Ajker Patrika

ইরানের বিক্ষোভে কোন পক্ষে তুরস্ক, কী চায় তারা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
ইরানে চলমান বিক্ষোভকে খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখছে তুরস্ক। ছবি: সংগৃহীত
ইরানে চলমান বিক্ষোভকে খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখছে তুরস্ক। ছবি: সংগৃহীত

তুরস্ক ইরানে চলমান বিক্ষোভ পরিস্থিতি সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। আঙ্কারার আশঙ্কা, এই বিক্ষোভ অঞ্চলজুড়ে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। আঙ্কারা ও তেহরান কয়েক দশক ধরেই আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী। সিরিয়া, ইরাক, লেবাননসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের স্বার্থ বারবার মুখোমুখি হয়েছে।

তবে একই সঙ্গে তুরস্কের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে ভয় রয়েছে, ইরান সরকারের বিরুদ্ধে সহিংস অভ্যুত্থান হলে ৯ কোটির বেশি মানুষের এই দেশটি ভেঙে পড়তে পারে। বহু জাতিগোষ্ঠী ও ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শ ও আকাঙ্ক্ষায় গঠিত ইরানের ভেতরে এমন পরিস্থিতি ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

ইরান ও অঞ্চলবিষয়ক বিশ্লেষক এবং থিংক ট্যাংক সেটার (এসইটিএ) সঙ্গে যুক্ত মুস্তাফা কানের বলেন, ‘ইরান–তুরস্ক সম্পর্কের ভেতরে যে টানাপোড়েন ও প্রতিযোগিতা রয়েছে, তা সত্ত্বেও ইরানের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করা তুরস্কের জন্য অগ্রাধিকার।’

এই মনোভাবটি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের শনিবারের টেলিভিশন ভাষণে। ফিদান বলেন, এই বিক্ষোভের কারণে ইরানি সরকারের পতন ঘটবে, এমনটা আঙ্কারা মনে করে না। তিনি বলেন, ‘বর্তমান আন্দোলন ২০২২ সালের বিক্ষোভের তুলনায় আকারে ছোট। তবে এই মূল্যায়নের সঙ্গে একমত নন ইরানের অনেক বিশ্লেষক। তাঁদের মতে, অন্তত ১৯৯৯ সালের পর এটিই সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ।’

ফিদান বলেন, গত ৩০ বছরে ইরান তার উচ্চাকাঙ্ক্ষী আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নীতির মূল্য দিচ্ছে। এর ফলেই দেশটি কঠোর পশ্চিমা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছে। তিনি আরও বলেন, ইরানের একটি তরুণ, প্রাণবন্ত ও আধুনিক জনগোষ্ঠী রয়েছে, যারা প্রতিদিনের জীবনযাপন ও অর্থনৈতিক নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। বিক্ষোভ সম্পর্কে ফিদানের মন্তব্য, এটি ‘শাসকগোষ্ঠীর জন্য খুব শক্ত বার্তা’ বহন করছে। তিনি বলেন, ‘আমি নিশ্চিত, শাসকগোষ্ঠী বিষয়টি বুঝবে।’

ফিদান আরও বলেন, এই বিক্ষোভের মাধ্যমে ইসরায়েল যে ফলাফল চায়—অর্থাৎ ইরানি সরকারের পতন—তা ঘটবে বলে তিনি মনে করেন না। তিনি বলেন, ‘এটাও সত্য যে বিদেশ থেকে ইরানের প্রতিদ্বন্দ্বীরা এই বিক্ষোভকে কাজে লাগাচ্ছে। হ্যাঁ, এটা বাস্তবতা। মোসাদ এটা লুকায় না; তারা নিজেদের ইন্টারনেট ও টুইটার অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ইরানি জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে আহ্বান জানাচ্ছে।’

আঙ্কারাভিত্তিক সেন্টার ফর ইরানিয়ান স্টাডিজের চেয়ারম্যান সেরহান আফাকান বলেন, বিক্ষোভকারীদের দাবিদাওয়া—বিশেষ করে অর্থনৈতিক অভিযোগ—তুরস্ক বৈধ ও ন্যায্য বলে মনে করে। তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বিক্ষোভে মসজিদে হামলার মতো উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড প্রাধান্য পাচ্ছে বলেও আঙ্কারার ধারণা। আফাকান বলেন, তুরস্ক এমন কোনো অবস্থান নিতে পারে না, যা তেহরান ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সরকার পতনের আহ্বানের সঙ্গে নিজেদের একাত্মতা হিসেবে দেখবে। অতীতেও আঙ্কারা এমনটি করেনি।

তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি দেখছি, আঙ্কারা মূলত ইরানের সামগ্রিক অস্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বিগ্ন, নির্দিষ্ট করে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসনব্যবস্থা নিয়ে নয়। দেশটি যেন বিশৃঙ্খলার দিকে না গড়িয়ে পড়ে, সেটাই তাদের বড় উদ্বেগ। এমন কোনো পদক্ষেপ তারা এড়িয়ে চলছে, যা ওই পরিস্থিতির পথ প্রশস্ত করতে পারে।’ আফাকান আরও বলেন, অঞ্চলজুড়ে ইসরায়েলের অস্থিতিশীল ভূমিকা নিয়েও তুরস্ক অস্বস্তিতে রয়েছে।

গত বছর ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধে তুরস্ক আশঙ্কা করেছিল, ইরান থেকে শরণার্থীদের ঢল নামতে পারে। এ কারণে সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করা হয় এবং অনানুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময়ের মতো এবার তারা ততটা উদার হবে না। সিরিয়া সংকটে আঙ্কারা ৪০ থেকে ৫০ লাখ সিরীয় শরণার্থী আশ্রয় দিয়েছিল।

কানের বলেন, ‘ইরানে অস্থিতিশীলতার ফলে তুরস্কের ওপর যে খরচ চাপতে পারে, তা শুধু সীমান্ত নিরাপত্তা, অভিবাসন বা মাদক পাচারের মতো ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ নয়।’ ইরানে প্রায় ৮০ লাখ কুর্দি জনগোষ্ঠীর বসবাস, যাদের বড় অংশ তুরস্ক সীমান্তবর্তী এলাকায়। যদিও ২০২৪ সালে তুরস্ক ও কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি (পিকেকে) একটি শান্তি প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করেছিল, তবু অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা পুরোপুরি কাটেনি, বিশেষ করে সিরিয়ায়।

পিকেকের ইরানি শাখা কুর্দিস্তান ফ্রি লাইফ পার্টি (পিজাক) এখনো সক্রিয়। আঙ্কারা প্রায়ই তেহরানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে, ইরাক–ইরান সীমান্তে কুর্দি সশস্ত্র তৎপরতার বিষয়ে তারা চোখ বন্ধ করে রাখে। কানের বলেন, ‘সিরিয়া ও ইরাকে তুরস্কের পিকেকেবিরোধী অভিযান যেন ব্যাহত না হয়, সে জন্য পিজাকের মতো গোষ্ঠীগুলো যাতে ইরানের অস্থিরতা কাজে লাগিয়ে শক্তিশালী হতে না পারে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।’

তিনি আরও বলেন, এই বিক্ষোভ এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন সিরিয়ায় কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে দামেস্ক সরকারের কাঠামোর মধ্যে একীভূত করা নিয়ে আলোচনা অচলাবস্থায় পড়েছে এবং সেই চাপও আঙ্কারার ওপর রয়েছে। তাঁর মতে, ‘বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ইরানের কুর্দি, বালুচ ও আরব সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় দ্রুত সহিংসতায় রূপ নেওয়া বিক্ষোভ এবং মাঠপর্যায়ে সংগঠিত তৎপরতা প্রমাণ করে যে, এই বিষয়ে তুরস্কের উদ্বেগ অমূলক নয়।’

তুরস্কের বিশ্বাস, ইরান সরকারের জন্য সামনে এগোনোর পথ হলো পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করা। ফিদান বলেন, ‘আমরা ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিকে সমর্থন করি, যেখানে প্রধান প্রধান পক্ষ—বিশেষ করে আমেরিকানরা—জড়িত থাকবে এবং যা উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক হবে। কারণ এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা এর ওপর নির্ভর করছে।’

তিনি বলেন, এখন ইরানের প্রয়োজন প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ‘খুব আন্তরিক পুনর্মিলন ও সহযোগিতায়’ প্রবেশ করা। ফিদানের ভাষায়, ‘এই বিষয়ে ইরানকে সত্যিই আন্তরিক চেষ্টা করতে হবে। এমন একটি অভিন্ন জায়গায় আমাদের পৌঁছাতে হবে, যেখানে সবার সত্য একত্রিত হয়।’ ফিদান আরও বলেন, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান ইরানের সঙ্গে অঞ্চলটির সম্পর্ক পুনর্গঠনে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারেন।

মিডল ইস্ট আই থেকে অনূদিত

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত