Ajker Patrika

ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব হত্যা: আলোচনার পথ রুদ্ধ করার কৌশল ইসরায়েলের

আব্দুর রহমান 
আপডেট : ১৮ মার্চ ২০২৬, ১৩: ২১
ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব হত্যা: আলোচনার পথ রুদ্ধ করার কৌশল ইসরায়েলের
ইরানের বর্তমান রেজিমের দুই প্রয়াত স্তম্ভ আলী খামেনির সঙ্গে আলী লারিজানি। ছবি: এক্স

রাজনীতিক, নিরাপত্তাপ্রধান ও দার্শনিক আলী লারিজানি ছিলেন ইরানের এক ‘রেনেসাঁস মানব।’ ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারানো ৬৭ বছর বয়সী এই নেতা ইরানি রাষ্ট্রের অন্যতম বহুমুখী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। সামরিক, আইনসভা ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রজুড়ে তাঁর ছিল কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা।

মার্কিন সাংবাদিক ও থিংকট্যাংক স্টিমসন সেন্টারের ফেলো বারবারা স্লাভিন চারবার আলী লারিজানির সাক্ষাৎকার চারবার নিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘তিনি নানা ক্ষেত্রেই একসঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি আইআরজিসিতে কাজ করেছেন, আবার কিছু সময় জাতীয় টেলিভিশনের প্রধান হিসেবেও কাজ করেছেন।’

ইরানের ক্ষমতার অলিন্দে লারিজানি বহু প্রভাবশালী দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা আইআরআইবির প্রধান, পার্লামেন্টের স্পিকার এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান উল্লেখযোগ্য। ২০০৫-২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি প্রথমবার শেষোক্ত দায়িত্বে ছিলেন এবং গত বছরের আগস্টে পুনরায় ওই পদে নিয়োগ পান।

ইরাকি মায়ের গর্ভে এবং ইরানি বাবার ঔরসে জন্ম নেওয়া এই ইরানি নেতা ১৯৮০-এর দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় আইআরজিসির অভিজ্ঞ যোদ্ধা ছিলেন এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে উন্নীত হন। লারিজানির আগ্রহ ছিল বহুবিধ। তিনি অন্তত ছয়টি দর্শনের বই লিখেছেন এবং ইমানুয়েল কান্টের বিজ্ঞান ও গণিতবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গির বিশেষজ্ঞ ছিলেন।

আলী লারিজানি সম্ভবত ইরানের ক্ষমতার শীর্ষে ওঠার জন্য শুরু থেকেই প্রস্তুত ছিলেন। পারিবারিক পটভূমিও তাঁকে শক্ত অবস্থান দেয়। তিনি এক প্রভাবশালী শিয়া আয়াতুল্লাহর কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন। তাঁর ভাই সাদেগ লারিজানিও একজন আয়াতুল্লাহ ও বিচার বিভাগের সাবেক প্রধান। আরেক ভাই মোহাম্মদ জাভাদ লারিজানিও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন।

লারিজানি ছিলেন একজন প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাবিদও। শরিফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে গণিত ও কম্পিউটারবিজ্ঞানে পড়াশোনা করেন। পরে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে ডক্টরেট নেন এবং জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের ওপর বিস্তৃতভাবে লেখালেখি করেন।

স্লাভিন বলেন, ‘লারিজানি একটি প্রভাবশালী ধর্মীয় পরিবার থেকে এসেছেন। তাঁর এক ভাই কিছু সময় বিচার বিভাগের প্রধান ছিলেন এবং আলী খামেনির পর সম্ভাব্য সর্বোচ্চ নেতা হিসেবেও আলোচিত ছিলেন। অন্য ভাইয়েরাও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন।’

লারিজানি শুধু বহুমুখীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাস্তববাদীও। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই বিভিন্ন গোষ্ঠী ও পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ সিনা তুসি বলেন, ‘তিনি এমন বিরল ব্যক্তি ছিলেন, যিনি বিপুল রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত যোগ্যতা একসঙ্গে ধারণ করতেন এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তুলতে পারতেন। সংকটকালে এটি তাঁকে বিশেষভাবে মূল্যবান করে তুলেছিল।’

সিনা তুসি মনে করেন, ‘এই দিক থেকে তাঁর মৃত্যু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষতি। এতে এমন একজন বাস্তববাদী অভ্যন্তরীণ নেতা হারিয়ে গেলেন, যিনি কৌশলকে সমন্বিত নীতিতে রূপ দিতে পারতেন।’

বিশ্লেষক ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা অ্যালান আয়ার বলেন, লারিজানি একই সঙ্গে মধ্যপন্থী এবং নীতিবাদী হতে পারতেন। তিনি বলেন, ‘তিনি চাইলেই মধ্যপন্থী অবস্থান নিতেন, আর যখন সুবিধাজনক মনে করতেন তখন কঠোরপন্থী। অর্থাৎ বাস্তববাদ ও সুযোগের সদ্ব্যবহারের এক অত্যন্ত কার্যকর মিশ্রণ ছিলেন তিনি।’

লারিজানি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির প্রধান আলোচক ছিলেন। ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা কমাতে তিনি কূটনীতি ও যোগাযোগকে প্রাধান্য দিতেন। স্লাভিন বলেন, ‘তিনি এমন এক ব্যক্তি ছিলেন, যার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কথা বলতে পারত এবং অতীতে কথা বলেছেও।’ তবে ঐকমত্যের রাজনীতির পাশাপাশি তিনি তীব্র ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য ও পদক্ষেপেও সক্ষম ছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল আগ্রাসন শুরু করার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, ‘সাবধান থাকুন, নইলে আপনাদেরই বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া লাগতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, হরমুজ প্রণালি যুদ্ধবাজদের জন্য ‘পরাজয় ও দুর্ভোগের প্রণালি’ হয়ে উঠবে।

৬৭ বছর বয়সে লারিজানি ইরানি শাসনব্যবস্থার দৃশ্যমান প্রতীক ও ধারাবাহিকতার মুখ হয়ে উঠেছিলেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই তিনি ইসরায়েলের প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিলেন। তবু গত সপ্তাহে তেহরানে এক জনসমাবেশেও অংশ নেন।

সংঘাতের প্রথম দুই সপ্তাহে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে কটাক্ষ করা ছাড়াও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের মুসলমানদের উদ্দেশে সতর্ক করে বলেন, ‘তোমরা জানো, আমেরিকার তোমাদের প্রতি কোনো আনুগত্য নেই, আর ইসরায়েল তোমাদের শত্রু। এক মুহূর্ত থামো এবং নিজেদের ও অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাব।’

বিশ্লেষকদের মতে, লারিজানির মৃত্যু ইরানি নেতৃত্বকে তাদের অন্যতম বিচক্ষণ ও প্রভাবশালী কণ্ঠের পরামর্শ ও নির্দেশনা থেকে বঞ্চিত করবে এবং যুদ্ধ শেষের আলোচনাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। অনেক পর্যবেক্ষকের কাছে, আলী খামেনির মৃত্যুর পরের দিনগুলোতে সাম্প্রতিক অস্থিরতার মধ্যে লারিজানিই কার্যত ইরানের নেতা হয়ে উঠেছিলেন।

জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের ভিজিটিং ফেলো হামিদরেজা আজিজির মতে, তিনি ছিলেন ‘প্রকৃত ইনসাইডার, যিনি দশকের পর দশক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন এবং যার ফলে অভিজাত মহলের বিভিন্ন অংশে তার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছিল।’ আজিজি বলেন, ‘ইসলামিক রিপাবলিক এমনভাবে গঠিত যে ব্যক্তির ক্ষতি সত্ত্বেও এটি টিকে থাকতে পারে, কিন্তু এত বহুমুখী অভিজ্ঞতার মানুষ সহজে প্রতিস্থাপনযোগ্য নয়।’

গত বছরের জুনে এবং সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় ইসরায়েলি হামলায় বহু অভিজ্ঞ ইরানি কমান্ডার ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান লারিজানির ক্ষতি ভিন্ন মাত্রার। তিনি সব সময় লক্ষ্যবস্তু ছিলেন না। পরিকল্পনা ও আলোচনার সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্র সিএনএনকে জানায়, গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য অন্তর্বর্তী নেতৃত্বের প্রার্থী ছিলেন।

কিন্তু ইরানে বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থান নেওয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেওয়া এবং সামরিক কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়ার পর ফেব্রুয়ারির শুরুতে ইসরায়েল তাকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। আজিজির মতে, তাঁর মৃত্যু যুদ্ধ পরিচালনায় তাৎক্ষণিক বড় প্রভাব ফেলবে না, কিন্তু রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা আরও জটিল হয়ে উঠবে। কারণ, রাজনৈতিক বার্তা নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগে তার দক্ষতা ছিল অসাধারণ।

সংঘাত শুরুর পর থেকে কার্যত পাশে ঠেলে রাখা মধ্যপন্থী প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান অভিজাতদের একত্র করে যুদ্ধবিরতির আলোচনা এগিয়ে নিতে পারবেন না বলে মনে করেন আজিজি। সম্ভাব্য কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে লারিজানির মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বই প্রয়োজন ছিল।

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনকে প্রশংসা করে বলেছে, তিনি ‘জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত’ ইরানের অগ্রগতির জন্য কাজ করেছেন এবং বহিরাগত হুমকির মুখে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন। আজিজি বলেন, ‘ইসলামিক রিপাবলিকে এ ধরনের কর্মজীবন তুলনামূলকভাবে বিরল। তার জীবনবৃত্তান্তে একমাত্র অনুপস্থিত পদ ছিল রাষ্ট্রপতির।’

লারিজানি ছিলেন ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পরিবর্তনশীল রাজনীতির দক্ষ নাবিক। একইসঙ্গে ‘বাস্তববাদী রক্ষণশীল’, যিনি বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করতে পারতেন এবং রাষ্ট্রের প্রতি সম্পূর্ণ অনুগত। একুশ শতকের প্রথম দশকে তিনি ইরানের প্রধান পারমাণবিক আলোচক ছিলেন। পশ্চিমা কূটনীতিকেরা তাঁকে পরিশীলিত ও বুদ্ধিমান হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ২০০৪ সালে নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা হওয়ার পর তিনি খামেনির আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন।

২০২০ সাল পর্যন্ত টানা ১২ বছর তিনি পার্লামেন্টের স্পিকার ছিলেন, যা তাঁর ক্ষমতার ভিত্তি আরও বিস্তৃত করে। ২০১৫ সালে সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ওবামা প্রশাসনের সঙ্গে হওয়া পারমাণবিক চুক্তির প্রশংসা করেন। মার্কিন ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিনিময়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করেছিল। তিনি এটিকে ‘অন্যান্য বিষয় বোঝাপড়ার সূচনা’ বলে উল্লেখ করেন।

গত বছরের ইসরায়েল সংঘাতের পর তিনি জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান হিসেবে আবারও প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন এবং বহু বিশ্লেষকের মতে, দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তিতে পরিণত হন। তিনি ইরানের প্রধান আন্তর্জাতিক মুখপাত্রও হয়ে ওঠেন। এমনকি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির চেয়েও বেশি সক্রিয়। তিনি মস্কো, বৈরুত, আবুধাবি ও ওমানে সফর করেন। জানুয়ারির শেষে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং ওমান সফরের পর পারমাণবিক চুক্তির জন্য ইরানের শর্ত তুলে ধরেন।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে ইরানের অবস্থান তিনি জোরালো ভাষায় তুলে ধরছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র অভিযান শুরু করার পর তিনি এক্সে লিখেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের মতো নয়, ইরান দীর্ঘ যুদ্ধের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছে।’

লারিজানির মৃত্যু এই যুদ্ধকে আরও দীর্ঘ করতে পারে। গত সোমবার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, ৭১ বছর বয়সী সাবেক আইআরজিসি কমান্ডার মোহসেন রেজায়ী অবসর ভেঙে নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির জ্যেষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টা হয়েছেন। আজিজির মতে, এতে বোঝা যায় নেতৃত্ব ক্রমেই ইরাক যুদ্ধের প্রজন্মের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে এবং আরও সামরিকীকৃত হচ্ছে—লারিজানির বাস্তববাদী ভারসাম্য ছাড়া।

একই ধরনের আশঙ্কা পোষণ করেন কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা ত্রিতা পার্সি। তিনি মনে করেন, ‘আলী লারিজানিকে হত্যার চেষ্টার পেছনে তিনটি সম্ভাব্য উদ্দেশ্য দেখা যাচ্ছে।’

সেগুলো হলো—১. ট্রাম্পের সম্ভাব্য সমঝোতার পথগুলো বন্ধ করে দেওয়া ২. শাসনব্যবস্থার শীর্ষ নেতৃত্ব নির্মূলের (Regime Decapitation) কৌশলে ফেরা এবং ৩. সুযোগের সদ্ব্যবহার।

লারিজানি কেবল বর্তমান শাসনব্যবস্থার একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা প্রধান ঐকমত্য স্থাপনকারীই ছিলেন না, বরং তিনি এমন একজন মানুষ ছিলেন যিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনার পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি ইরানি ব্যবস্থার ভেতর থেকে একটি ‘অফ-র‍্যাম্প’ বা সংঘাত থেকে সরে আসার পথ তৈরির ক্ষমতা রাখতেন। এ ছাড়া তিনি পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে উত্তেজনা হ্রাসের পক্ষে ছিলেন এবং এ বিষয়ে পেজেশকিয়ানের বার্তাকে সমর্থন করেছিলেন। সংঘাত এড়াতে ডিসেম্বরে ট্রাম্পের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার চেষ্টাও লারিজানি করেছিলেন।

ত্রিতা পার্সির ভাষায়, ‘ইসরায়েল চায় এই সংঘাত চলুক, যাতে ইরানের সামরিক সক্ষমতা আরও কমিয়ে দিয়ে আগামী কয়েক বছরের জন্য আঞ্চলিক ভারসাম্য ইসরায়েলের পক্ষে রাখা যায়।’ তিনি বলেন, ‘গত দুই দশক ধরে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ সংঘাতে জড়ানোর চেষ্টা করেছে এবং অবশেষে সেই লক্ষ্য অর্জিত হওয়ার পর তারা চায় না ট্রাম্প এই সংঘাত সংক্ষিপ্ত করুক। লারিজানির মতো ব্যক্তিত্ব ইরানের সিস্টেমে না থাকলে ট্রাম্পের পক্ষে সংঘাত থামানোর পথগুলো আরও সংকীর্ণ হয়ে পড়বে।’

যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের কৌশল হয়তো আবারও শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়ার দিকে মোড় নিচ্ছে। এর কারণ হলো, সামরিকভাবে ‘হরমুজ প্রণালি’ পুনরায় উন্মুক্ত করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে এবং ট্রাম্পকে সমর্থন করার মতো কোনো আন্তর্জাতিক জোটও নেই। কিন্তু ট্রাম্পের দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রণালি খুলে দেওয়া জরুরি। কারণ, জ্বালানি বাজারের ওপর এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাস ও খাদ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে, যা ট্রাম্পের নিজের সমর্থকদেরই এই সংঘাতের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলতে পারে। যদি তিনি সামরিকভাবে এটি খুলতে না পারেন, তবে শাসনব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ ভাঙন ঘটানো অন্য একটি পথ হতে পারে।

এই বিষয়ে ত্রিতা পার্সি বলেন, ‘এই প্রেক্ষাপটে লারিজানিকে হত্যা করাকে দ্বিতীয়বার সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখা হতে পারে। প্রথম চেষ্টাটি ছিল খামেনিকে হত্যা করা, যা সফল হয়নি। তবে চিন্তাটি এমন হতে পারে যে, আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে হত্যা করলে হয়তো কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া যাবে।’

তৃতীয় যে পয়েন্টটি পার্সি তুল ধরেন সেটি হলো—কোনো কৌশলগত পরিবর্তন বা ট্রাম্পের সমঝোতার পথ বন্ধ করার উদ্দেশ্য ছাড়াও, স্রেফ সুযোগ পাওয়ার কারণেই হয়তো এই গুপ্তহত্যার চেষ্টা চালানো হয়েছে।

তবে পার্সি মনে করেন, ‘যা-ই হোক না কেন, এটি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য কৌশলগত ধাক্কা হলেও তেহরানের সংঘাত পরিচালনার ক্ষেত্রে এর ব্যাপক প্রভাব পড়বে বলে মনে হয় না। জুনের সংঘাতের সময় এই ধরনের পরিস্থিতির জন্য পরিকল্পনা তৈরি করে রাখা হয়েছিল। অধিকন্তু যখনই ইসরায়েলের হাতে ইরানের তুলনামূলক মধ্যপন্থী কণ্ঠস্বরগুলো প্রাণ হারিয়েছে, তখন তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে আরও কট্টরপন্থী তরুণ প্রজন্ম। এই নতুন প্রজন্ম ইরানের কৌশলগত ধৈর্য নীতির বিরোধী, তারা জুনের সংঘাতবিরতির বিরোধী ছিল এবং বর্তমানেও তারা যেকোনো ধরনের উত্তেজনা হ্রাস বা সংঘাতবিরতির বিপক্ষে।’

ইসরায়েলের উদ্দেশ্য যা-ই হোক না কেন, এর সবচেয়ে সম্ভাব্য ফলাফল হলো ট্রাম্পের জন্য সম্ভাব্য সব সমঝোতার পথ ধ্বংস হয়ে যাওয়া। অর্থাৎ একটা দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত শুরু হওয়া।

তবে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলেও টিকে যাবে ইসলামি প্রজাতন্ত্র। লারিজানির বহুমুখী অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অবশ্যই শূন্যতা তৈরি করবে, তবে তাঁর মৃত্যু ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য প্রাণঘাতী নয়। সিনা তুসি বলেন, ‘এটি শাসনব্যবস্থার অস্তিত্বকে মৌলিকভাবে হুমকির মুখে ফেলে না। ইসলামি প্রজাতন্ত্র একটি বহুস্তরবিশিষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যা এ ধরনের ক্ষতি সামাল দেওয়ার জন্যই গড়ে তোলা।’

তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে লারিজানিকে কার্যত ইরানের অঘোষিত নেতা বলা হলেও তিনি এই ধারণা মানেন না। তাঁর মতে, দেশটি এভাবে পরিচালিত হয় না। সিদ্ধান্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বণ্টিত থাকে, যেখানে সর্বোচ্চ নেতা শীর্ষে এবং প্রেসিডেন্ট, আইআরজিসি ও অন্যান্য সংস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

সিনা তুসির ভাষায়, ‘লারিজানি প্রভাবশালী ছিলেন, কিন্তু তিনি পুরো ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু নন, বরং বৃহত্তর কাঠামোর একটি অংশ মাত্র। ইরানের মতো ব্যবস্থায় শীর্ষ নেতৃত্ব নির্মূলীকরণ ধরনের হামলা সাধারণত নির্ধারক রাজনৈতিক ফল দেয় না। এতে ব্যক্তিকে সরানো হয়, কখনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকেও, কিন্তু মৌলিক কাঠামো ও কৌশলগত যুক্তি অক্ষুণ্ন থাকে।’

লারিজানির উপনিরাপত্তাপ্রধান সাঈদ জালিলিকে তাঁর সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আয়ার বলেন, এমন হলে তা হবে ‘ইরানি শাসনব্যবস্থার আরও কঠোরপন্থী হয়ে ওঠার আরেকটি ধাপ।’ তিনি বলেন, ‘কিছু দুর্বলতা হয়তো তৈরি হবেই। কারণ, তাঁর উত্তরসূরি কম দক্ষ হতে পারেন। কিন্তু বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই কঠোরপন্থী হয়ে ওঠা।’

খবরে বলা হয়, লারিজানি সাবেক সংস্কারপন্থী প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সঙ্গে মিলে বর্তমান আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচন স্থগিত করার চেষ্টা করছিলেন এবং বিকল্প প্রার্থী খুঁজছিলেন। শেষ পর্যন্ত সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং মোজতবা নির্বাচিত হন। তাঁকে নীতিবাদী হিসেবে দেখা হয়, যার নেতৃত্বে আইআরজিসির ভূমিকা আরও শক্তিশালী হতে পারে।

আয়ার বলেন, লারিজানির মৃত্যুর পর কোন ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে তা নয়, বরং কোন প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হবে, সেটাই আসল প্রশ্ন। তিনি বলেন, ‘তাঁর মৃত্যু ইরান পরিচালনাকারী দুটি প্রধান প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব বাড়িয়েছে: আইআরজিসি এবং বাইত-ই রাহবারি।’ দ্বিতীয়টি সর্বোচ্চ নেতার দপ্তরকে বোঝায়।

এখন বিষয় হলো ইসরায়েল তথাকথিত ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ইরানি নেতাদের হত্যা চালিয়ে যেতে পারে, কিন্তু তাঁদের জায়গায় সম্ভবত আরও তরুণ ও কঠোরপন্থী ব্যক্তিরাই আসবেন। স্লাভিন বলেন, এবং ইসরায়েলের এসব হত্যাকাণ্ড সম্ভবত কূটনৈতিক সমাধানের পথ তৈরির চেয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যেই বেশি পরিচালিত হচ্ছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘ইসরায়েল কি পশ্চিমের সঙ্গে আলোচনা করতে পারে এমন ইরানি শাসনের সম্ভাব্য প্রত্যেক ব্যক্তিকেই হত্যা করে যেতে থাকবে?’

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, মিডল ইস্ট আই ও সিএনএন

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত