Ajker Patrika

যুদ্ধে ইরান হারলে কপাল পুড়বে পুতিনেরও

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­
আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৬, ২৩: ২৫
যুদ্ধে ইরান হারলে কপাল পুড়বে পুতিনেরও
২০২৫ সালের নভেম্বরে তুর্কমেনিস্তানের আশগাবাতে অনুষ্ঠিত ‘ইন্টারন্যাশনাল পিস অ্যান্ড ট্রাস্ট ফোরামে’ রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ছবি: সংগৃহীত

১৯৪৪ সালে তৎকালীন সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যাচেস্লাভ মোলোটভ বলেছিলেন, ‘ইরানের ভাগ্য নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন উদাসীন থাকতে পারে না।’ আট দশক পর বর্তমানের পুতিন প্রশাসনের জন্যও এই বাক্য সমানভাবে সত্য। মস্কোর কাছে ইরান শুধু একটি প্রতিবেশী দেশ নয়, বরং রাশিয়ার মধ্য এশীয় অঞ্চলের প্রভাববলয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু গত শনিবার শুরু হওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র মাধ্যমে আমেরিকা ও ইসরায়েলি বাহিনী ইরানকে যে চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে ফেলেছে, তাতে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের সেই ‘কৌশলগত স্থাপত্য’ ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

ইরানে হামলার প্রতিবাদে ক্রেমলিন কঠোর ভাষায় নিন্দা জানিয়েছে এবং একে ‘বিনা উসকানিতে সশস্ত্র আগ্রাসন’ বলে অভিহিত করেছে। তবে এই গর্জনের আড়ালে মস্কোর সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। রাশিয়া কখনোই ইরানকে বাঁচাতে আমেরিকা বা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়াবে না। বর্তমানে মস্কোর প্রধান মনোযোগ ইউক্রেন যুদ্ধের দিকে। ইরানের এই সংকটকে তারা বরং একটি সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, যাতে বিশ্ববাসীর নজর ইউক্রেন থেকে সরে যায় এবং কিয়েভকে দেওয়া পশ্চিমা সামরিক সহায়তায় টান পড়ে। একে বিশ্লেষকেরা ‘স্ট্র্যাটেজিক হেজিং’ বা কৌশলগত ঝুঁকি এড়ানোর নীতি হিসেবে দেখছেন।

দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাশিয়া আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘মধ্যস্থতাকারী’র ভূমিকা পালন করে আসছিল। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ এই কূটনৈতিক কাঠামোকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে। আমেরিকা ও ইসরায়েল এখন আর আলোচনার মাধ্যমে নয়, বরং সরাসরি সামরিক শক্তির মাধ্যমে ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন এবং পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করতে বদ্ধপরিকর। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার যে রাজনৈতিক আধিপত্য ছিল, তা মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতনের পর ইরানই ছিল এই অঞ্চলে রাশিয়ার শেষ শক্তিশালী খুঁটি; এখন সেটিও নড়বড়ে হয়ে যাওয়ায় মস্কো এক চরম একাকিত্বের মুখে পড়েছে।

অনেকে মনে করেছিলেন, ইরানে যুদ্ধ শুরু হলে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে বিপাকে পড়বে, কারণ মস্কো ইরানের ড্রোনের ওপর নির্ভরশীল। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। গত কয়েক বছরে রাশিয়া ইরানের ‘শাহেদ’ ড্রোনের প্রযুক্তি নিজের দেশে স্থানান্তর করেছে এবং এখন তারা নিজস্ব কারখানায় এই ড্রোন বিপুল পরিমাণে উৎপাদন করছে। ফলে ইরানের ওপর রাশিয়ার সামরিক নির্ভরশীলতা আগের চেয়ে অনেক কমেছে। মস্কো এই ইনসুলেশন বা সুরক্ষাবলয় গড়ে তুললেও এটি তেহরানের সঙ্গে মিত্রতার গভীরতা কমিয়ে দিয়েছে। এখন রাশিয়ার কাছে ইরান শুধু একটি ‘লেনদেনের অংশীদার’, যাকে রক্ষা করার জন্য ক্রেমলিন বড় কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নয়।

রাশিয়া সব সময় একটি বহুমুখী বিশ্বের কথা বলে আসছে, যেখানে আমেরিকা একমাত্র পরাশক্তি হবে না। মস্কোর এই বর্ণনায় ইরান ছিল পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি প্রধান প্রতিরোধ শক্তি। কিন্তু আমেরিকা ও ইসরায়েল যদি সফলভাবে ইরানের শাসনব্যবস্থা বদলে দিতে পারে, তবে রাশিয়ার সেই ‘মাল্টিপোলার’ বা বহুমুখী বিশ্বের আদর্শিক ভিত্তিটি দুর্বল হয়ে পড়বে। এটি বিশ্বজুড়ে এই বার্তা দেবে, পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন জোট শেষ পর্যন্ত কার্যকর কোনো সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ।

ইরান যুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত রাশিয়ার দক্ষিণ সীমান্তে (ককেশাস ও মধ্য এশিয়া) শরণার্থী সংকট এবং উগ্রপন্থার বিস্তার ঘটাতে পারে। এ ছাড়া মস্কোর সামনে এখন বড় আতঙ্ক চীনকে নিয়ে। কারণ, এই যুদ্ধের পর ইরান যদি টিকে থাকে, তবে তারা রাশিয়ার চেয়ে চীনের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক শক্তি রাশিয়ার চেয়ে অনেক বেশি হওয়ায় যুদ্ধত্তোর ইরানে চীনের প্রভাবই হবে প্রশ্নাতীত।

রাশিয়া বর্তমানে এক উভয়সংকটে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে তারা ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যস্ত থাকায় ইরানকে সামরিক সহায়তা দিতে পারছে না, অন্যদিকে ইরানের পতন হলে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের কয়েক দশকের প্রভাব চিরতরে বিলীন হয়ে যাবে। ক্রেমলিনের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো, কীভাবে সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়েও মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা টিকিয়ে রাখা যায়। তবে চলমান ঘটনাবলি ইঙ্গিত দিচ্ছে, এই অঞ্চলে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণের দিনগুলো দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।

চাথাম হাউস থেকে অনুবাদ করেছেন আবদুল বাছেদ

Google News Icon

সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিড ফলো করুন

ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা না বাড়াতে উপসাগরীয় মিত্রদের সৌদির ‘গোপন বার্তা’

কিশোরগঞ্জে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতার স্ত্রীর লাশ উদ্ধার

মার্কিন বাহিনীতে আক্রমণের কোনো পরিকল্পনা ছিল না ইরানের: কংগ্রেসকে পেন্টাগন

ভুলবশত ৩টি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে কুয়েত: মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড

যুদ্ধে জড়াল হিজবুল্লাহ, কিন্তু এখন কেন

এলাকার খবর
Loading...

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত