Ajker Patrika

ইয়েমেনে নতুন প্রক্সি যুদ্ধ: হুতিদের পেছনে ইরান, সৌদি জোটকে সহায়তা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

আব্দুর রহমান 
আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯: ১৬
ইয়েমেনে নতুন প্রক্সি যুদ্ধ: হুতিদের পেছনে ইরান, সৌদি জোটকে সহায়তা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনের ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সের পক্ষ থেকে ৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একটি ভিডিও চিত্র থেকে নেওয়া এই ছবিতে ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় তায়েজ প্রদেশের তায়েজ শহরের পশ্চিমে কাধা ফ্রন্টে হুতি যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী ও ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সকে একটি বাহনভিত্তিক লাঞ্চার থেকে রকেট ছুড়তে দেখা যায়। ছবি: এএফপি

ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূল ধরে হুতিদের সাম্প্রতিক দ্রুত অগ্রযাত্রার পেছনে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী কর্পসের (আইআরজিসি) সরাসরি নির্দেশনা ছিল বলে দাবি করেছে ইয়েমেনের সরকারি, ইরানি ও আঞ্চলিক বিভিন্ন সূত্র। তাদের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধে নতুন একটি যুদ্ধফ্রন্ট খুলতেই হুতিদের অভিযান বাড়ানো হয়েছে। এদিকে, ইয়েমেন আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সরকারি বাহিনীর পেছনে থাকা সৌদি জোটকে সরাসরি সহায়তা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে, এই লড়াই এখন এক ধরনে প্রক্সি যুদ্ধে রূপ নিয়েছে।

চলতি সপ্তাহে দক্ষিণ-পশ্চিম ইয়েমেনের কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা দখল করেছে হুতিরা। এর ফলে লোহিত সাগর ও ভারত মহাসাগরের সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব এল–মান্দেব প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত হয়েছে। এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে ইরানের হরমুজ প্রণালি অবরোধের পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের ছয় মাস পেরিয়ে গেছে। এই সময়ে হুতিদের ইরানি মিত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন হুতিরা বাব এল–মান্দেবের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত ও সুসংহত করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। অন্যদিকে, সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের বাহিনী উত্তরে হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে।

ইরানের দুটি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে, গত সপ্তাহে তেহরান হুতিদের সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলা বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র। হুতিদের এই হামলা বাড়াতে ইরান আরও অর্থ, অস্ত্র এবং জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

ইরান প্রকাশ্যে হুতিদের মিত্র হিসেবে আখ্যা দিলেও তাদের সামরিক অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেওয়ার কথা অস্বীকার করে আসছে। তেহরানের বক্তব্য, হুতিরা ইরানের ‘প্রক্সি নয়।’ তবে তেহরান থেকে ব্রিফিং পাওয়া এক আঞ্চলিক কূটনীতিক জানিয়েছেন, সামরিক কৌশল নিয়ে কয়েক সপ্তাহের আলোচনার পর ইরানে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কমান্ডার ইয়েমেনে গিয়েছিলেন। তারা সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে হুতিদের হামলা তদারক ও পরিচালনা করছিলেন।

তৃতীয় এক ইরানি কর্মকর্তা অবশ্য বলেছেন, ইরান হুতিসহ তার মিত্রদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছিল ঠিকই, কিন্তু মোখা দখলের সিদ্ধান্ত ছিল হুতিদের নিজেদের। এটি ইরানের সিদ্ধান্ত ছিল না। তবে ওই কর্মকর্তা বলেন, মোখা দখল ইরানের জন্যও লাভজনক হয়েছে। এর ফলে তেলের দামের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইয়েমেনের ভেতরে সৌদি আরব-সমর্থিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পাঁচ সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিপ্লবী গার্ড বাহিনী লোহিত সাগর উপকূল ধরে হুতিদের নতুন অভিযান পরিচালনার নির্দেশনা দিয়েছে। এই উপকূলীয় অঞ্চলটি সমতল ও সরু একটি ভূভাগ, যার নাম তিহামা। হুতিদের অভিযান শুরু হয়েছিল ব্যাপক রকেট হামলার মাধ্যমে।

ইয়েমেনি সামরিক কর্মকর্তারা যোগাযোগের তথ্য আটকানো এবং আটক করা হুতি যোদ্ধাদের বক্তব্যের ভিত্তিতে বলেছেন, তাদের ধারণা এই ইরানি প্রচেষ্টা পরিচালনা করছেন বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডার আবদোলরেজা শাহলাই। ইরানি সূত্রগুলো তাৎক্ষণিকভাবে এই তথ্য নিশ্চিত করতে পারেনি। তবে তারা এর আগে জানিয়েছিল, বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর বিশেষায়িত কুদস ফোর্সের এই কর্মকর্তা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইয়েমেনে সময় কাটিয়েছেন।

ইরানি সূত্রগুলোর দাবি, হুতি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় আকাশ ও সমুদ্রপথে অবরোধ থাকা সত্ত্বেও বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এখনও ইয়েমেনের ভেতরে ও বাইরে অস্ত্র ও সদস্য সরিয়ে নিতে সক্ষম হচ্ছে। কীভাবে তারা এটি করছে, সে বিষয়ে সূত্রগুলো বিস্তারিত জানায়নি।

থিংক ট্যাংক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইয়েমেন বিশ্লেষক আহমেদ নাগি বলেন, পশ্চিম উপকূলে হুতিদের এই অভিযান এমন কিছু নয়, যা গত সপ্তাহ বা গত মাসে হঠাৎ প্রস্তুত করা হয়েছে। মোখা দখলকে যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, হুতিদের সামরিক সক্ষমতার বিবর্তনের মূল কারণ হলো তারা নতুন ধরনের অস্ত্র পেয়েছে। এসব অস্ত্র তারা সরাসরি ইরানের কাছ থেকে অথবা বিভিন্ন চোরাচালান নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পেয়েছে। সাম্প্রতিক অভিযানে হুতিদের ড্রোন ব্যবহারের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন তিনি।

এদিকে, হুতিদের অগ্রযাত্রা ও সৌদি আরবের বিরুদ্ধে তাদের হামলা বাড়ার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রও সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দিচ্ছে। এই প্রচেষ্টার সঙ্গে পরিচিত একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সৌদি আরবে শতাধিক মার্কিন সামরিক উপদেষ্টা অবস্থান করছেন। তারা সৌদি বাহিনীকে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা দিচ্ছেন। এক মার্কিন কর্মকর্তা অবশ্য সেখানে মার্কিন সেনার মোট সংখ্যা প্রায় ২০০ বলে জানিয়েছেন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন–এর খবরে সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, এই মার্কিন সামরিক সদস্যরা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে গঠিত একটি নতুন যৌথ বাহিনী কমান্ডের অংশ হিসেবে কাজ করছেন। ইরান হুতিদের সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলায় সহায়তা বাড়াচ্ছে, এমন লক্ষণের মধ্যেই এই কমান্ড গঠন করা হয়েছে। সৌদি আরবে মার্কিন সেনাদের উপস্থিতি এবং তাদের সহায়তার বিষয়টি অভিযানটির সঙ্গে পরিচিত পাঁচটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে।

এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে এমন একটি টার্গেটিং ব্যবস্থা ব্যবহারে সহায়তা করেছে, যার মাধ্যমে সামরিক কর্মকর্তারা যুদ্ধক্ষেত্রে কী ঘটছে তা তাৎক্ষণিকভাবে দেখতে পারেন। ওই কর্মকর্তা এটিকে পেন্টাগনের ব্যবহৃত ‘ম্যাভেন’ ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

চলমান দুই দেশের সহযোগিতার সঙ্গে পরিচিত আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি হামলার জন্য ‘জিওস্প্যাশাল’ বা ভৌগোলিক তথ্যভিত্তিক লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা দিচ্ছে। তবে মার্কিন সহায়তার ওপর বর্তমানে কঠোর সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি করছে, যা তারা নিয়মিতভাবেই করে থাকে। কিন্তু মার্কিন বাহিনী সরাসরি হামলায় অংশ নিচ্ছে না। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র সৌদি যুদ্ধবিমানকে জ্বালানি সরবরাহে সহায়তা করছে না এবং অন্যান্য কার্যক্রমগত সহায়তাও দিচ্ছে না। অতীতে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের সহায়তা দিয়েছিল। একটি সূত্র জানিয়েছে, এবারের প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য হলো সৌদি আরবের সামরিক অভিযান যাতে সুশৃঙ্খল ও পেশাদারভাবে পরিচালিত হয়, তা নিশ্চিত করা।

সবগুলো সূত্রই এই উদ্যোগকে সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আগে থেকেই থাকা সহযোগিতা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সম্প্রসারণ হিসেবে বর্ণনা করেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘চর্চা হিসেবে আমরা গোয়েন্দা-সংক্রান্ত বিষয়ে মন্তব্য করি না।’

সৌদি আরবকে দেওয়া মার্কিন সহায়তা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন উপদ্বীপে হুতিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রার মধ্যে লড়াই তীব্র হয়েছে। সাম্প্রতিক দিনের সংঘর্ষ সম্ভবত ২০২২ সালের পর সবচেয়ে তীব্র পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২২ সালে হুতি এবং সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। তবে এরপরও দেশটি কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা, হুতিদের ক্রমবর্ধমান হামলা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের একটি দ্বিতীয় ফ্রন্ট তৈরি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা মনে করেন, বর্তমানে ইয়েমেনে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কয়েকশ কর্মকর্তা রয়েছেন। তারা হুতিদের সঙ্গে কাজ করছেন এবং শেষ পর্যন্ত বাব এল–মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়াই তাদের লক্ষ্য।

বাব এল–মান্দেব লোহিত সাগরকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। ফলে এই নৌপথ বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। সিএনএন এর আগে জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ হলে ইরান একটি অর্থনৈতিক ‘নিউক্লিয়ার অপশন’ বা চরম পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। এর মধ্যে ছিল হুতিদের মাধ্যমে বাব এল–মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও চলতি সপ্তাহের শুরুতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ইয়েমেনে আইআরজিসির উপস্থিতি নিয়ে গোয়েন্দা তথ্যের ইঙ্গিত দেন। মার্কিন কর্মকর্তাদের একজনের মতে, রুবিও বলেছিলেন, সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে সাম্প্রতিক হুতি হামলায় ইরানের হাত রয়েছে।

হুতিরা গত সপ্তাহে মোখার দিকে অগ্রসর হতে শুরু করলে ইয়েমেন সরকার সৌদি আরবের কাছে আরও বিমান সহায়তা ও অন্যান্য সহযোগিতা চেয়েছিল। দুই ইয়েমেনি কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন। তারা হুতিদের মূল ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত সানা এবং তেলের মজুতকেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্থাপনাগুলোসহ হুতি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সৌদি বিমান হামলা চেয়েছিল।

তবে সৌদি আরব বড় ধরনের বিমান অভিযান চালানোর বদলে রসদ, অস্ত্র ও গোয়েন্দা সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সীমিত কিছু বিমান হামলা চালানো হলেও সেগুলো মূলত উত্তরের জাওফ ও মা’আরিব প্রদেশের যুদ্ধক্ষেত্রে কেন্দ্রীভূত ছিল। ইয়েমেন সরকার এসব এলাকাকে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেছিল।

ইয়েমেনি কর্মকর্তাদের নিজস্ব মূল্যায়ন ছিল, হুতিদের আরও বড় ধরনের ড্রোন হামলা উসকে দেওয়ার আশঙ্কায় রিয়াদ বড় ধরনের উত্তেজনা এড়িয়ে চলতে চাইছে। লোহিত সাগর উপকূল এবং হুতিদের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুর বদলে উত্তরাঞ্চলীয় যুদ্ধক্ষেত্রে সৌদি আরব কেন বেশি মনোযোগ দিচ্ছে, সে বিষয়ে মন্তব্যের জন্য রয়টার্স সৌদি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তবে তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেননি।

সৌদি আরব শুরুতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে খুব বেশি জড়িয়ে পড়তে অনিচ্ছুক ছিল। এমনকি এই গ্রীষ্মের শুরুতে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে পাহারা দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক প্রচেষ্টাকেও সৌদি আরব সমর্থন করতে অস্বীকার করেছিল।

কিন্তু হুতিদের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী হামলা যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে দ্বিতীয় একটি যুদ্ধফ্রন্ট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়েছে। তবে ইরানে ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের কারণে মার্কিন বাহিনীও ইতোমধ্যে ব্যাপক চাপের মধ্যে রয়েছে। এই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সেনারা বারবার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে মোতায়েন থাকা এবং গোলাবারুদের মজুত নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

একই সময়ে মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের বেশিরভাগ মনোযোগ হরমুজ প্রণালির আশপাশের অভিযানে দিচ্ছে। তারা ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছে, এই নৌপথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে পাহারা দিচ্ছে এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ বজায় রাখছে।

সৌদি আরবের হুতিবিরোধী হামলা অভিযানের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে পড়ার বিষয়েও মার্কিন সামরিক বাহিনীর ভেতরে গভীর সতর্কতা রয়েছে। বিশেষ করে কোনো হামলা ভুল হলে এবং তাতে বেসামরিক মানুষ নিহত হলে এই উদ্বেগ আরও বাড়ে। অতীতে এমন ঘটনা ঘটেছিল বলে আরেক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। এই প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত আরেকটি সূত্র বলেছে, ‘এটি পুরোনো সময়ের মতো নয়।’

মার্কিন বাহিনী সৌদি আরবকে সহায়তা দিতে গিয়ে অতীতের অভিজ্ঞতাও মাথায় রাখছে। ওবামা ও ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম মেয়াদে মার্কিন বাহিনী সৌদি আরবকে যে লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা দিয়েছিল, তা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হয়েছিল। সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, ওই সহায়তা বিপুল সংখ্যক বেসামরিক মানুষের হতাহতের ঘটনায় ভূমিকা রেখেছিল। ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রশাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্র ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে কয়েক মাস ধরে অভিযান চালায়। পরে আকস্মিক একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে ওই অভিযান শেষ হয়।

ট্রাম্পের শীর্ষ সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন ওই অভিযান দ্রুত শেষ করার পক্ষে চাপ দিয়েছিলেন। তাঁর উদ্বেগ ছিল, এই অভিযানের কোনো স্পষ্ট প্রস্থান কৌশল বা ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’ নেই। ২০২২ সালে যুদ্ধবিরতি হওয়ার পর কয়েক বছর ধরে বড় ধরনের যুদ্ধ কার্যত বন্ধ থাকায় ইয়েমেনের সামগ্রিক সামরিক পরিস্থিতি নির্ণয় করা কঠিন। ইরান ও সৌদি আরব উভয় দেশই ইয়েমেনে নিজেদের সমর্থিত বাহিনীগুলোতে বিনিয়োগ করেছে। তবে ইয়েমেন সরকারের পক্ষে থাকা জোট অভ্যন্তরীণ বিভাজনের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে।

তিহামা অঞ্চলে আগের কয়েক দফা যুদ্ধে দ্রুত অগ্রগতি এবং পরে দ্রুত পিছু হটার ঘটনা ঘটেছিল। এবার সৌদি আরব-সমর্থিত বাহিনী সহজেই হুতিদের সেখান থেকে সরিয়ে দিতে পারবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন ইয়েমেন বিশ্লেষক আহমেদ নাগি। তিনি বলেন, সৌদি আরবের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে সরকারপন্থি বাহিনী কিছু অগ্রগতি অর্জন করতে পারে। তবে এবার সেটি কঠিন হতে পারে।

সব মিলিয়ে, মোখা দখল এবং তিহামা উপকূলে হুতিদের দ্রুত অগ্রযাত্রা ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের বিভক্ত যুদ্ধকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে গেছে। একদিকে হুতিরা বাব এল–মান্দেব প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ শক্ত করছে, অন্যদিকে সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র সেই অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সীমিতভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর ফলে হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি বাব এল–মান্দেবও যদি সংঘাতের কেন্দ্র হয়ে ওঠে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব শুধু ইয়েমেন বা সৌদি আরবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যেও তা বড় চাপ তৈরি করতে পারে।

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত