Ajker Patrika

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা: জয়-পরাজয়ের সমীকরণে কার কিস্তিমাত

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ২০ জুন ২০২৬, ১৭: ১৭
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা: জয়-পরাজয়ের সমীকরণে কার কিস্তিমাত
লেবাননে বন্দুক আর বিস্ফোরণের শব্দ থেমেছে, কিন্তু গ্রামগুলোতে ইসরায়েলি হামলার গভীর ক্ষত দৃশ্যমান। ছবি: এএফপি

২০১৮ সালের মে মাসে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরান পারমাণবিক চুক্তি (জেসিপিওএ) থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন, তখন তাঁর পূর্বসূরি বারাক ওবামা একটি সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। ওবামা বলেছিলেন, ‘ইরানের পক্ষ থেকে চুক্তি লঙ্ঘনের কোনো প্রমাণ ছাড়াই এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে একটি মারাত্মক ভুল।’

ওবামা আরও যোগ করেছিলেন, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে শেষ পর্যন্ত একটি পারমাণবিক অস্ত্রধারী ইরান অথবা মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি যুদ্ধের মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হবে।

আট বছর পর ওবামার সেই ভবিষ্যদ্ববাণীই সত্যি হলো। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকস্মিক যৌথ হামলার পর শুরু হওয়া যুদ্ধটি আপাতত বন্ধ হয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি প্রকাশ পাওয়া ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার ১ হাজার ৫০ শব্দের সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় ‘কৌশলগত পরাজয়’ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। যুদ্ধ শেষে ইরান এবং তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।

ইরান ছাড়া সবার জন্যই এটি একটি খারাপ চুক্তি

সৌদি আরব, সিরিয়া ও ইরাকে নিযুক্ত সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত জন জেনকিন্স এই সমঝোতা স্মারক সম্পর্কে বলেন, ‘আপাতদৃষ্টিতে ইরান ছাড়া বাকি সবার জন্যই এটি একটি অত্যন্ত খারাপ চুক্তি। জিসিসি (গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল) দেশগুলোর জন্যও এটি বড় দ্বিধার কারণ। যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তবে অঞ্চলের অন্য দেশগুলো কার ওপর ভরসা করবে?’

যুক্তরাজ্যের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের (সোয়াস) অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর ইরানিয়ান স্টাডিজের সহপরিচালক আরশিন আদিব-মোগাদাম এই সমঝোতাকে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর বড় বিপর্যয় হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প বা নেতানিয়াহু কেউই এই ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের মাধ্যমে তাঁদের ঘোষিত কোনো লক্ষ্য অর্জন করতে পারেননি; বরং ইরান এখন লেবানন ও ফিলিস্তিনে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেয়েছে।’

আরশিন আদিব-মোগাদাম আরও যোগ করেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রেও এখন এই উপলব্ধি তৈরি হচ্ছে যে ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধকে সমর্থন করার পেছনে অনেক বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য চোকাতে হয়।’

সমঝোতা স্মারকের মূল শর্তাবলি: কার লাভ, কার ক্ষতি

প্রকাশিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ইরানকে কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ দিতে হচ্ছে না, যদিও যুদ্ধে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের ব্যাপক বোমাবর্ষণের শিকার হয়েছে। বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নিম্নলিখিত বাধ্যবাধকতাগুলো দেওয়া হয়েছে:

আর্থিক সুবিধা ও পুনর্গঠন: যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে মিলে ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন (৩০ হাজার কোটি) ডলারের একটি সহায়তা পরিকল্পনা তৈরি করার অঙ্গীকার করেছে।

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও তেল রপ্তানি: মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ইরানের অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে এবং ইরানের ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ থাকা সকল তহবিল উন্মুক্ত করে দেবে।

সেনা প্রত্যাহার: চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালিসহ ইরানের কাছাকাছি এলাকা থেকে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং সব মার্কিন সেনা সরিয়ে নিতে হবে।

ইসরায়েলি অভিযান বন্ধ: ইসরায়েলকে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধ রাখতে হবে।

এর বিপরীতে ইরানের একমাত্র প্রতিশ্রুতি হলো, তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা সাময়িকভাবে (মাত্র ৬০ দিনের জন্য) ফিরিয়ে দেবে। ৬০ দিন পর হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওমানের মধ্যস্থতায় পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবে তেহরান।

পূর্বাবস্থায় ফিরে যাওয়ার এক ব্যয়বহুল প্রচেষ্টা

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক সিনিয়র ফেলো ব্রায়ান কাটুলিস মনে করেন, এই সমঝোতা স্মারকটি মূলত যুদ্ধপূর্ব পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়ার একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রচেষ্টামাত্র। তিনি বলেন, ‘এটি কেবল আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া নয়, বরং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মার্কিন মিত্রদের মনে আমেরিকার কৌশলগত নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে গভীর সংশয় ও অনিশ্চয়তা।’

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের আন্তর্জাতিক রাজনীতির সহযোগী অধ্যাপক ক্রিশ্চিয়ান এমেরি বলেন, ট্রাম্প যুদ্ধের কোনো লক্ষ্যই অর্জন করতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘যে ইরান সরকার অভ্যন্তরীণ আন্দোলনের চাপে নড়বড়ে মনে হচ্ছিল, তারা এখন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীকে রুখে দেওয়ার আত্মবিশ্বাস পেয়েছে। তারা বুঝতে পেরেছে যে নিজেদের সামরিক শক্তি ও ভৌগোলিক অবস্থান ব্যবহার করে তারা অঞ্চলটিকে নিজেদের অনুকূলে পুনর্গঠন করতে পারে।’

ক্রিশ্চিয়ান এমেরি উল্লেখ করেন, যুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মূল দাবি ছিল, যেকোনো পারমাণবিক চুক্তির আগে ইরানকে তার আঞ্চলিক প্রক্সি (যেমন হিজবুল্লাহ ও হুতি) সমর্থন বন্ধ করতে হবে এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা সীমিত করতে হবে। কিন্তু নতুন সমঝোতা স্মারকে এই দুটি শর্তের কোনো উল্লেখ নেই।

৬০ দিনের সময়সীমা কি বাস্তবসম্মত

সমঝোতা স্মারকে ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসের অধ্যাপক ইব্রাহিম আল-মারাসি এটিকে সম্পূর্ণ অবাস্তব সময়সীমা বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, সময় এখন ইরানের পক্ষে। ইরান সময়কে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শিখেছে। আগামী ৬০ দিন আলোচনা দীর্ঘায়িত করা বা গড়িমসি করা ইরানের একটি কৌশলগত লক্ষ্য।

এমেরি মনে করেন, তেহরান তাড়াহুড়ো করে বড় কোনো ছাড় দিতে রাজি হবে না। বিশেষ করে যেখানে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক চাপ বা কার্ডটি ইতিমধ্যে মোকাবিলা করে ফেলেছে। ইরান সম্ভবত আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল দেখার জন্য অপেক্ষা করবে। কারণে নির্বাচনে ট্রাম্পের অবস্থান আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সোফান সেন্টারের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাবিষয়ক পরিচালক ক্যারোলিন রোজের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এবং কংগ্রেসের ‘ওয়ার পাওয়ার অ্যাক্ট’ এড়াতে দ্রুত এই যুদ্ধ অধ্যায়টি বন্ধ করতে চাচ্ছে। ৬০ দিনের এই সংক্ষিপ্ত সময়সীমা তারই প্রতিফলন।

আঞ্চলিক নিরাপত্তার নতুন সমীকরণ

ইসরায়েল সরকারের পক্ষ থেকে এই সমঝোতা স্মারক নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে দেশটির গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা একে ইরানের কাছে ‘লজ্জাজনক আত্মসমর্পণ’ বলে বর্ণনা করেছেন, যা ইসরায়েলকে চরম অরক্ষিত ও সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে।

অন্যদিকে যুদ্ধ চলাকালে ইরানের হামলার শিকার হওয়া সত্ত্বেও সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক বিবৃতিতে আশা প্রকাশ করেছেন, এই চুক্তি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা বাড়াবে এবং অঞ্চলের দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সম্মান প্রদর্শন নিশ্চিত করবে।

তবে বিশ্লেষক ব্রায়ান কাটুলিস সতর্ক করে বলেছেন, ‘যেহেতু এই চুক্তি যুদ্ধের মূল কারণগুলো বা প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর (যেমন ইয়েমেনের হুতি বা লেবাননের হিজবুল্লাহ) সমস্যার সমাধান করছে না, তাই ভবিষ্যতে আবারও সংঘাত শুরু হওয়া প্রায় অনিবার্য।’

তবে এর বিপরীত মতও রয়েছে। আরশিন আদিব-মোগাদাম মনে করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নিরাপত্তার দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য বড় নিরাপত্তা-সংকট তৈরি করতে পারে, তা এই যুদ্ধের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রকৃত নিরাপত্তার জন্য ইরান ও ইরাককে অন্তর্ভুক্ত করে একটি নিজস্ব আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এই যুদ্ধের পর এটিই একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ।’

তথ্যসূত্র: আরব নিউজ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

পঠিত
সর্বশেষ
এলাকার খবর
খুঁজুন

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত