Ajker Patrika

‘নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্রের’ বিরুদ্ধে ককরোচদের আন্দোলন কোন পথে, কী ভাবছে মোদি সরকার

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০৮ জুন ২০২৬, ১৪: ০৫
‘নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্রের’ বিরুদ্ধে ককরোচদের আন্দোলন কোন পথে, কী ভাবছে মোদি সরকার
দিল্লিতে ককরোচদের আন্দোলনে সোমান ওয়াংচুক। ছবি: সংগৃহীত

ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ, অনলাইন আন্দোলন থেকে অফলাইন আন্দোলনে রূপ নেওয়া এক নতুন রাজনৈতিক তরঙ্গ শুরু হয়েছে ভারতে। আর তার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে তরুণদের বিদ্রোহ। সব মিলিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় রাজধানীর যন্তর মন্তর পরিণত হয়েছে উত্তেজনা, আবেগ আর দাবিদাওয়ার মঞ্চে।

১৯ বছর বয়সী কলেজছাত্রী সমীক্ষা ২০২৫ সালের ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্টে (নিট–ইউজি) অংশ নিয়েছিলেন। তিনিও গত শনিবার ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভে অংশ নেন পরিবারকে অমান্য করে। তাঁর উপস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং এক বৃহত্তর অসন্তোষের প্রতীক।

সমীক্ষা বলেন, ‘আমার মা-বাবা চাইছিলেন না যে আমি এখানে আসি। যদি আমি আমার অধিকারগুলোর জন্য লড়াই না করি, তাহলে কে করবে? আমার ছোট বোন এখন দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ে, আগামী বছর বোর্ড পরীক্ষা দেবে। আমরা শিক্ষাব্যবস্থায় যা হচ্ছে—পেপার ফাঁস থেকে শুরু করে নম্বরিং ব্যবস্থা কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত—সব দেখেছি। এখানে কোনো রাজনৈতিক জবাবদিহি নেই।’

তাঁর এই কথাগুলোই যেন আন্দোলনে অংশ নেওয়া সবার কথার প্রতিধ্বনি। তবে সেখানে শুধু শিক্ষার্থী নয়, ছিলেন অভিভাবক, শিক্ষক, তরুণ পেশাজীবী। যেন পুরো একটি প্রজন্মের অস্থিরতা এক জায়গায় জমাট বাঁধছিল। যন্তর মন্তরে এই সমাবেশ ছিল ২০২৩ সালের কুস্তিগিরদের আন্দোলনের পর প্রথম বড় ধরনের প্রতিবাদ।

এই আন্দোলনের সূচনা হয় সিপিজে প্রতিষ্ঠাতা অভিজিত দিপকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আহ্বানের পর। ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন আন্দোলন হিসেবে শুরু হওয়া সিপিজে দ্রুতই জেন-জি তরুণদের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে রূপ নেয়। সংগঠনটি তাদের ২ কোটি ২০ লাখ ইনস্টাগ্রাম অনুসারীকে আহ্বান জানায়, প্রথম অফলাইন বিক্ষোভে অংশ নিতে। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে শুরু হয় এই আন্দোলন। অভিযোগ, তাঁর অধীনেই সাম্প্রতিক সিবিএসই এবং নীট পরীক্ষায় গুরুতর ‘বিভ্রাট’ দেখা দিয়েছে।

গত মাসে সারা দেশের ৫ হাজার ৪৩২টি কেন্দ্রে নিট-ইউজি পরীক্ষায় ২২ লাখেরও বেশি প্রার্থী অংশ নেন। পরে ১২ মে পরীক্ষাটি বাতিল করা হয় প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ অনিয়মের অভিযোগে। পরে ঘোষণা আসে, পরীক্ষাটি আবার এই মাসের শেষ দিকে আয়োজন করা হবে।

অন্যদিকে সিবিএসই (CBSE) সম্প্রতি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। কারণ, শিক্ষার্থীরা তাঁদের নতুন অন-স্ক্রিন মার্কিং (ওএসএম) ব্যবস্থার গুরুতর ত্রুটি তুলে ধরে। সরকার নিট–ইউজি পুনঃপরীক্ষার নির্দেশ দেয় এবং সিবিএসই কর্মকর্তাদের বদলিও করা হয়। তবে রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিত।

আইনজীবী যশবন্ত পরিস্থিতিকে আরও বিস্তৃত রাজনৈতিক ব্যাখ্যার মধ্যে নিয়ে যান। তিনি বলেন, ‘আমরা এক নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্রে বাস করছি। সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ আছে। যদি তারা আমাদের দেশবিরোধী, শহুরে নকশাল বলে ডাকে, তাহলে আমাদের প্রতিবাদ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না। এই প্রতিবাদ তরুণদের হতাশার বহিঃপ্রকাশ। ভারতের প্রধান বিচারপতির মন্তব্য থেকে যে শব্দগুলো এসেছে, তা ব্যঙ্গ তৈরি করেছিল, কিন্তু এখন তা একটি আন্দোলনে পরিণত হয়েছে এবং এর জাতীয় চরিত্র পাওয়া উচিত।’

এই আন্দোলনের নাম ‘ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)’ আসলে জন্ম নেয় এক বিতর্কিত প্রেক্ষাপটে। গত ১৫ মে যখন প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত তরুণদের ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’ বলে মন্তব্য করেন, তখনই ব্যঙ্গাত্মকভাবে এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পেজের জন্ম হয়। পরে প্রধান বিচারপতি বলেন, গণমাধ্যম তাঁর মন্তব্য ভুলভাবে উদ্ধৃত করেছে। কিন্তু ততক্ষণে সিজেপি ইতিমধ্যেই অনলাইন বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। দ্রুতই ইনস্টাগ্রামে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) অনুসারী সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যায়। পরে জাতীয় নিরাপত্তার কারণে সিপিজের এক্স অ্যাকাউন্ট ব্লক করা হয়, এরপর নতুন অ্যাকাউন্ট@Cockroachisback চালু করে সংগঠনটি।

আন্দোলনের মূল মুখ অভিজিত দিপকে। তিনি আগে আম আদমি পার্টির (এএপি) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন। তিনি গত শনিবার দিল্লিতে ফিরে আসেন। তিনি প্রথমে সমর্থকদের পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় দেখা করতে বলেন, তবে পরে ঘোষণা দেন যন্তর মন্তরই হবে মূল প্রতিবাদস্থল। বিমানবন্দরে পুলিশ তাঁর সঙ্গে দেখা করে বিক্ষোভের অনুমতি দেয়।

শনিবার সকাল ১০টা নাগাদ যন্তর মন্তরে ভিড় জমতে শুরু করে। দুপুরের মধ্যে তা রূপ নেয় জনসমুদ্রে। শত শত শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক, তরুণ পেশাজীবী এবং বামপন্থী ছাত্রসংগঠনের সদস্যরা সেখানে যোগ দেন। সিপিআইয়ের (এমএল) সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য এবং সিপিআইয়ের অ্যানি রাজাও সমর্থনে উপস্থিত হন। বিক্ষোভকারীরা ফুল, বই এবং বিভিন্ন ব্যানার হাতে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি তোলেন। পরিবেশ ছিল একই সঙ্গে আবেগপূর্ণ ও রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত।

আন্দোলনে যোগ দেওয়া ডাক্তার সোমিল শেরওয়ান বলেন, ‘ভারত অনেক সমস্যার মুখোমুখি, কিন্তু আমাদের তেলাপোকা বলে অপমান করা আমাদের মর্যাদাকে ছোট করে। যদি আমাদের সমর্থন করতে না পারেন, তাহলে অন্তত অপমান করবেন না।’ তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষামন্ত্রীকে দায় নিতে হবে। লাল বাহাদুর শাস্ত্রী যদি একটি রেল দুর্ঘটনার পর পদত্যাগ করতে পারেন, তাহলে (ধর্মেন্দ্র) প্রধানকেও নিজের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করা উচিত। শুধু দেখানোর জন্য যে সবকিছু ঠিক আছে, তিনি পদে বসে থাকতে পারেন না। রাজনৈতিক নির্বাহীকে জবাবদিহির আওতায় আসতে হবে। একজন রাজনৈতিক নেতাকে দায়িত্ব নিতে হয়—কারণ, জনগণের করের টাকাতেই তিনি পরিচালিত হন। যদি তিনি ব্যবস্থা ঠিকভাবে চালাতে না পারেন, তাহলে তাঁর পদত্যাগ করা উচিত।’

যদিও আন্দোলনের ভবিষ্যৎ দিক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—বিশেষ করে এটি কীভাবে অনলাইনভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম থেকে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নেবে—তবু আন্দোলনকারীরা দাবি করছেন, এটি কোনো নির্দিষ্ট দলের আন্দোলন নয়।

পাঞ্জাবের বাথিন্ডা থেকে আসা চিকিৎসক রবিন মাহেশ্বরী বলেন, ‘এটি একটি অনানুষ্ঠানিক বিরোধিতা, যা আসলে খুবই শক্তিশালী।’ তিনি বলেন, ‘এই প্রজন্মের মানুষদের উপহাস করা হচ্ছে, আর এই প্রতিবাদের জায়গাটুকুই সরকারকে অস্থির করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। যখন সরকারের মধ্যে সহমর্মিতা ও মানবিকতা অনুপস্থিত, তখন আমাদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের বিচার না করে এটিকে জনগণের ভেতর থেকে উঠে আসা একটি অনানুষ্ঠানিক বিরোধিতা হিসেবেই দেখা উচিত। রাষ্ট্রকে আসলে নিয়ন্ত্রণ করে তরুণদের অনুভূতি। হয়তো এই সংগঠন আগামী দিনে ভিন্ন রূপ নেবে, কিন্তু এটি অন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের আরও পরিশুদ্ধ করতে বাধ্য করবে, আর এভাবেই ভারসাম্য ও উন্নয়ন ফিরে আসবে।’

এরই মধ্যে দিপকে জনতার উদ্দেশে বক্তব্য দিয়ে বলেন, দেশের তরুণদের সরকারের ভয়ে ভীত হওয়া উচিত নয়। তিনি বলেন, ‘আমার মা ও বোন কাঁদছিলেন। তাঁরা ভয় পাচ্ছিলেন যে এই সরকার আমাকে জেলে পাঠাবে। এই ভয় শুধু আমার মায়ের একার নয়। এই দেশে প্রতিটি মা-ই এমন ভয় পান, যখন তাদের সন্তান এই সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলে। আমরা আর কত দিন এই সরকারের ভয়ে বেঁচে থাকব?’

দুপুরের দিকে তিনি আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে আরও কঠোর অবস্থান নেন। তিনি বলেন, সরকারকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সময় দেওয়া হবে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের জন্য। তিনি বলেন, ‘আমি আপনাদের সবাইকে জিজ্ঞেস করতে চাই, আপনারা আবার কারা এই প্রতিবাদে বসবেন? আপনারা কি চান এই আন্দোলন এখানেই শেষ হয়ে যাক? আপনারা কি মনে করেন আমরা এখানে বসে থাকব যতক্ষণ না ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন? আপনাদের সবার পক্ষ থেকে আমি ঘোষণা করছি, যদি তিনি বিকেল ৫টার মধ্যে পদত্যাগ না করেন, তাহলে আমরা এই আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে দেব।’

কিন্তু দিনের শেষ দিকে পরিস্থিতি বদলায়। সিপিজে জানায়, আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়ার আগে তারা ধর্মেন্দ্র প্রধানকে আরও সাত দিন সময় দেবে। সিপিজে প্রধান মুখপাত্র সৌরভ দাস বলেন, ‘মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই আমরা অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই আন্দোলনকে ভেস্তে দেওয়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়েছে। এটি একটি নেতৃত্বহীন আন্দোলন, এখানে এক বা দুজন নেতা নেই। প্রতিটি শিক্ষার্থী, যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তারাই নেতা। তরুণেরা বুঝে গেছে তাদেরই দায়িত্ব নিতে হবে। কারণ, সরকার তাদের কথা ভাবছে না।’

আন্দোলনের ভবিষ্যৎ রূপরেখা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, মূল লক্ষ্য শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন। সৌরভ দাস বলেন, ‘আমরা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেব কীভাবে সামনে এগোনো হবে। আমরা একটি উন্মুক্ত আহ্বান জানিয়েছিলাম। যে কেউ গান্ধীয় নীতিতে বিশ্বাসী এবং শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করতে চান, তাঁরা স্বাগত। আমাদের একমাত্র লক্ষ্য শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ।’

এই উত্তেজনার মাঝেই উপস্থিত হন অ্যাক্টিভিস্ট সোনম ওয়াংচুক। তিনি বলেন, ‘বিকশিত ভারতের ভিত্তি দিল্লির বেসরকারি স্কুলে নয়, বরং গ্রামের স্কুলগুলোতেই নিহিত। তিনি বলেন, ‘বিকশিত ভারতের ভিত্তি দিল্লির বেসরকারি স্কুলে নয়, বরং গ্রামের স্কুলগুলোতে অবস্থিত। সব নির্বাচিত প্রতিনিধির সন্তানদের সরকারি স্কুলে পড়া উচিত। আপনি পদত্যাগ চাইছেন, এটা ঠিক আছে, কিন্তু আমাদের এটাও দাবি করা উচিত যে, সব নির্বাচিত প্রতিনিধি যেন তাঁদের সন্তানদের সরকারি স্কুলে পাঠান। যাঁরা এই ব্যবস্থা চালাচ্ছেন, তাঁদেরই এতে কোনো স্বার্থ জড়িত নেই। তাহলে তাঁরা কেন এটি উন্নত করবে?’

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও দ্রুত আসে। বিজেপি সভাপতি নীতিন নবীন আন্দোলন ও দিপকের সমালোচনা করে বলেন, ‘বিদেশে বসে থাকা কিছু মানুষ মনে করেন, তাঁরা ভারতের তরুণদের দিকনির্দেশনা দেবেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আজকের তরুণেরা দেশের নির্মাণে কাজ করতে চায়, নিজের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে চায়। কিন্তু কিছু মানুষ এই দেশের তরুণদের অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করেছে। যারা দেশের তরুণদের নেতিবাচক রাজনীতির দিকে টানতে চায়, তাদের আমি সতর্ক করছি—ভারতের তরুণেরা ইতিবাচক রাজনীতি করবে। আমরা গণতন্ত্রের ভিত্তিতে বিরোধিতা করব, কিন্তু গণতন্ত্রের মানদণ্ড ধ্বংস হতে দেব না।’

শেষে নীতি নবীন বলেন, ‘কিন্তু ভারতের তরুণেরা কয়েকজন মানুষের মুঠোর পুতুল হয়ে এগোবে না।’

দ্য ওয়ার থেকে অনুদিত

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত