‘ঘাঁটি’ এবং ‘কৌশলগত স্বার্থ’ লক্ষ্য করে হামলা চালাতে। বাকি ৪০ শতাংশ শক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে।
এই যুদ্ধে অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় আরব আমিরাতের দিকেই সবচেয়ে বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়া হয়েছে—এমনকি যুদ্ধ শুরু করা দেশ ইসরায়েলের চেয়েও বেশি। এসব হামলার কয়েকটি ঘনবসতিপূর্ণ শহুরে এলাকায় বাড়ি, অফিস ও সড়কে আঘাত হেনেছে। এতে চারজন নিহত হয়েছেন। তাঁরা সবাই বেসামরিক নাগরিক।
দুবাই কেন লক্ষ্যবস্তু
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ফাওয়াজ গেরগেস বলেন, ‘দুবাই আসলে বিশ্বায়নের কেন্দ্রবিন্দু। ইরানের নেতারা দুবাইকে পশ্চিমা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখেন। তাই এখানে আঘাত করলে শুধু দুবাই বা আরব আমিরাত নয়—পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিই কেঁপে ওঠে।’
দুবাইয়ের একটি আন্তর্জাতিক হোটেলের সামনে আগুন জ্বলছে—এমন ছবি, অথবা দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভেতরে হামলার দৃশ্য দ্রুত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর কেড়েছে। হাজার হাজার প্রবাসী ও পর্যটক যখন আমিরাত ছাড়ার চেষ্টা করছেন, তখন সেই দৃশ্য আরও আলোচনার জন্ম দেয়। যদিও এই দুটি হামলায় কেউ আহত হয়নি, তবুও এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব অত্যন্ত বড় হতে পারে।
অধ্যাপক ফাওয়াজ গেরগেসের মতে, বহু বছর ধরে কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা ইরানের জন্য আরব আমিরাত ছিল একধরনের অর্থনৈতিক লাইফলাইন।
একজন আমিরাতি কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেছেন, ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্ক হয়তো স্বাভাবিক হবে, তবে পারস্পরিক বিশ্বাস পুনর্গঠনে ‘দশকের পর দশক’ সময় লাগতে পারে।
ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক
ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদারদের মধ্যে আরব আমিরাত অন্যতম, চীনের পর দ্বিতীয় অবস্থানে। যুক্তরাষ্ট্র যখন একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছিল, তখনো ইরান-আমিরাত ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ছিল। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলার। প্রায় পাঁচ লাখ ইরানি নাগরিক আরব আমিরাতে বসবাস করেন।
ইরান বলছে, আবুধাবির সঙ্গে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের কৌশলগত জোটই এই হামলার অন্যতম কারণ। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র আরব আমিরাতকে ‘বড় প্রতিরক্ষা অংশীদার’ হিসেবে ঘোষণা করে। ফলে নিরাপত্তার জন্য তারা কাকে বিশ্বাস করে—তা স্পষ্ট।
নিজেদের প্রতিরক্ষা জোরদার করতে আরব আমিরাত মার্কিন যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার ও আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। এখন সেই ব্যবস্থাগুলোই ইরানের নজিরবিহীন হামলা থেকে আমিরাতি নাগরিক ও প্রবাসীদের সুরক্ষায় সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি
চ্যাথাম হাউসের গবেষক সানাম ভাকিল বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টি করার কৌশল হিসেবে আরব আরিমাত ইরানের জন্য একাধিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু। তাঁর ভাষায়, ‘আরব আমিরাতে হামলা চালিয়ে ইরান শুধু যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারকে লক্ষ্যবস্তু করছে না, বরং এই বার্তাও দিচ্ছে যে দেশটিতে লাখ লাখ প্রবাসী বাস করে এবং যা বৈশ্বিক অর্থনীতি, বিমান চলাচল ও বাণিজ্যের বড় কেন্দ্র—সেটিও নিরাপদ নয়।’
ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার ব্যাপকতা দেখেই বোঝা যায়, দেশটির শাসকগোষ্ঠী এই যুদ্ধকে কতটা অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে। যখন ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়, আর শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রও এতে যোগ দেয়, তখনো ইরানের প্রতিক্রিয়া ছিল তুলনামূলক সীমিত। তারা কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটিতে একটি হামলা চালায়, যা সম্ভবত আগেই সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। এরপর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে কাতারকে ন্যাটো-ধাঁচের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেন। কারণ, চলমান এই যুদ্ধে কাতারও ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
ভৌগোলিক বাস্তবতা
আমিরাতকে লক্ষ্যবস্তু করার আরেকটি বড় কারণ হলো ভৌগোলিক দূরত্ব। ইরান ও আমিরাতের মধ্যে মাত্র প্রায় ১০০ কিলোমিটার (৬০ মাইল) সমুদ্র রয়েছে। ফলে আমিরাতের উপকূলে পৌঁছাতে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের খুব বেশি সময় লাগে না।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ফাওয়াজ গেরগেস বলেন, ‘আক্ষরিক অর্থেই এটি (আমিরাত) পাশের দেশ। দুবাই বা আরব আমিরাতে হামলা চালানো (ইরানের জন্য) অন্য দেশের তুলনায় অনেক সহজ। যেমন ধরুন, জর্ডান বা ইসরায়েল। কারণ, ইসরায়েলের অত্যন্ত শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা রয়েছে।’
যুদ্ধ শুরুর আগে আরব আমিরাত ঘোষণা দিয়েছিল, ইরানের ওপর হামলা হলে তাদের সামরিক ঘাঁটি বা আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। কিন্তু সেই অবস্থানও দেশটিকে হামলার ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে পারেনি।
গত শনিবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান হামলায় আহত কয়েকজনের সঙ্গে দেখা করেন এবং দেশের শত্রুদের উদ্দেশে বিরল সতর্কবার্তা দেন। তিনি বলেন, ‘আমি তাদের বলছি, আরব আমিরাতকে দেখে ভুল করবেন না। আরব আমিরাতের চামড়া মোটা, আর মাংস তিক্ত—আমরা সহজ শিকার নই।’
বিস্ময় থেকে ক্ষোভ
ইরানের প্রতিশোধের তালিকায় এক নম্বর লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠায় প্রথমে আরব আমিরাতে বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়। কিন্তু খুব দ্রুত সেই বিস্ময় রূপ নেয় ক্ষোভে। আরব আমিরাতের ইংরেজি দৈনিক দ্য ন্যাশনালের সম্পাদক মিনা আল-ওরাইবি বলেন, ‘যুদ্ধ শুরুর সকালে অনেকেই ক্ষুব্ধ ছিলেন। কারণ, তাঁদের ধারণা ছিল, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পথ বেছে নিয়েছে। কিন্তু খুব দ্রুতই যখন আরব আমিরাত এবং অন্য দেশগুলোতে ইরান হামলা শুরু করল, তখন মানুষের ক্ষোভের অনুভূতি ইরানের দিকেই ঘুরে যায়।’
গত শনিবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ক্ষমা চেয়ে বলেন, ইরান আর প্রতিবেশী দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করবে না। এরপর কিছুটা স্বস্তি দেখা দিয়েছিল। কিন্তু সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকি আবারও আরব আমিরাত ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোকে আতঙ্কে ফেলেছে।

ইরান যুদ্ধের ময়দান বলে দিচ্ছে যুদ্ধক্ষেত্র কেবল ক্ষেপণাস্ত্র বা যুদ্ধবিমানের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন পরিণত হয়েছে বিশ্বের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ‘এআই-চালিত ড্রোন যুদ্ধে’। ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা-ইসরায়েলের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ এবং এর জবাবে তেহরানের আকাশপথে পাল্টা আক্রমণ—উভয় ক্ষেত্রেই এক নতুন রণকৌশল ফুটে
২ ঘণ্টা আগে
ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে পারস্য উপসাগরে এক চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকির মুখে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
৩ ঘণ্টা আগে
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছিলেন, তেহরান দুই দশকের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধগুলোকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছে। উদ্দেশ্য এমন এক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যার ফলে রাজধানী বোমায় বিধ্বস্ত হলেও সারা দেশ লড়াই চালিয়ে যেতে পারবে।
১০ ঘণ্টা আগে
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলো হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেছে। বৈঠকের পর তারা ‘অত্যাধুনিক শ্রেণির অস্ত্র’ উৎপাদন চার গুণ বাড়ানোর ব্যাপারে সম্মত হয়েছে।
১২ ঘণ্টা আগে