Ajker Patrika

জর্ডান পিটারসনের নিবন্ধ: ‘জলবায়ু পরিবর্তন বিপর্যয়বাদ’ পুঁজিবাদকে ধ্বংস করার একটি বামপন্থী হাতিয়ার

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
জর্ডান পিটারসনের নিবন্ধ: ‘জলবায়ু পরিবর্তন বিপর্যয়বাদ’ পুঁজিবাদকে ধ্বংস করার একটি বামপন্থী হাতিয়ার
কানাডীয় মনোবিজ্ঞানী জর্ডান পিটারসন। ছবি: সংগৃহীত

পশ্চিমা দেশগুলোতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) ব্যবহারে প্রশাসনিক কড়াকড়ি ও ‘নেট জিরো’ নীতি বাস্তবায়নের তীব্র সমালোচনা করেছেন খ্যাতনামা কানাডীয় মনোবিজ্ঞানী, চিন্তাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জর্ডান পিটারসন। দাবি করেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের চরম বিপর্যয়ের চিত্রকে পুঁজিবাদ ও মুক্তবাজার অর্থনীতি ধ্বংসের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে একটি বিশেষ মতাদর্শিক গোষ্ঠী। তিনি মূলত বামপন্থী বা সোশ্যালিস্ট ডেমোক্র্যাটদের তাঁর আক্রমণের লক্ষ্য করেছেন।

যুক্তরাজ্যের সংবাদপত্র ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-এ প্রকাশিত এক বিস্তৃত নিবন্ধে পিটারসন অভিযোগ করেন, জলবায়ু সংকট মোকাবিলার নামে সাধারণ নাগরিকদের ব্যক্তিগত জীবন, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং অভ্যন্তরীণ গৃহস্থালি তাপমাত্রার ওপর রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

যুক্তরাজ্যে কার্বন নির্গমন কমানোর বিধিমালার আওতায় ইতিমধ্যে বসানো কিছু এসি ইউনিট অপসারণের নির্দেশ, ফ্রান্সে কৃত্রিম অভ্যন্তরীণ শীতলীকরণ ব্যবস্থার সমালোচনা এবং জার্মানির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের মন্তব্যের উল্লেখ করে পিটারসন একে পশ্চিমা বিশ্বের ‘অবাস্তব আতঙ্ক’ বলে বর্ণনা করেছেন।

নিবন্ধে তিনি প্রশাসনিক নীতিগত বৈপরীত্যের উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেন, ইউরোপীয় কমিশনের সদর দপ্তরে অতি-প্রবল তাপপ্রবাহের সময়ে কেবল সাধারণ কর্মীদের ব্যবহৃত প্রথম থেকে সপ্তম তলা পর্যন্ত এসি বন্ধ রাখা হয়েছিল, অথচ শীর্ষ কর্মকর্তাদের ব্যবহৃত ওপরের তলাগুলোতে তা বহাল রাখা হয়।

একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের মেয়র জোহরান মামদানি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে নাগরিকদের এসির থার্মোস্ট্যাট ৭৮ ডিগ্রি ফারেনহাইটে (২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস) রাখার আহ্বান জানান। অথচ তাঁর কার্যালয়ের আবহাওয়া সতর্কবার্তাতেই জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় এসি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছিল।

পিটারসনের মতে, জলবায়ু বিতর্ককে নীতিগত আলোচনার গণ্ডি ছাড়িয়ে সর্বজনীন রাজনৈতিক মতাদর্শে পরিণত করার পেছনে ২০০৬ সালে প্রচারিত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোরের প্রামাণ্যচিত্র ‘অ্যান ইনকনভেনিয়েন্ট ট্রুথ’-এর বড় ভূমিকা ছিল। প্রামাণ্যচিত্রটির প্রচারের দুই দশক পর আজ এই বিষয়টি পশ্চিমা রাজনীতিতে গভীর দলীয় বিভাজন তৈরি করেছে।

সাম্প্রতিক ২০২৬ সালের এক গ্যালাপ জরিপের তথ্য উল্লেখ করে তিনি জানান, মার্কিন ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের ৭২ শতাংশ জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে উদ্বিগ্ন হলেও রিপাবলিকানদের মধ্যে এই হার মাত্র ৬ শতাংশ।

পিটারসন উল্লেখ করেন, বর্তমানে বৈশ্বিক জ্বালানি পুনর্বিন্যাস বা ‘এনার্জি ট্রানজিশন’-এ বার্ষিক ব্যয় ২ ট্রিলিয়ন (২ লাখ কোটি) মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা বিশ্বের মোট জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ। গোরের প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশের পর থেকে এখন পর্যন্ত এ খাতে আনুমানিক ১০ থেকে ১৫ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হয়েছে। অথচ ড্যানিশ বিশ্লেষক বিওর্ন লোমবোর্গ ও কোপেনহেগেন কনসেনসাসের হিসাব অনুযায়ী, অপুষ্টি, ম্যালেরিয়া ও বিশুদ্ধ পানির সংকটের মতো বিশ্বব্যাপী মানবিক সংকট মোকাবিলায় বছরে মাত্র ৫০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন।

জলবায়ু মডেলগুলোর প্রাক্কলিত চরম ধ্বংসাত্মক সতর্কবার্তার বিপরীতে উপাত্তভিত্তিক ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে পিটারসন ২০১৬ সালের নাসা পরিচালিত একটি উপগ্রহ গবেষণার তথ্য উপস্থাপন করেন। ১৯৮২ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে পৃথিবীর স্থলভাগের উল্লেখযোগ্য অংশে সবুজায়ন বৃদ্ধি পেয়েছে।

ওই গবেষণায় দেখা যায়, বিশ্বের প্রায় অর্ধেক স্থলভাগে উদ্ভিদের ঘনত্ব বেড়েছে, যার প্রায় ৭০ শতাংশের মূল কারণ বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের উপস্থিতি বৃদ্ধি। এ ছাড়া বিপরীতমুখী আশঙ্কার সত্ত্বে বিশ্বজুড়ে ধান, গম ও সয়াবিনের মতো মূল খাদ্যশস্যের ফলন ১০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

সমালোচনায় পিটারসন বলেন, বাতাস ও সৌরবিদ্যুতের মতো সাময়িক উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে অনেক স্থানে বিদ্যুৎ গ্রিডের ভারসাম্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক কারণে নিরাপদ ও সফল পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধের সিদ্ধান্তের কারণে মূল পরিবেশগত উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে।

তাঁর হিসাব অনুযায়ী, এনার্জি ট্রানজিশনের বিপুল খরচের একটি অংশ দিয়ে বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার আধুনিক পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন করা সম্ভব হতো, যা একদিকে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করত, অন্যদিকে সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধকরণের মাধ্যমে বৈশ্বিক পানীয় জল ও কৃষি সেচ সংকট চিরতরে নিরসনে ভূমিকা রাখত।

পিটারসন সতর্ক করেন, বিজ্ঞানকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এজেন্ডার অধীনে চালিত করার ফলে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে এবং একটি রূপক নৈতিকতার আড়ালে প্রশাসনিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত