Ajker Patrika

ফরেন পলিসির নিবন্ধ /এত বিক্ষোভ-প্রাণহানির পরও ইরানে ‘ইসলামি শাসনের’ পতন হলো না কেন

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১২: ১৬
এত বিক্ষোভ-প্রাণহানির পরও ইরানে ‘ইসলামি শাসনের’ পতন হলো না কেন
ইরানে এত বিক্ষোভ–প্রাণহানির পরও ইসলামী শাসনের পতন না হওয়ার কারণ হলো এই শাসনের কাঠামো। ছবি: সংগৃহীত

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের বিভিন্ন শহরে আবারও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ায় পর্যবেক্ষকেরা পরিচিত একটি প্রশ্ন সামনে এনেছেন—ইসলামি প্রজাতন্ত্র কি শেষ পর্যন্ত পতনের মুখে? দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মুদ্রার দ্রুত অবমূল্যায়ন, শ্রমিক ধর্মঘট এবং ধর্মীয় কর্তৃত্বের প্রকাশ্য অবাধ্যতা এমন এক অস্থির পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যা সাধারণত যেকোনো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে টলিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

বাস্তবতা হলো, ইরানে একের পর এক গণবিক্ষোভ হলেও সেগুলো এখনো রাজনৈতিক ভাঙন সৃষ্টি করতে পারেনি। সমস্যা এই নয় যে জনগণের মধ্যে বিরোধিতা নেই। চলতি মাসে সহিংস দমন অভিযানে কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছে। ফলে শাসনব্যবস্থা জনপ্রিয়—এই দাবি তেহরানের ক্ষমতার বাস্তব কাঠামো না বোঝার ফল। মূল প্রশ্ন হলো, ইরানিরা পরিবর্তন চান কি না, তা-ও নয়। প্রশ্ন হলো, কেন টানা অস্থিরতা এখনো শাসনব্যবস্থাকে ভাঙতে পারেনি। এর উত্তর হলো, ইসলামি প্রজাতন্ত্র এমনভাবেই গড়ে তোলা হয়েছে।

বর্তমান ইসলামি প্রজাতন্ত্র কার্যত একটি ধর্মতান্ত্রিক নিরাপত্তা রাষ্ট্র, যার কেন্দ্রবিন্দুতে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তাঁর পরিবার। ক্ষমতা এখানে বৃত্তাকারে বিন্যস্ত, যার কেন্দ্রে খামেনি ও তাঁর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা। ক্ষমতা অত্যন্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং রাজনৈতিক টিকে থাকা নির্ভর করে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ে সর্বোচ্চ নেতার ও তাঁর পুত্রদের কতটা কাছাকাছি থাকা যায়, তার ওপর।

খামেনির নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য হলো কঠোরতা, শৃঙ্খলা এবং নিজের ওপর অর্পিত এক বিশেষ দায়িত্ববোধ। তিনি নিজেকে শুধু রাজনৈতিক নেতা হিসেবে দেখেন না, বরং ইসলামি প্রজাতন্ত্র রক্ষার জন্য ঈশ্বরপ্রদত্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন অভিভাবক হিসেবে বিবেচনা করেন। এই বিশ্বাস সংকটকালে কোনো দ্বিধা বা আপসের জায়গা রাখে না। ১৯৮৯ সালে সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি ধীরে ধীরে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন, যেখানে জনসমর্থনের চেয়ে বলপ্রয়োগই মুখ্য। একটি সুসংগঠিত, আদর্শিকভাবে অনুগত দমনযন্ত্রের ওপর নির্ভর করেই এই ব্যবস্থা টিকে আছে। এই কাঠামোগত বাস্তবতাই জনমতের চেয়ে অনেক বেশি আজ ইরানে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সীমা নির্ধারণ করে। এখানে শাসনব্যবস্থা রক্ষা করা কোনো রাজনৈতিক সমঝোতার বিষয় নয়, বরং একটি পবিত্র দায়িত্ব।

এই কেন্দ্রের ঠিক চারপাশে রয়েছে বাইত-ই রাহবারি বা সর্বোচ্চ নেতার দপ্তর, যা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সবচেয়ে ক্ষমতাধর কিন্তু সবচেয়ে অদৃশ্য প্রতিষ্ঠান। বাস্তবে এটি দেশের প্রকৃত নির্বাহী ক্ষমতার উৎস। গত তিন দশকে এই দপ্তরটি এক বিশাল, অস্বচ্ছ সমান্তরাল রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, যা সংবিধান, পার্লামেন্ট ও প্রেসিডেন্সির ঊর্ধ্বে।

হাজারো অনুগত আলেম, নিরাপত্তা কর্মকর্তা ও আদর্শিক টেকনোক্র্যাট দিয়ে গঠিত এই বাইত সামরিক, গোয়েন্দা, অর্থনীতি, বিচার এবং সংস্কৃতি—সব ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ন্ত্রণ করে। এখানে শাসন চলে নিয়মকানুন বা প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যের মাধ্যমে নয়, বরং বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে, যাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বত্র বসানো হয়েছে। খামেনির পরিবার, বিশেষ করে তাঁর পুত্ররা, এই দপ্তরের মাধ্যমেই প্রভাব খাটান। ফলে এটি একসঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক ও পারিবারিক ক্ষমতার কেন্দ্র। বাইত কেবল খামেনির ক্ষমতার সম্প্রসারণ নয়; এটি এমন একটি যন্ত্র, যা তাঁর শাসনকে টেকসই করে, ধাক্কা সামলায় এবং সব সময় দৃশ্যমান না থেকেও কার্যকর থাকে।

এর বাইরে রয়েছে বিস্তৃত একটি ধর্মীয় নেটওয়ার্ক, যা ব্যবস্থাটিকে ধর্মীয় বৈধতা দেয়। হাওজা, ইমাম, প্রাদেশিক প্রতিনিধি এবং সরকারপন্থী শীর্ষ আলেমদের মাধ্যমে খামেনির কর্তৃত্বকে ঐশী অনুমোদনপ্রাপ্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তাঁকে শুধু রাজনৈতিক নেতা নয়, বরং গায়েবি ইমামের প্রতিনিধি হিসেবে দেখানো হয়। এতে আনুগত্য একটি ধর্মীয় কর্তব্যে পরিণত হয় এবং দমনপীড়নকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, নৈতিক প্রয়োজন হিসেবে তুলে ধরা হয়। বিশেষজ্ঞ পরিষদ ও গার্ডিয়ান কাউন্সিলের মতো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এই পবিত্র বৈধতা জোরদার করে এবং একই সঙ্গে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরের বিরোধিতাও দমন করে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত শীর্ষ আলেমরাই প্রকাশ্যে তুলে ধরেন। যেমন, সশস্ত্র বাহিনীর আদর্শিক-রাজনৈতিক দপ্তরের প্রধান হুজ্জাতুল ইসলাম আলী সাঈদি বলেছেন, ইসলামি সরকার রক্ষার জন্য হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ন্যায্য হতে পারে এবং ইসলামি রাষ্ট্র রক্ষা করাই সব দায়িত্বের ঊর্ধ্বে। এই কাঠামোর মধ্যেই আলেমরা বিক্ষোভকারীদের ‘মোহারেব’ বা ‘ঈশ্বরের শত্রু’ ঘোষণা করেন। এই তকমা দমনপীড়নকে ধর্মীয়ভাবে বৈধ করে তোলে এবং চরম সহিংসতা ও নৃশংসতার পথ খুলে দেয়। জনমতের চেয়ে এই ধর্মীয় শ্রেণিবিন্যাসই আজ ইরানে বিপ্লবী পরিবর্তনের সীমা নির্ধারণ করছে।

এরপরের স্তরে রয়েছে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ও সামগ্রিক নিরাপত্তা কাঠামো, যা শাসনব্যবস্থার বলপ্রয়োগের ঢাল। ইসলামি প্রজাতন্ত্র রক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত এই বাহিনীর মূল লক্ষ্য ১৯৭৯ সাল থেকেই ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা—অভ্যুত্থান ঠেকানো, ভিন্নমত দমন করা এবং সর্বোচ্চ নেতাকে সুরক্ষা দেওয়া। সময়ের সঙ্গে এটি একটি প্রিটোরিয়ান গার্ডে রূপ নিয়েছে, যা সামরিক দায়িত্বের বাইরেও গোয়েন্দা, বিদেশি অভিযান এবং বাসিজ মিলিশিয়াসহ বহু শাখায় বিস্তৃত এবং সমাজের গভীরে প্রোথিত।

দেশের ভেতরে অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে আইআরজিসি প্রাদেশিক পর্যায়ে বিকেন্দ্রীকৃত কমান্ড কাঠামো গড়ে তুলেছে, যেখানে আইআরজিসি, বাসিজ ও স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনী একসঙ্গে কাজ করে। বাসিজের কার্যালয় রয়েছে পাড়া-মহল্লা, স্কুল ও কর্মক্ষেত্রে, যা নজরদারি, জনসমাবেশ ও দমনের নেটওয়ার্ক হিসেবে কাজ করে। এতে জনরোষ দমন হয় এবং শাসনব্যবস্থা সামাজিক চাপ থেকে সুরক্ষিত থাকে। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবেও গার্ড বাহিনী শক্তভাবে প্রোথিত—রাষ্ট্রসমর্থিত কোম্পানির মাধ্যমে তারা গুরুত্বপূর্ণ খাত নিয়ন্ত্রণ করে এবং আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হয়ে উঠেছে। তবে এসবই হয়েছে খামেনির নির্দেশে, গার্ড বাহিনীকে নিজের ব্যবস্থার সঙ্গে বেঁধে রাখতে। তাই আইআরজিসির টিকে থাকাও সরাসরি খামেনি ও বাইতের সঙ্গে যুক্ত।

এই তিনটি স্তর মিলেই খামেনিকে ঘিরে রেখেছে এবং শাসনব্যবস্থা ও তাঁকে টিকিয়ে রাখার উপকরণ গড়ে তুলেছে। মানবদেহের উদাহরণ দিলে, খামেনি হলেন মাথা, বাইত হলো শরীরের কেন্দ্র বা ধড়, যা পুরো ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে। আইআরজিসি ও ধর্মীয় নেটওয়ার্ক হলো দুই হাত—একটি বলপ্রয়োগ করে, অন্যটি ধর্মীয় বৈধতা দেয়। এর নিচে রয়েছে সরকার ও প্রশাসন, যারা দৈনন্দিন কাজ চালায় কিন্তু সিদ্ধান্ত নেয় না। মন্ত্রণালয়, পৌরসভা ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখে এবং জনগণের ক্ষোভ শোষণ করে নেয়। কিন্তু প্রকৃত ক্ষমতা তাদের হাতে নেই। প্রশাসন সমাজ চালায়, কিন্তু শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করে না।

এই কাঠামোই জনপ্রিয় অসন্তোষকে শাসকগোষ্ঠীর ভাঙনে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়, যা কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার পতনের জন্য প্রয়োজন। বিক্ষোভ নিরাপত্তা বাহিনী দমন করে, আলেমরা তা ন্যায্যতা দেন, সর্বোচ্চ নেতার দপ্তর নিয়ন্ত্রিত প্রচারযন্ত্রের মাধ্যমে আড়াল করে এবং প্রশাসনিক রুটিনের ভেতরে শোষণ করে নেয়। ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে, সুরক্ষিত থাকে এবং এমন প্রতিষ্ঠান দ্বারা রক্ষিত থাকে, যাদের অস্তিত্বই ওই কেন্দ্র রক্ষার ওপর নির্ভরশীল।

এই স্থাপত্য বোঝা জরুরি। ইসলামি প্রজাতন্ত্র টিকে আছে জনসমর্থন বা বৈধতার কারণে নয়। এটি টিকে আছে, কারণ ইচ্ছাকৃতভাবে এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে চাপ প্রতিহত করা যায়, ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও কেন্দ্রকে আলাদা রাখা যায়। ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে যে কোনো গুরুতর বিশ্লেষণ এই কাঠামো থেকেই শুরু হওয়া উচিত—বিপ্লবী তুলনা বা অবশ্যম্ভাবী পতনের ধারণা থেকে নয়।

লেখক: সাঈদ গোলকার। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব শ্যাতানুগার রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক। তাঁর অবস্থান মূলত ইরানের বর্তমান রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। তিনি ইরানের পরমাণু কর্মসূচি-বিরোধী ইউনাইটেড অ্যাগেইনস্ট ইরানের একজন উপদেষ্টা।

অনুবাদ করেছেন আজকের পত্রিকার সহসম্পাদক আব্দুর রহমান

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

ফিরে এসেছে শৈত্যপ্রবাহ, কোথায় কত দিন চলবে

কারাগারেই প্রেম দুই ভয়ংকর খুনির, বিয়ের জন্য প্যারোলে মুক্তি দিল আদালত

জঙ্গল সলিমপুর: ‘জনবিস্ফোরণ’-এর হুঁশিয়ারি র‍্যাব কর্মকর্তা হত্যা মামলার প্রধান আসামির

বিশ্বকাপ না খেললে কত কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে বাংলাদেশ

‘পাকিস্তানের উসকানিতেই বিশ্বকাপ না খেলার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের’

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত