আল-জাজিরার বিশ্লেষণ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্যাসিবাদবিরোধী বামপন্থী আন্দোলন অ্যান্টিফাকে একটি ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তাঁর এ ঘোষণার পর রাজনৈতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
গতকাল বুধবার ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, ‘আমি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে মার্কিন দেশপ্রেমিকদের জানাচ্ছি, আমি অ্যান্টিফাকে একটি অসুস্থ, বিপজ্জনক, উগ্র বামপন্থী দুর্যোগ এবং একটি বড় সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করছি। আমি দৃঢ়ভাবে সুপারিশ করছি, যারা অ্যান্টিফাকে অর্থায়ন করছে, সর্বোচ্চ আইনি মান ও পদ্ধতি অনুসরণ করে তাদের বিরুদ্ধে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করা হবে।’
অ্যান্টিফা আসলে কী
অ্যান্টিফা শব্দটি অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট বা ফ্যাসিবাদবিরোধিতার সংক্ষিপ্ত রূপ, তবে এটি কোনো একক গোষ্ঠী নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বামপন্থী সংগঠন ও কর্মীদের একটি বিকেন্দ্রীভূত ও ঢিলেঢালাভাবে সংগঠিত একটি জোট, যা ডানপন্থী ও ফ্যাসিবাদী মতাদর্শের বিরোধিতা করে।
মার্কিন ইতিহাসবিদ ও ‘অ্যান্টিফা: দ্য অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট হ্যান্ডবুক’ বইয়ের লেখক মার্ক ব্রে বলেন, অ্যান্টিফা একটি রাজনৈতিক আদর্শ, কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী নয়। তিনি ব্যাখ্যা করেন, যেমন—নারীবাদী গোষ্ঠী আছে, কিন্তু নারীবাদ নিজে কোনো গোষ্ঠী নয়। যেকোনো গোষ্ঠী, যারা নিজেদের অ্যান্টিফা বলে ও ফ্যাসিবাদবিরোধী মূলনীতি অনুসরণ করে, তারাই অ্যান্টিফা গোষ্ঠী। এর কোনো কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর বা নেতা নেই।
এই আন্দোলন খুবই গোপনীয় এবং এর সদস্যসংখ্যা, তাঁদের পরিচয় বা নেতৃত্বের কাঠামো সম্পর্কে নির্দিষ্টভাবে জানা সম্ভব নয়, কারণ, এ তথ্যগুলো কখনোই প্রকাশ করা হয় না। যদিও আন্দোলনটি ২০১৬ সাল থেকে গতি পেতে শুরু করে, তবে এর আগেও অ্যাকটিভিস্টরা ‘অ্যান্টিফা’ শব্দটি ব্যবহার করতেন।
অ্যান্টিফার কর্মকাণ্ড
অ্যান্টিফা মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগুলো বিভিন্ন প্রতিবাদ ও পাল্টা প্রতিবাদে অংশ নিলেও কয়েকটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যেমন—শিকাগোর রেস্তোরাঁয় হামলা। ২০১২ সালে ১৮ জন মুখোশধারী ব্যক্তি স্টিলের লাঠি ও হাতুড়ি নিয়ে শিকাগো শহরতলির একটি পারিবারিক রেস্তোরাঁয় হামলা চালান। তাঁরা দাবি করেন, সেখানে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের একটি বৈঠক চলছিল। এ ঘটনায় আটক পাঁচজনকে গুরুতর হামলা, দলবদ্ধ অপরাধ ও সম্পত্তি ভাঙচুরের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিল।
বার্কলেতে বিক্ষোভ—২০১৭ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলেতে ট্রাম্পের সমর্থক ও কালো পোশাক পরা মুখোশধারী অ্যান্টিফা বিক্ষোভকারীদের মধ্যে একাধিক সহিংস সংঘর্ষ হয়। ওই বছর ট্রাম্পের সমর্থক মিলো ইয়ানোপোলোসের একটি বক্তৃতার প্রতিবাদে প্রথম সহিংস ঘটনা ঘটে। পরে আরও কয়েকটি সমাবেশেও একই ধরনের সহিংসতা দেখা যায়।
শার্লটসভিলে বিক্ষোভ—২০১৭ সালের আগস্টে ভার্জিনিয়ার শার্লটসভিলে ডানপন্থী বিক্ষোভকারীরা একটি প্রতিবাদ কর্মসূচির আয়োজন করেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ফ্যাসিবাদবিরোধী বিভিন্ন দল পাল্টা প্রতিবাদ করে। এমন একটি দল ছিল ‘রেডনেক রিভোল্ট’, যারা রাইফেল নিয়ে ফ্যাসিবাদবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ঘিরে নিরাপত্তাবলয় তৈরি করেছিল।
অ্যান্টিফার আর্থিক উৎস
যেহেতু অ্যান্টিফা কোনো সমন্বিত একক গোষ্ঠী নয়, তাই এর অর্থদাতাদের তালিকা শনাক্ত করা অসম্ভব। প্রতিটি স্বায়ত্তশাসিত গোষ্ঠীর নিজস্ব অর্থায়নের উৎস রয়েছে, যা সাধারণত প্রকাশ করা হয় না। ইতিহাসবিদ মার্ক ব্রের মতে, একবচনে ‘অ্যান্টিফা’ শব্দটি ব্যবহার করা বিভ্রান্তিকর এবং এটি বামপন্থীদের দমন করার জন্য ট্রাম্পের প্রচেষ্টার একটি অংশ।
মার্ক ব্রে বলেন, ট্রাম্প একটি সাধারণ ডানপন্থী ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচার করতে চাচ্ছেন। তিনি প্রচার চাচ্ছেন, জর্জ সোরোসের মতো অদৃশ্য অর্থদাতারা বামপন্থীদের সব কার্যক্রমের পেছনে পুতুল নাচানোর মতো কাজ করছে। তবে বাস্তবতা হলো, অ্যান্টিফা গোষ্ঠীগুলোর বাজেট খুব বেশি নয় এবং এর বেশির ভাগ সদস্যদের নিজেদের তহবিল বা গণতহবিল থেকে সংগ্রহ করা হয়, যা মূলত জামিনের মতো আইনি সহায়তায় ব্যবহৃত হয়।
ট্রাম্প কি অ্যান্টিফাকে সন্ত্রাসী ঘোষণা করতে পারবেন?
অ্যান্টিফাকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করার ব্যাপারে ট্রাম্পের আইনি ভিত্তি কতটা শক্তিশালী, তা স্পষ্ট নয়। মার্কিন আইন অনুযায়ী, সরকার কেবল বিদেশি গোষ্ঠীগুলোকে ‘ফরেন টেররিস্ট অর্গানাইজেশন’ (এফটিও) হিসেবে ঘোষণা করতে পারে, কিন্তু অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীর জন্য নির্দিষ্ট কোনো আইন নেই। সমালোচকেরা বলছেন, এই পদক্ষেপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর অধীনে থাকা বাক্স্বাধীনতার অধিকার নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি হবে।
আইনগতভাবেও বিষয়টি জটিল, কারণ অ্যান্টিফা কোনো একক সংগঠন নয়। বিচার বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা মেরি ম্যাককরডের মতে, এমন পদক্ষেপ মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর অধীনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য হুমকি হতে পারে। এফবিআইয়ের সাবেক পরিচালক ক্রিস্টোফার রেও মনে করেন, অ্যান্টিফা একটি মতবাদ, সংগঠন নয়—তাই এটিকে সন্ত্রাসী ঘোষণা করা কঠিন।
আগেও অ্যান্টিফাকে নিশানা করেছিলেন ট্রাম্প
হ্যাঁ, ট্রাম্প এর আগেও অ্যান্টিফাকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার হুমকি দিয়েছিলেন। ২০২০ সালের মে মাসে তিনি তাঁর এক্স অ্যাকাউন্টে লিখেছিলেন—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অ্যান্টিফাকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করবে।
২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে হামলার আগেও তিনি অ্যান্টিফাকে নিয়ে এমন মন্তব্য করেছিলেন। সে সময় ট্রাম্প গোপনে হামলার জন্য অ্যান্টিফাকে দায়ী করার চেষ্টা করেছিলেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে প্রকাশ হয়। তবে তৎকালীন হাউস মাইনরিটি লিডার কেভিন ম্যাকার্থি ট্রাম্পকে বলেছিলেন, ‘তারা অ্যান্টিফা নয়, তারা মাগা (MAGA)। আমি জানি, আমি সেখানে ছিলাম।’
অনেকে বলছেন, ট্রাম্পের এই নতুন ঘোষণার কারণ সাম্প্রতিক সময়ে রক্ষণশীল রাজনৈতিক কর্মী চার্লি কার্কের হত্যাকাণ্ড। ১০ সেপ্টেম্বর কার্ক ইউটাতে এক অনুষ্ঠানে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। তাঁর হত্যাকাণ্ডের পর নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা টাইলর রবিনসন নামের ২২ বছর বয়সী এক তরুণকে গ্রেপ্তার করে। ইউটার গভর্নর স্পেনসার কক্স মার্কিন গণমাধ্যমকে বলেছেন, রবিনসন ‘বামপন্থী মতাদর্শে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত’ ছিলেন।
কিছু ডানপন্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকেও দাবি করা হয়েছে, রবিনসন অ্যান্টিফার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু প্রমাণ হিসেবে ছড়ানো ছবিগুলো ভুয়া বলে প্রমাণিত হয়েছে।

মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের পর ইরান হরমুজ প্রণালিকে সফলভাবে অবরোধ করে। সেটিতে সফল হওয়ার পর এবার বিশ্ব অর্থনীতির আরেক গোপন ধমনিকে লক্ষ্যবস্তু করছে ইরান। সেটি হলো হরমুজ প্রণালির নিচ দিয়ে বিস্তৃত সাবসি বা সমুদ্রতলের কেব্ল নেটওয়ার্ক।
৩ ঘণ্টা আগে
নয়াদিল্লিতে সমাপ্ত হওয়া ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের দুই দিনের সম্মেলন কোনো যৌথ ইশতেহার ছাড়াই শেষ হয়েছে। আয়োজক দেশ ভারত একটি ‘চেয়ারম্যান স্টেটমেন্ট’ প্রকাশ করলেও, জোটের ১০টি সদস্য দেশের মধ্যে ইরান যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি নিয়ে তীব্র মতপার্থক্য স্পষ্টভাবে সামনে চলে এসেছে।
২০ ঘণ্টা আগে
বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক ঝংনানহাই গার্ডেনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের দই দিনের হাই ভোল্টেজ শীর্ষ সম্মেলন শেষ হয়েছে গতকাল। এই সফরকে ওয়াশিংটন ‘বাণিজ্যিক বিজয়’ হিসেবে দেখলেও, কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা এটিকে দেখছেন দুই বিশ্বশক্তির মধ্যে গভীর আস্থার সংকটের প্রতিফলন হিসেবে
১ দিন আগে
যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক ঘিরে ২০২৫ সালজুড়ে যে অস্থিরতা ও টানাপোড়েন ছিল, তারপর এখন দুই দেশ বাস্তববাদী স্বার্থকেন্দ্রিক সম্পর্কের দিকে এগোচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরের পর এমন আভাস আরও স্পষ্ট হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দুই দেশ অন্যান্য ভূরাজনৈতিক...
২ দিন আগে