
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বহু বছর ধরেই চলে আসছে। এর ফলে তেল রপ্তানি, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং-ব্যবস্থা এবং বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকার পরও দেশটি কীভাবে অর্থনীতিকে সচল রাখছে—সেই প্রশ্নের নতুন একটি উত্তর সামনে এনেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বিস্তৃত অনুসন্ধান।
রয়টার্সের তদন্তে উঠে এসেছে, দুবাইভিত্তিক একটি অননুমোদিত ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এমন একটি আর্থিক নেটওয়ার্ক, যার মাধ্যমে অন্তত ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ ক্রিপ্টো সম্পদ স্থানান্তর হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী—এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে অবৈধ অনলাইন জুয়া, ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বিটকয়েন মাইনিং এবং ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংযোগ রয়েছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, শেলবিট (Shelbit) নামের এই ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জটি ২০২৪ সালের মে মাস থেকে কার্যক্রম শুরু করে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই কয়েক বিলিয়ন ডলারের লেনদেন সম্পন্ন করে। ব্লকচেইন বিশ্লেষকদের তথ্য বলছে, এর মাধ্যমে বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বিন্যান্সেও শত শত মিলিয়ন ডলারের সম্পদ স্থানান্তর করা হয়েছে। যদিও বিন্যান্স জানিয়েছে, তারা সন্দেহজনক অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে, তবু এই বিপুল অর্থপ্রবাহ আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রকদের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর নতুন কৌশল
ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ সংকুচিত করা। কিন্তু প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে ক্রিপ্টোকারেন্সির বিকেন্দ্রীভূত কাঠামো নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। ব্লকচেইন প্রযুক্তিতে প্রতিটি লেনদেন দৃশ্যমান হলেও প্রকৃত নিয়ন্ত্রক বা সুবিধাভোগীকে শনাক্ত করা অনেক সময় কঠিন। এই সুযোগই কাজে লাগিয়ে মধ্যবর্তী ওয়ালেট, অফশোর এক্সচেঞ্জ এবং ক্রিপ্টো মাইনিংয়ের মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ উঠেছে।
রয়টার্সের তদন্তে দেখা যায়, শেলবিটের সঙ্গে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত বিভিন্ন ক্রিপ্টো ওয়ালেট এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুমোদিত বিটকয়েন মাইনিং কার্যক্রমের আর্থিক যোগাযোগ ছিল। যদি এই অভিযোগ সঠিক হয়, তাহলে এটি প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরান এখন প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের বদলে ডিজিটাল সম্পদভিত্তিক সমান্তরাল আর্থিক অবকাঠামো গড়ে তুলছে।
আইআরজিসি শুধু সামরিক বাহিনী নয়, অর্থনৈতিক শক্তিও
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি শুধু একটি সামরিক বাহিনী নয়; গত দুই দশকে এটি ইরানের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। নির্মাণ, জ্বালানি, টেলিযোগাযোগ থেকে শুরু করে বিভিন্ন কৌশলগত খাতে তাদের উপস্থিতি রয়েছে।
রয়টার্সের অনুসন্ধানে আরও গুরুতর অভিযোগ এসেছে—আইআরজিসি কয়েক বছর আগে দেশটির বৃহৎ অনলাইন জুয়া শিল্পের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয় এবং সেই প্ল্যাটফর্মগুলোকে অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। তবে সাবেক কর্মকর্তা, গবেষক এবং ব্লকচেইন বিশ্লেষকদের বক্তব্যে এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও রয়টার্স সরাসরি প্রমাণ করতে পারেনি যে, আইআরজিসি পুরো নেটওয়ার্কটি পরিচালনা করছে।
এই অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি একটি বড় বৈপরীত্যও তুলে ধরে। কারণ, ইরানে জুয়া ধর্মীয় ও আইনি উভয় দিক থেকেই নিষিদ্ধ। অথচ সেই নিষিদ্ধ খাতই রাষ্ট্রীয় স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে—এমন অভিযোগ দেশটির শাসনব্যবস্থার দ্বৈত অবস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব
এই নেটওয়ার্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনফ্লুয়েন্সারদের ব্যবহার। রয়টার্সের তথ্যমতে, দুই হাজারের বেশি জুয়া ওয়েবসাইট প্রচারে অন্তত ৬০ জন ইরানি ইনফ্লুয়েন্সার যুক্ত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের অনুসারীর সংখ্যা এক কোটিরও বেশি। বিলাসবহুল জীবনযাপন, দামি গাড়ি, ব্যক্তিগত জেট ও ইয়ট পার্টির ভিডিও ব্যবহার করে তাঁরা তরুণদের আকৃষ্ট করতেন।
অভিযুক্ত দুই প্রভাবশালী ব্যক্তি সাশা সোবহানি ও পুয়ান মোখতারি অবশ্য অর্থ পাচার, নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁদের দাবি, তারা শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়েছেন; নেটওয়ার্কটির পরিচালনায় তাঁরা জড়িত নন।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের জন্যও পরীক্ষা
এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সংযুক্ত আরব আমিরাতের অবস্থান। দুবাই দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক অর্থ ও ক্রিপ্টো ব্যবসার অন্যতম কেন্দ্র। একই সঙ্গে দেশটি অর্থপাচারবিরোধী মানদণ্ড কঠোর করতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও রয়েছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, দুবাইয়ের ভার্চুয়াল অ্যাসেটস রেগুলেটরি অথোরিটি (ভিএআরএ) শেলবিটের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে এবং লাইসেন্স ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে ব্যবস্থা নিয়েছে। সংস্থাটি অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়নবিরোধী আইন লঙ্ঘনের অভিযোগও উল্লেখ করেছে।
এই পদক্ষেপ আমিরাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় আস্থা ধরে রাখতে হলে দেশটিকে দেখাতে হবে যে তারা বৈধ ও অবৈধ আর্থিক কার্যক্রমের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করতে সক্ষম।
বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার জন্য সতর্কবার্তা
রয়টার্সের এই অনুসন্ধান শুধু ইরানকে ঘিরেই নয়; এটি আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে। ক্রিপ্টোকারেন্সি বৈধ ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তি হলেও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নিষেধাজ্ঞা এড়ানো, অর্থ পাচার বা সীমান্ত পেরিয়ে গোপন অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হলে বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কার্যকারিতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে শুধু ব্যাংক নয়, ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ, ব্লকচেইন বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রকদের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সমন্বয় প্রয়োজন হবে। অন্যথায় নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত রাষ্ট্র বা সংগঠনগুলো নতুন প্রযুক্তির সুযোগ কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার ফাঁকফোকর ব্যবহার করতেই থাকবে।
রয়টার্সের অনুসন্ধানে উপস্থাপিত অনেক অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন এবং সংশ্লিষ্ট কয়েকটি পক্ষ সেগুলো অস্বীকার করেছে। তবু একটি বিষয় স্পষ্ট—ডিজিটাল মুদ্রার যুগে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আর শুধু ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ঘিরে সীমাবদ্ধ নয়। ক্রিপ্টোকারেন্সি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন জুয়া এবং অফশোর আর্থিক অবকাঠামো মিলিয়ে গড়ে উঠছে নতুন এক ভূরাজনৈতিক অর্থনীতি, যার প্রভাব আগামী বছরগুলোতে আরও গভীরভাবে অনুভূত হতে পারে।

পশ্চিমা দেশগুলোতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) ব্যবহারে প্রশাসনিক কড়াকড়ি ও ‘নেট জিরো’ নীতি বাস্তবায়নের তীব্র সমালোচনা করেছেন খ্যাতনামা কানাডীয় মনোবিজ্ঞানী, চিন্তাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জর্ডান পিটারসন। দাবি করেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের চরম বিপর্যয়ের চিত্রকে পুঁজিবাদ ও মুক্তবাজার অর্থনীতি ধ্বংসের...
৪ ঘণ্টা আগে
চলতি সপ্তাহের শুরুতে জর্ডানে অবস্থিত এক মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের আচমকা ক্ষেপণাস্ত্র হামলাটি ব্যাখ্যা করা কঠিন বলেই মনে হয়েছিল প্রথম দর্শনে। এই হামলা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার প্রত্যক্ষ লড়াইয়ের ভঙ্গুর বিরতিতে ইতি টেনেছে এবং ওয়াশিংটনকে ইরানে পুনরায় হামলা চালাতে প্ররোচিত করেছে।
৮ ঘণ্টা আগে
মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক দিনের সাময়িক শান্ত পরিবেশের অবসান ঘটিয়ে ইরানের নতুন সামরিক পদক্ষেপ পুরো অঞ্চলের রণকৌশলে এক বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। সম্প্রতি মার্কিন বাহিনীর ওপর একটি ‘অপ্রত্যাশিত’ আক্রমণের মাধ্যমে তেহরান কৌশলগতভাবে নতুন বার্তা দিল—এবার তারা কেবল আমেরিকান হামলার প্রতিক্রিয়া জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ..
১ দিন আগে
ইরান সংঘাত ফের তীব্র আকার ধারণ করেছে। এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলো ওয়াশিংটনের ওপর ভরসা না রেখে এখন চীনের দিকে তাকিয়ে। হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগর উন্মুক্ত করতে তেহরানের ওপর বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক প্রভাব কতটা কার্যকরী হবে এবং বেইজিং তা করতে কতটা প্রস্তুত...
১ দিন আগে