Ajker Patrika

মিডল ইস্ট আই–এর নিবন্ধ /মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি: সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তানের একত্র হওয়ার নেপথ্য কৌশল

“সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরক্ষা জোট সেই জোট নয়, যা কোনো রাষ্ট্রকে চিরদিনের জন্য মিত্রদের ওপর নির্ভরশীল করে রাখে। বরং সবচেয়ে কার্যকর জোট হলো সেটি, যা একটি রাষ্ট্রকে নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজের শক্তিতে আরও বেশি নিতে সক্ষম করে”

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২০ আগস্ট ২০২৬, ১৬: ৩৩
মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি: সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তানের একত্র হওয়ার নেপথ্য কৌশল
পবিত্র নগরী মক্কায় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ছবি: বিবিসি

চলতি মাসে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর কোনো নির্দিষ্ট ও তাৎক্ষণিক হুমকির জবাবে রিয়াদের নেওয়া পদক্ষেপ ছিল না, যেমনটা অনেকে মনে করছেন। গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, এই চুক্তির পেছনে তিন দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থের মিল তৈরি হয়েছে। তিন দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, শক্তির উৎস এবং তাৎক্ষণিক হুমকি ও চ্যালেঞ্জ একে অপরের থেকে আলাদা।

তবু তিন দেশই ক্রমবর্ধমানভাবে উপলব্ধি করছে যে, যে নিরাপত্তাব্যবস্থা কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়াকে পরিচালনা করেছে, সেটি এখন আর আগের মতো নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। মক্কায় এই চুক্তিতে একসঙ্গে এসেছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি। সৌদি আরবের রয়েছে ধর্মীয়, অর্থনৈতিক, জ্বালানি ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব। তুরস্কের রয়েছে সামরিক শক্তি, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প এবং এমন একটি ভৌগোলিক অবস্থান, যা মধ্যপ্রাচ্যকে ইউরোপ, কৃষ্ণসাগর ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের রয়েছে বিজ্ঞান ও গবেষণার সক্ষমতা, সামরিক শক্তি, পারমাণবিক অস্ত্র এবং দক্ষিণ এশিয়ায় কৌশলগত গভীরতা।

তাই এই চুক্তিকে শুধু তিন দেশের মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা সমঝোতা হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যাবে না। বরং এটিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা-ভাবনায় একটি পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখা উচিত। আগে যেখানে একটি মাত্র বাইরের শক্তির নিরাপত্তা-ছাতার ওপর নির্ভরতার প্রবণতা ছিল, এখন সেখানে ঝুঁকি ভাগাভাগি এবং প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আঞ্চলিক অংশীদারদের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।

চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এটি বড় সামরিক জোটগুলোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কাছাকাছি একটি কাঠামো। তবে তিন দেশই জোর দিয়ে বলেছে, চুক্তিটি প্রতিরক্ষামূলক এবং কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে করা হয়নি।

এখানেই চুক্তিটির আসল গুরুত্ব। প্রশ্নটা তাই শুধু এই নয় যে, তিন দেশ কাকে প্রতিহত করতে চায়। বরং বড় প্রশ্ন হলো, এই নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সময়ে কেন প্রত্যেক দেশকে অন্য দুই দেশের প্রয়োজন হলো?

সৌদি আরবের প্রভাব

স্বাভাবিকভাবেই এই চুক্তি নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উঠে আসছে সৌদি আরবের নাম। কিন্তু সৌদি আরবের নিরাপত্তাকে শুধু একটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে ভুল হবে। সৌদি আরব এমন একটি অত্যন্ত জটিল কৌশলগত পরিবেশের কেন্দ্রে অবস্থান করছে, যেখানে একাধিক আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শক্তি এবং তাদের বিভিন্ন প্রকল্পের সংঘাত ও প্রতিযোগিতা চলছে।

তাই সৌদি নিরাপত্তা শুধু দেশের সীমান্ত রক্ষার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব প্রণালি, জ্বালানি পরিবহনপথ, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, আকাশসীমা, সাইবার নিরাপত্তা, সরবরাহব্যবস্থা, বড় অর্থনৈতিক প্রকল্প এবং আরও অনেক কিছু।

এই বাস্তবতায় তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতার আলাদা কৌশলগত মূল্য রয়েছে।

তুরস্ক সৌদি আরবকে দিতে পারে অত্যাধুনিক সামরিক, শিল্প ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা। পাকিস্তান দিতে পারে সামরিক গভীরতা, যুদ্ধ পরিচালনার অভিজ্ঞতা এবং সৌদি রাজপরিবারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক। অন্যদিকে সৌদি আরবের রয়েছে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রভাব, বিপুল অর্থনৈতিক সম্পদ এবং প্রতিরক্ষা শিল্প, বাজার, জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের সক্ষমতা।

এই পারস্পরিক সক্ষমতার মিলই মক্কা চুক্তি বোঝার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি। চুক্তিটি কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে করা হয়নি, সৌদি আরবের এই সরকারি অবস্থানকে আরও জোরালো করে তুলছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি-ইরান সম্পর্কের উষ্ণতা বৃদ্ধি। দুই দেশ উত্তেজনা কমানোর এবং যোগাযোগের পথ খোলা রাখার চেষ্টা করেছে। তাই রিয়াদের জন্য মক্কা চুক্তিকে ইরানের সঙ্গে নতুন করে সংঘাত শুরু করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা কৌশলগতভাবে ভুল হবে।

এর চেয়ে যৌক্তিক ব্যাখ্যা হলো, সৌদি আরব সব আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিকে একটি বার্তা দিতে চাইছে—সৌদি আরবকে আক্রমণ করার মূল্য এখন আর শুধু সৌদি আরবের নিজস্ব শক্তি দিয়ে হিসাব করা যাবে না। এর সঙ্গে হিসাব করতে হবে আরও বিস্তৃত সক্ষমতা ও মিত্রতার একটি নেটওয়ার্ক। এটাই প্রতিরোধক্ষমতার মূল কথা। প্রতিরোধক্ষমতা মানে কোনো রাষ্ট্র যুদ্ধ চায়, এমন নয়। বরং এর অর্থ হলো, যুদ্ধের সম্ভাব্য খরচ এত বেশি করে তোলা, যাতে কোনো প্রতিপক্ষ হামলা চালানোর আগে বহুবার চিন্তা করতে বাধ্য হয়।

তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতি

প্রশ্ন উঠতে পারে, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রয়োজন কেন? তুরস্ক তো ন্যাটোর সদস্য এবং জোটটির অন্যতম বৃহৎ সামরিক শক্তি। একই সঙ্গে দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্পও দ্রুত উন্নত হয়েছে। এর উত্তর হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুরস্ক নিজের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে ক্রমেই বেশি স্বাধীন হয়ে উঠেছে। আঙ্কারা এখন তার আশপাশের অঞ্চলগুলোকে সরাসরি নিজের নিরাপত্তা-স্বার্থের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করছে। এর মধ্যে রয়েছে সিরিয়া, ইরাক, লেবানন, লিবিয়া, পূর্ব ভূমধ্যসাগর, কৃষ্ণসাগর, ককেশাস, রাশিয়া, ইরান ও ইউরোপ।

একই সময়ে সিরিয়ায় তুরস্কের ভূমিকা এবং বিশেষ করে গাজা যুদ্ধের ক্ষেত্রে ইসরায়েলের নীতির বিরুদ্ধে আঙ্কারার সমালোচনা তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। এই অঞ্চলের সাম্প্রতিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হলো, তুরস্ক ও ইসরায়েলের সম্পর্ক এখন আর শুধু ফিলিস্তিন প্রশ্নে রাজনৈতিক মতবিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দুই দেশের বিরোধ দ্রুত সিরিয়া ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরকে কেন্দ্র করে একাধিক কৌশলগত সংঘাতে রূপ নিয়েছে।

অন্যদিকে ইসরায়েল গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে তার নিরাপত্তা ও সামরিক সম্পর্ক আরও গভীর করেছে। গত ডিসেম্বরে তিন দেশ তাদের দশম ত্রিপক্ষীয় শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করে। গ্রিস, ইসরায়েল ও সাইপ্রাস সামরিক সহযোগিতার বিভিন্ন কর্মসূচিও গড়ে তুলেছে, যার মধ্যে যৌথ সামরিক মহড়াও রয়েছে। তুরস্কের দৃষ্টিকোণ থেকে তাই এই বাস্তবতা উপেক্ষা করা কঠিন যে, ইসরায়েল, গ্রিস ও সাইপ্রাস এমন একটি সামরিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতার নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, যে অঞ্চলে তাদের স্বার্থ তুরস্কের স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে জড়িত।

এটি সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে অংশীদারত্ব থেকে তুরস্কের সম্ভাব্য লাভের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণও ব্যাখ্যা করে। তুরস্ক চায় না তার কৌশলগত সক্ষমতা শুধু যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং ন্যাটোর সঙ্গে সম্পর্কের কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকুক। বরং আঙ্কারা আরও বিস্তৃত একটি অংশীদারত্বের নেটওয়ার্ক তৈরি করতে চায়, যাতে কোনো একটি শক্তি বা শক্তির অক্ষ থেকে চাপ এলে তুরস্কের দুর্বলতা কম থাকে। অর্থাৎ, মক্কা চুক্তির গভীর তাৎপর্য শুধু তিন দেশের পারস্পরিক সামরিক সহযোগিতায় নয়। এর মধ্য দিয়ে এমন একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থার ধারণা সামনে আসছে, যেখানে কোনো একক বহিরাগত শক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতার বদলে **নিজস্ব সক্ষমতা, আঞ্চলিক অংশীদারত্ব এবং পারস্পরিক প্রতিরোধক্ষমতার ওপর বেশি জোর দেওয়া হবে।

পাকিস্তানের হিসাব-নিকাশ

বিভিন্ন বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে এই চুক্তি হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সামরিক সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ এবং প্রতিরক্ষা সম্পর্কের একটি শক্ত ভিত্তি। ফলে এই সমীকরণে তুরস্কের প্রবেশও নতুন কোনো সম্পর্কের সূচনা নয়; বরং কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা একটি বিদ্যমান নেটওয়ার্কের ওপরই তা দাঁড়াচ্ছে।

পাকিস্তানের দিক থেকে দেখলে, এই চুক্তিতে ইসলামাবাদের অংশগ্রহণকে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা বড় ভুল হবে। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দেশটির নিরাপত্তা ভারতের সঙ্গে সংঘাতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত থাকলেও কাশ্মীর ইস্যু, সীমান্ত বিরোধ এবং দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের সামরিক প্রতিযোগিতা তাদের কৌশলগত হিসাব-নিকাশকে প্রভাবিত করে চলেছে।

গত বছর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিপজ্জনক উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। পরিস্থিতি সামরিক প্রস্তুতি ও সরাসরি সংঘাত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। তাই আঙ্কারা ও রিয়াদের সঙ্গে এই চুক্তিকে ইসলামাবাদ শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলের দৃষ্টিতে দেখছে না। বরং তারা এটিকে আরও বড় একটি প্রশ্নের অংশ হিসেবে দেখছে: একাধিক দিক থেকে আসা নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে পাকিস্তান কীভাবে কৌশলগত অংশীদারত্বের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারে?

এটি সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে অংশীদারত্ব থেকে তুরস্কের সম্ভাব্য লাভের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণও ব্যাখ্যা করে। তুরস্ক চায় না তার কৌশলগত সক্ষমতা শুধু যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং ন্যাটোর সঙ্গে সম্পর্কের কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকুক। বরং আঙ্কারা আরও বিস্তৃত একটি অংশীদারত্বের নেটওয়ার্ক তৈরি করতে চায়, যাতে কোনো একটি শক্তি বা শক্তির অক্ষ থেকে চাপ এলে তুরস্কের দুর্বলতা কম থাকে। অর্থাৎ, মক্কা চুক্তির গভীর তাৎপর্য শুধু তিন দেশের পারস্পরিক সামরিক সহযোগিতায় নয়। এর মধ্য দিয়ে এমন একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থার ধারণা সামনে আসছে, যেখানে কোনো একক বহিরাগত শক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতার বদলে **নিজস্ব সক্ষমতা, আঞ্চলিক অংশীদারত্ব এবং পারস্পরিক প্রতিরোধক্ষমতার ওপর বেশি জোর দেওয়া হবে।

পাকিস্তানের হিসাব-নিকাশ

বিভিন্ন বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট হয়েছে যে, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে এই চুক্তি হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সামরিক সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ এবং প্রতিরক্ষা সম্পর্কের একটি শক্ত ভিত্তি। ফলে এই সমীকরণে তুরস্কের প্রবেশও নতুন কোনো সম্পর্কের সূচনা নয়; বরং কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা একটি বিদ্যমান নেটওয়ার্কের ওপরই তা দাঁড়াচ্ছে।

পাকিস্তানের দিক থেকে দেখলে, এই চুক্তিতে ইসলামাবাদের অংশগ্রহণকে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা বড় ভুল হবে। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দেশটির নিরাপত্তা ভারতের সঙ্গে সংঘাতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত থাকলেও কাশ্মীর ইস্যু, সীমান্ত বিরোধ এবং দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের সামরিক প্রতিযোগিতা তাদের কৌশলগত হিসাব-নিকাশকে প্রভাবিত করে চলেছে।

গত বছর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিপজ্জনক উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। পরিস্থিতি সামরিক প্রস্তুতি ও সরাসরি সংঘাত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। তাই আঙ্কারা ও রিয়াদের সঙ্গে এই চুক্তিকে ইসলামাবাদ শুধু উপসাগরীয় অঞ্চলের দৃষ্টিতে দেখছে না। বরং তারা এটিকে আরও বড় একটি প্রশ্নের অংশ হিসেবে দেখছে: একাধিক দিক থেকে আসা নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে পাকিস্তান কীভাবে কৌশলগত অংশীদারত্বের একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারে?

এই দৃষ্টিকোণ থেকে রিয়াদ পাকিস্তানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে ওঠে। সৌদি আরব শুধু একটি উপসাগরীয় বা আরব দেশ নয়; এটি একই সঙ্গে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে একটি অর্থনৈতিক, জ্বালানি, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কেন্দ্র।

অন্যদিকে তুরস্কের আছে উল্লেখযোগ্য সামরিক ও শিল্প সক্ষমতা। মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে তুরস্কের বিস্তৃত সম্পর্ক রয়েছে, পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও তার গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে তিন দেশের এই সম্পর্ক পাকিস্তানকে আরও বিস্তৃত একটি কৌশলগত পরিসর তৈরি করে দেয়। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে জোর দিয়ে বলা দরকার। সৌদি আরব কোনো ‘বিদেশি সেনাবাহিনী’ চাইছে না। বরং তারা নিজেদের হাতে থাকা শক্তির উৎসগুলোকে আরও বৈচিত্র্যময় করতে চাইছে। এই চুক্তিকে সৌদি আরব নিজেদের রক্ষা করতে অক্ষম, এমন প্রমাণ হিসেবে দেখা গুরুতর ভুল হবে। গত কয়েক দশকে সৌদি আরব তার সশস্ত্র বাহিনী, বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং বিমান ও নৌবাহিনী গড়ে তুলতে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে।

তবে আধুনিক সামরিক শক্তি শুধু অস্ত্র কেনার বিষয় নয়। এর মধ্যে রয়েছে প্রশিক্ষণ, সামরিক অভিযান পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা, গোয়েন্দা সক্ষমতা, কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, স্যাটেলাইট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, অস্ত্র উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সময় সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা।

এই কারণেই তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে অংশীদারত্ব সৌদি আরবের জন্য শুধু সম্ভাব্য আগ্রাসনের সময় মূল্যবান হবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে আরও স্বাধীন জাতীয় প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ হবে। সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরক্ষা জোট সেই জোট নয়, যা একটি রাষ্ট্রকে চিরকাল তার মিত্রদের ওপর নির্ভরশীল করে রাখে। বরং সেরা প্রতিরক্ষা জোট হলো সেটি, যা একটি রাষ্ট্রকে নিজের শক্তির ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে সক্ষম করে।

বিশাল নেটওয়ার্ক

ভৌগোলিক অবস্থান মক্কা চুক্তিকে এমন একটি গুরুত্ব দিয়েছে, যা প্রচলিত জোটগুলোর সব সময় থাকে না। তুরস্ক এই অঞ্চলের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত এবং ইউরোপ, কৃষ্ণসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের সীমানায় রয়েছে। সৌদি আরব রয়েছে এই অঞ্চলের কেন্দ্রস্থলে, উপসাগর ও লোহিত সাগরের মাঝামাঝি। আর পাকিস্তান রয়েছে ইরানের পূর্বে, ভারত ও মধ্য এশিয়ার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এবং আরব সাগরের তীরে।

ফলে এই তিন দেশ মিলে আনাতোলিয়া থেকে আরব উপদ্বীপ হয়ে দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত একটি বিশাল ত্রিভুজ তৈরি করে। এই ভৌগোলিক বিস্তার মক্কা চুক্তিকে শুধু নিজ নিজ দেশের সীমান্ত রক্ষার চুক্তির চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। এটি তিনটি কৌশলগত অঞ্চলকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করছে: পূর্ব ভূমধ্যসাগর, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং ভারত মহাসাগর।

এই অঞ্চলগুলো এরই মধ্যে জ্বালানি, বাণিজ্য ও সমুদ্রপথের মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। ফলে তুরস্কের নিরাপত্তা পুরোপুরি সৌদি আরবের নিরাপত্তা থেকে আলাদা নয়। একইভাবে সৌদি আরবের নিরাপত্তাও পাকিস্তানের নিরাপত্তা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন নয়। এটি মূলত পারস্পরিক স্বার্থের একটি নেটওয়ার্ক।

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানকে সম্মিলিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার অন্যতম কারণ হলো, তিন দেশই কৌশলগত সামুদ্রিক অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত। তুরস্ক কৃষ্ণসাগরকে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা প্রণালিগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। সৌদি আরবের অবস্থান লোহিত সাগর ও উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর। আর পাকিস্তান আরব সাগর ও ভারত মহাসাগরের দিকে মুখ করে রয়েছে।

এ কারণে সামুদ্রিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং নৌযান চলাচলের নিরাপত্তা এই তিন দেশের মধ্যে সহযোগিতার স্বাভাবিক ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে বাব আল-মান্দেব ও হরমুজ প্রণালিতে যে ধরনের অস্থিতিশীলতা ও বিঘ্ন দেখা গেছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনপথ সুরক্ষিত রাখা কৌশলগত সামুদ্রিক অবস্থানসম্পন্ন প্রতিটি দেশের জাতীয় নিরাপত্তার অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে।

ফলে ভবিষ্যতে মক্কা চুক্তি সামুদ্রিক নজরদারি, ড্রোন মোকাবিলা, নৌযান চলাচলের নিরাপত্তা, বন্দরের সাইবার নিরাপত্তা, নৌ গোয়েন্দা সহযোগিতা, সমুদ্রের মাইন শনাক্ত ও অপসারণ, উপকূলীয় অবকাঠামোর সুরক্ষা এবং অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রমের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতায় রূপ নিতে পারে। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের সময় শুধু সেনা মোতায়েনের চেয়ে এসব ক্ষেত্রের সহযোগিতাই হয়তো আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রতিরক্ষা শিল্প। তুরস্ক বর্তমানে ড্রোন, মানববিহীন ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধজাহাজ, সাঁজোয়া যান এবং সামরিক ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম উৎপাদনে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় দেশ হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানেরও সামরিক শিল্পে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং দেশটির রয়েছে ব্যাপক বাস্তব সামরিক অভিযান পরিচালনার দক্ষতা।

অন্যদিকে সৌদি আরব সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। দেশটির রয়েছে বিপুল মূলধন, একটি বড় বাজার এবং নিজেদের প্রতিরক্ষা উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য অংশ দেশে তৈরি বা স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের প্রয়োজনীয়তা।

প্রতিরক্ষা একীভূতকরণ

এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। মক্কা চুক্তি শুধু একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত প্রতিরক্ষা একীভূতকরণের কাঠামোতে পরিণত হতে পারে। এমনটা হলে এর ফল শুধু সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি এমন একটি আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা শিল্পভিত্তি তৈরি করতে পারে, যা অস্ত্রের বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বে, এমনকি শেষ পর্যন্ত সারা বিশ্বের অস্ত্রবাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

চুক্তিটির সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়গুলোর একটি হলো পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে এই চুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সৌদি আরব বা তুরস্ককে কোনো পারমাণবিক ছাতার আওতায় নিয়ে এসেছে। একইভাবে পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্রও আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তির অংশ হয়ে যায়নি।

তবে যেকোনো প্রতিরক্ষা জোটে একটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্রের উপস্থিতি শত্রুপক্ষের প্রতিরোধ ও যুদ্ধের হিসাব-নিকাশ বদলে দেয়। সম্ভাব্য কোনো প্রতিপক্ষ শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন করা সামরিক বাহিনীর দিকে তাকায় না; সেই জোটের পেছনে থাকা কৌশলগত শক্তি ও গভীরতাও বিবেচনা করে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, চুক্তিতে পাকিস্তানের উপস্থিতিই বড় ধরনের যুদ্ধের কথা ভাবছে এমন কোনো শত্রু শক্তির জন্য ঝুঁকি ও হিসাবের মাত্রা অনেক বাড়িয়ে দেয়। তবে এটাও ভুল হবে যে, এই চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান তাদের আগের সব সম্পর্ক ও জোট ত্যাগ করছে।

সৌদি আরব এখনও গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি), আরব লীগ এবং ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গেও দেশটির বিস্তৃত সম্পর্ক রয়েছে। তুরস্ক ন্যাটো এবং ওআইসির সদস্য। পাকিস্তানও ওআইসির সদস্য এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিমা দেশ ও চীনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের, জটিল ও বহুমাত্রিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলছে। তাই মক্কা চুক্তিকে পুরোনো সম্পর্ক ও জোট পরিত্যাগ হিসেবে না দেখে বরং বিকল্প বাড়ানোর একটি কৌশল হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।

আজকের বিশ্বে এই নীতি ক্রমেই সাধারণ হয়ে উঠছে। রাষ্ট্রগুলো সবসময় ওয়াশিংটন, বেইজিং কিংবা মস্কোর মধ্যে একটিকে বেছে নিতে চায় না। তারা তিন পক্ষের সঙ্গেই সম্পর্ক রাখতে চায়। এই নীতিকে বলা যায় ‘কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা।’ অর্থাৎ, একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা, যাতে কোনো একটি শক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়তে না হয়।

আসল পরীক্ষা

আগের বিভিন্ন জোটের তুলনায় মক্কা চুক্তির সবচেয়ে আলাদা বৈশিষ্ট্য হলো, তিনটি দেশের মধ্যে অত্যন্ত বেশি মিল থাকার কারণে এই জোট তৈরি হয়নি। বরং তাদের পার্থক্যগুলো একে অপরের পরিপূরক হওয়ায় এই সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি হয়েছে। প্রতিটি দেশের নিজস্ব হিসাব, স্বার্থ এবং ইরান, ভারত, ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ভিন্ন ধরনের সম্পর্ক রয়েছে। তারপরও সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান মনে করেছে, তাদের স্বার্থের মধ্যে যথেষ্ট মিল রয়েছে এবং সেই অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করা সম্ভব।

এটিই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে জোট গড়তে হলে সব বিষয়ে একমত হওয়ার প্রয়োজন নেই। শুধু এটুকু সিদ্ধান্তে পৌঁছানোই যথেষ্ট যে, কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করা একা কাজ করার চেয়ে তাদের স্বার্থের জন্য বেশি লাভজনক। তবে চুক্তিটি বাস্তবে কার্যকর হওয়ার পরই শুরু হবে আসল পরীক্ষা। কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের দিন শক্তিশালী বলেই মনে হয়। কিন্তু ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, কাগজে লেখা চুক্তি নিজে থেকে শক্তি তৈরি করে না।

মক্কা চুক্তি সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে বহু বাস্তব প্রশ্নের ওপর। আগামী দিনগুলোতে এসব প্রশ্নের উত্তর ধীরে ধীরে স্পষ্ট হবে। তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি। চুক্তিটির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো এর পেছনের ধারণা। চুক্তিটি যদি পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোটে পরিণত নাও হয়, তবুও এটি ইতিমধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে। এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তার ধারণাকে এমন জায়গা থেকে সরিয়ে এনেছে, যেখানে নিরাপত্তা ছিল মূলত বড় শক্তিগুলোর নিয়ন্ত্রিত একটি বিষয়। এর পরিবর্তে এখন আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো নিজেরাই সেই নিরাপত্তা কাঠামোকে নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা করতে পারে।

এটি সামরিক পরিবর্তনের আগে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবর্তন। দশকের পর দশক মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা মানচিত্রের বড় অংশই এই অঞ্চলের বাইরের শক্তিগুলো এঁকেছে। এখন মনে হচ্ছে, আঞ্চলিক শক্তিগুলো নিজেরাই উদ্যোগ নেওয়ার ব্যাপারে ক্রমশ বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছে। মক্কা চুক্তি তাই একটি রাজনৈতিক ভূমিকম্প সৃষ্টি করেছে, যার কম্পন এখনও ছড়িয়ে পড়ছে। বিশ্বের অধিকাংশ, যদি না প্রায় সব, সম্মানিত গবেষণা ও নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠান বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করছে। তাদের বিশ্লেষণে প্রায় অভিন্নভাবে উঠে আসছে যে, এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও নিরাপত্তা-জোটের কাঠামোয় একটি কৌশলগত পরিবর্তনের প্রতিনিধিত্ব করছে।

প্রতীকী গুরুত্ব

গত সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (সিএফআর) প্রথম পাতায় একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করে। এর শিরোনাম ছিল, ‘দ্য ইউএস লেড মিডল ইস্ট অর্ডার ইজ ওভার। দ্য মক্কা অ্যাগ্রিমেন্ট প্রুভস ইট।’ অর্থাৎ, ‘যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন মধ্যপ্রাচ্যের ব্যবস্থা শেষ। মক্কা চুক্তিই তার প্রমাণ।’ বিশ্লেষণটিতে বলা হয়েছে, এই চুক্তি দেখিয়ে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কতটা কমেছে এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলো কীভাবে এখন নিজেদের নিরাপত্তা কাঠামো নিজেরাই গড়ে তুলছে।

অস্ট্রেলিয়ার লোয়ি ইনস্টিটিউট গবেষক সাইরা বানোর একটি লেখা প্রকাশ করেছে। সেখানে তিনি যুক্তি দিয়েছেন, এই চুক্তি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের পশ্চিম প্রান্তের কৌশলগত মানচিত্র নতুন করে আঁকছে। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, এর সবচেয়ে তাৎক্ষণিক এবং রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল প্রভাব পড়বে ভারতের ওপর।

অন্যদিকে, জেরুজালেম ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড সিকিউরিটির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তি পশ্চিমা বিশ্বের এমন একটি বৃহৎ আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গঠনের পরিকল্পনার জন্য গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ইসরায়েল থাকার কথা ছিল। সৌদি আরবের জন্য মক্কা চুক্তির মৌলিক বার্তা হলো, রিয়াদ যুদ্ধ চায় না, কিন্তু দেশের নিরাপত্তাকে অনিশ্চয়তার হাতে ছেড়ে দিতেও রাজি নয়।

এটি সৌদি আরবের বৃহত্তর নীতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেই নীতিতে রয়েছে কূটনীতি, উত্তেজনা কমানো এবং বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা। কূটনীতি আর প্রতিরোধক্ষমতা পরস্পরের বিরোধী নয়। বরং সবচেয়ে শক্তিশালী কূটনীতি হলো সেটিই, যার পেছনে পর্যাপ্ত শক্তি থাকে। এতে অপর পক্ষ বুঝতে পারে যে, আলোচনায় বসা দুর্বলতার কারণে নয়। তাই মক্কা চুক্তিকে যুদ্ধের ঘোষণা হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এটিকে যুদ্ধ ঠেকানোর জন্য একটি বিনিয়োগ এবং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার একটি নিশ্চয়তা তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা উচিত।

চুক্তি স্বাক্ষরের স্থান হিসেবে মক্কাকে বেছে নেওয়ারও গভীর রাজনৈতিক ও প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে। মক্কা শুধু সৌদি আরবের একটি শহর নয়। এটি মুসলমানদের কিবলা, সেই পবিত্র স্থান যার দিকে বিশ্বের মুসলমানরা হৃদয় ও মুখ ফেরান। একই সঙ্গে এটি মুসলিম ঐক্যের সবচেয়ে বড় প্রতীক। ধারণা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে এই চুক্তির পরিধি আরও বাড়তে পারে এবং এতে আরও আরব ও মুসলিম দেশ যুক্ত হতে পারে।

এই পরীক্ষাটি সফল হলে কয়েক বছর পর হয়তো প্রশ্নটি আর এমন থাকবে না যে, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান কেন একটি জোট গঠন করেছিল? বরং প্রশ্নটি হতে পারে, নিজ নিজ হুমকি, স্বার্থ ও ভিন্নমুখী সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তিনটি দেশ এমন একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার কাজ শুরু করল, যার নিয়মকানুন আর শুধু বাইরের শক্তিগুলো নির্ধারণ করবে না? ফলে, কৌশল ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে যারা গবেষণা করেন, তাদের সামনে এখন এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত।


মিডল ইস্ট আই থেকে অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত